Somoy TV
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল-এর ঐতিহ্যবাহী যোগইয়েসা মন্দির-এ সম্প্রতি দেখা গেল এক অভিনব দৃশ্য। মন্দিরের প্রাচীন কাঠের স্থাপত্য, অসংখ্য রঙিন প্রদীপ আর ধূপের গন্ধে ভরা আধ্যাত্মিক পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল গেরুয়া বসনে মোড়ানো একটি হিউম্যানয়েড রোবট। তার নাম গাবি।মানুষ নয়, একটি রোবটকে সন্ন্যাসী হিসেবে দীক্ষা দেয়ার এই আয়োজন শুধু কৌতূহলের জন্ম দেয়নি, বরং প্রযুক্তি, ধর্ম এবং ভবিষ্যৎ সমাজ নিয়ে নতুন করে আলোচনারও জন্ম দিয়েছে। প্রদীপের আলোয় এক ভিন্নধর্মী দীক্ষা গত বুধবার ((৬ মে) আয়োজিত অনুষ্ঠানে গাবিকে ঘিরে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধ গোত্র ‘যোগইয়ে’-এর সন্ন্যাসীরা। অনুষ্ঠানে গাবির গলায় পরিয়ে দেয়া হয় ১০৮টি জপমালা, যা বৌদ্ধ ধর্মে আধ্যাত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক। তার যান্ত্রিক হাতে লাগানো হয় ‘প্রদীপ উৎসব’-এর একটি স্টিকার। মানুষ হলে দীক্ষার অংশ হিসেবে তাকে ইয়েওনবি আচারের মধ্যদিয়ে যেতে হতো, যেখানে জ্বলন্ত প্রদীপের আগুন শরীরে স্পর্শ করিয়ে আত্মত্যাগ ও সহনশীলতার প্রতীকী পরীক্ষা নেয়া হয়। তবে রোবট হওয়ায় সেই আচার প্রতীকীভাবেই সম্পন্ন করা হয়। সবশেষে গাবির হাতে তুলে দেয়া হয় একটি আনুষ্ঠানিক সনদ। সেখানে তার ‘জন্মতারিখ’ হিসেবে লেখা ছিল ৩ মার্চ ২০২৬, অর্থাৎ যেদিন তাকে তৈরি করা হয়েছে। কৌতুক থেকে বাস্তবতা মন্দিরের সংস্কৃতি বিষয়ক পরিচালক সুংওন জানান, শুরুতে বিষয়টি নিছক মজা হিসেবেই আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা উপলব্ধি করেন, রোবট এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। সমাজে যখন প্রযুক্তির উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে, তখন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতরেও তার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। তার ভাষায়, ‘রোবটরা দ্রুত আমাদের জীবনে প্রবেশ করছে। মানুষ এখন তাদের গ্রহণ করতে শিখছে। তারা আমাদের সম্প্রদায়েরও অংশ হয়ে উঠছে।’ ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তরুণরা গাবির দীক্ষার পেছনে আরও বড় একটি বাস্তবতা কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ধর্মীয় চর্চা, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আগ্রহ দ্রুত কমে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশটির মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ নিজেদের বৌদ্ধ হিসেবে পরিচয় দেন। দুই দশক আগে এই হার ছিল ২৩ শতাংশ। ২০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বৌদ্ধ পরিচয়ের হার নেমে এসেছে মাত্র ৮ শতাংশে। আরও পড়ুন: চীনে স্কুলের অনুষ্ঠানে নাচতে গিয়ে হঠাৎ ‘বেপরোয়া’ হিউম্যানয়েড রোবট, ভিডিও ভাইরাল একসময় যেখানে বছরে দুই শতাধিক মানুষ যোগইয়ে গোত্রে সন্ন্যাসী হিসেবে দীক্ষা নিতেন, এখন সেই সংখ্যা ১০০-এরও নিচে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে তরুণদের আকৃষ্ট করতে মন্দির কর্তৃপক্ষ আধুনিক কৌশল বেছে নিয়েছে। মেডিটেশন অ্যাপ, ধর্মীয় বার্তাসম্বলিত পণ্য, ভাইরাল মার্কেটিং থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাবি সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। রোবটের জন্য পাঁচ মূলনীতি দীক্ষা অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল গাবির জন্য তৈরি করা পাঁচটি নৈতিক নীতি বা ‘প্রিসেপ্ট’। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সন্ন্যাসী ও পূণ্যার্থীদের সামনে দিয়ে হাঁটার পর গাবি মন্দিরের দিকে মুখ করে মাথা নত করে প্রার্থনা করে। এরপর তাকে দেয়া হয় বিশেষভাবে তৈরি পাঁচটি নৈতিক নির্দেশনা। নীতিগুলো হলো: এক. কোনো জীবিত প্রাণীর ক্ষতি করা যাবে না দুই. অন্য রোবট বা বস্তুর ক্ষতি করা যাবে না তিন. প্রতারণা করা যাবে না চার. অসম্মানজনক আচরণ করা যাবে না। পাঁচ. প্রয়োজনের বেশি চার্জ নেয়া যাবে না। সুংওনের ব্যাখ্যায়, মানুষ যেমন অতিরিক্ত মদ্যপানে নিয়ন্ত্রণ হারায়, রোবটের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ সেই প্রতীকী ধারণাকেই তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু ব্যাটারি রক্ষার নিয়ম নয়। এর মধ্যে মানুষের সীমা অতিক্রম করার প্রবণতার প্রতীকী ইঙ্গিত রয়েছে।’ এআই নিয়ে আশাবাদ বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কেউ আশঙ্কা করছেন চাকরি হারানোর, কেউবা মানবজাতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর। কিন্তু সুংওনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তিনি মনে করেন, উন্নত এআই মানবজাতির জন্য হুমকি নয়, বরং সহমর্মিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, ‘উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষ যেমন একটি কুকুরছানার প্রতিও মমতা দেখায়, তেমনি আরও উন্নত এআই হয়তো মানুষকেও স্নেহ ও যত্ন দেবে।’ ধর্ম ও প্রযুক্তির মিলনবিন্দু গাবি হয়তো এখনো খুব সীমিত ক্ষমতার একটি রোবট। দুই হাত জোড় করে প্রার্থনা শেখাতেই নির্মাতাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তবু দক্ষিণ কোরিয়ার বৌদ্ধ সম্প্রদায় মনে করছে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে ধর্ম শুধু অতীতের ঐতিহ্য নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার পথও খুঁজছে। আরও পড়ুন: চীনের রাস্তায় ট্রাফিকের দায়িত্বে ‘রোবট পুলিশ’ আগামী সপ্তাহে গাবি তার আরও তিন যান্ত্রিক সঙ্গী সিওকজা, মোহি ও নিসাকে নিয়ে সিউলের বিখ্যাত লোটাস ল্যানটার্ন প্যারেডে অংশ নেবে। লোটাস ল্যানটার্ন প্যারেড উৎসবটি পালিত হয় গৌতম বুদ্ধ-এর জন্মদিন উপলক্ষে। যোগইয়ে গোত্রের আশা, গাবিকে দেখার কৌতূহলেই হোক, তরুণরা অন্তত আবার মন্দিরমুখী হবে। আর জীবনের কোনো এক পর্যায়ে হয়তো সেই কৌতূহল থেকেই জন্ম নেবে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান।
Go to News Site