Collector
মমতার সাগর আমার মা | Collector
মমতার সাগর আমার মা
Jagonews24

মমতার সাগর আমার মা

শাম্মী তুলতুল মায়ের বিয়ে হয় মাত্র তেরো বছর বয়সে। নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি ঘর-সংসারের হাল ধরেন। একান্নবর্তী পরিবার চারটিখানি কথা নয়। ঘরের বড় বউ ছিলেন। একটা সময় শ্বশুর আর স্বামীর সাপোর্টে লেখাপড়া শুরু করেন। এরপর বড় ভাইয়ের হাত ধরে রাজনীতিতে যুক্ত হন। কিন্তু কি জানেন? ত্যাগ স্বীকার। সন্তান লালন-পালনের জন্য রাজনীতি ছেড়ে দেন। কোনো রকম পড়াশোনাটা শেষ করেন। গ্রাম থেকে শহরে চলে আসেন আব্বার চাকরির সুবাদে। একে একে জন্ম হয় আমাদের ছয় ভাই-বোনের। আমি যখন বড় হই; তখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারি—পৃথিবীতে মা কী। মায়ের চেয়ে বিকল্প কিছু নেই। মমতার সাগর আমার মা। মা খুব অল্প বয়স থেকেই ডায়াবেটিস-প্রেসারে ভুগতেন। আমি খুব চিন্তায় থাকতাম। এই ভালো তো এই খারাপ। ২০১০ সালে হজ করার পর মা কয়েক বছর সুস্থ ছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে সব শেষ। মাকে হারানোর ভয়ে আমার উৎকণ্ঠা দিনদিন বাড়তে থাকে। মা অসুস্থ হলে বুকে কাঁপুনি ধরে। আমি প্রার্থনায় বসে যাই। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ ঢাকার বইমেলা থেকে এসে শুনতে পাই—মা বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলেন। চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু তিনি এর পরদিন আবারও পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে ফেলেন। এরপর কতটা ভয়ংকর রাত আর দিন গেছে বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের দুই বোনের কান্না শুধু আল্লাহ দেখেছেন। মা প্যারালাইজড প্রায়। বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না। মায়ের হাত কোনোভাবে ভালো হয় না। মা হাতে ব্যান্ডেজ পরতে চান না। খুলে ফেলে দেন। বলেন, ‘আত্তে গম ন লাগের, অফুত আর ফটটি খুলি দে, আর আত খুলি দে।’ মাকে বোঝাই, ‘না হয় হাত ভালো হবে না তোমার।’ মাকে আমরা প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করাই। তাদের ভাষ্য, হাতে রড ঢুকিয়ে দেবে। তাতে তার হাত ভালো হবে। কিন্তু আমরা এ রিস্ক নেইনি। কারণ মায়ের ডায়াবেটিস ছিল। আমরা আরেক হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। খুব ভালো একজন ডাক্তার তিনি। আরও পড়ুনজিয়াউদ্দিন লিটনের ছোটগল্প: অদেখা বৈশাখ  এরপর ট্রিটমেন্ট চলতে থাকে। এরই মাঝে খোঁজ পাই স্বপ্নে পাওয়া ওষুধের। হাল ফ্যাশনের যুগে এ ওষুধের কথা শুনে আঁতকে উঠবেন। অনেকে হাসবেন। ঠাট্টা করবেন। আসলে কি জানেন, প্রিয় মানুষ অসুস্থ হলে চোখে-মুখে কিছু দেখা যায় না। তারা যুগ দেখে না। কি মডার্ন কি গেঁয়ো—এসব দেখে না। দেখে তার ভালো হওয়া। সে তো মা। তাই কোনো কিছুতেই ছাড় নেই। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের ট্রিটমেন্ট আর স্বপ্নের ওষুধে ভরসা করি আমরা। দু’বোনের দিন-রাত পর্যাপ্ত সেবা চলে। গোসল থেকে শুরু করে সব। কোনো নার্সকে ছুতেও দেইনি আমরা। কারণ তারা মায়ের কন্ডিশন বুঝতেন না। এভাবেই দীর্ঘ চার মাস পর মা সুস্থ। একদম স্বাভাবিক চলাফেরা শুরু। মা প্রতিদিনের মতো সকালে উঠে রান্নাবান্না সেরে ছোট ভাইকে দিয়ে ওষুধ আর ডাব এনে রাখলেন। সবাইকে চা-নাস্তা করিয়ে নিজে চা পান করে মাগরিবের আজান শেষে নিজের খাটে বসেন। হুট করে বিদ্যুৎ চলে যায়। মা বলেন, ‘ওরে আমার গরম লাগছে। দরজা খুলে দে, দরজা খুলে দে।’ দুবার বলতেই মা ছোট বোনের কাঁধে মাথা রাখেন। সবাই আতঙ্কে ছোটাছুটি। মাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু মা আর নেই। বিশ্বাস হয় না আমার। ছুটে গিয়ে ডাক্তারকে বললাম, ‘ডাক্তার আমার মাকে আবার চেক করুন। ওই যে বুকে কি একটা দেয় না, ওই যে মেশিন। বুকে অক্সিজেন দিন। দেখবেন ভালো হয়ে যাবে। আপনি বুঝতেছেন না, আমার মা সুস্থ। একদম সুস্থ। দেখুন একবার।’ বলে মাটিতে গড়াগড়ি আমার। আকাশ-বাতাস এক হয়ে কাঁদছে যেন আমার সাথে। ২০১৭ সালের ৩ আগস্ট মা চলে যান। যেখান থেকে আর কেউ ফেরেন না। রেখে যান বিষাদময় পৃথিবী। করে যান একা, একদম একা। আমরা চারদিন পর মায়ের রান্না করা শেষ তরকারি খেয়েছি আর অশ্রু ঝরিয়েছি। এই রান্নার স্বাদ আর কোনোদিন পাবো না। ডেকে ডেকে আমাদের আর কেউ খাওয়াবেন না। ফোনে আর মায়ের নাম্বার থেকে কল আসবে না। বিরক্ত হয়ে বলতে হবে না, ‘এত ঘন ঘন কল করছো কেন?’ মা, তোমাকে ছাড়া কত নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। তবুও বেঁচে থাকা শিখে গেছি। এক দোয়া ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই তোমায়। কষ্ট আর তোমার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে এখনো বেঁচে আছি। যে কষ্টটা সব কষ্টের ঊর্ধ্বে। এ কষ্টে শুধু দীর্ঘশ্বাস আছে। আছে নীরব-নিথর স্মৃতি। যা বয়ে বেড়াতে হবে আমৃত্য। লেখক: কবি ও কথাশিল্পী। এসইউ

Go to News Site