Collector
আরবের মরুতে পৃথিবীর ‘দ্য গ্রেট গেম’ | Collector
আরবের মরুতে পৃথিবীর ‘দ্য গ্রেট গেম’
Somoy TV

আরবের মরুতে পৃথিবীর ‘দ্য গ্রেট গেম’

ধোয়াচ্ছন্ন একটি প্রেক্ষাপট কল্পনা করুন। এক পক্ষে আমেরিকার নেতৃত্বে ইসরাইল, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ রাজতন্ত্র শাসিত দেশগুলো। আরেকদিকে ইরান। হ্যাঁ, খালি চোখে দেখলে শুধু ইরানকেই দেখা যাবে। কিন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখলে কিছু মুখ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যাবে। নিশ্চিতভাবে সেখানে থাকবেন ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিন পিং।মধ্যপ্রাচ্য আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে থেকেই নির্ধারিত হবে আগামীর পৃথিবীর ভাগ্য। সেই নতুন পৃথিবীর নেতা কারা হবেন, তারই ফলাফল নির্ধারিত হচ্ছে আরবের মরুভূমিতে। দৃশ্যমান সংঘাতের পাশাপাশি চলছে অদৃশ্য এক ছায়াযুদ্ধ। যেখানে বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার, তেল-নির্ভর অর্থনীতি, জোট রাজনীতি এবং নিরাপত্তা কৌশল। সব মিলিয়ে এই অঞ্চল এখন বৈশ্বিক ক্ষমতাযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দাবার বোর্ডে প্রথম চালে ছক্কা মেরেছে ইরান, চীন, রাশিয়াই। শেষ পর্যন্ত এই অলিখিত জোট অবস্থান ধরে রাখতে পারলে ধ্বসে যেতে পারে মার্কিন সাম্রাজ্য। ডলার হারাতে পারে তার মূল্য। ইউনিপোলার থেকে বিশ্ব আবার ফিরতে পারে মাল্টিপোলারিজমে। এই জটিল এবং ভয়ংকর যুদ্ধে খুঁজতে হবেমধ্যপ্রাচ্যের এই ছায়া যুদ্ধের আসল খেলোয়াড় কারা?চীন-রাশিয়া কীভাবে বদলে দিচ্ছে খেলার গতি-প্রকৃতি।কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে এত সক্রিয়?কীভাবে তেল ও ইউ এস ডলার-পুরো বিশ্বের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।কেন ইউএস ডলার –এর আধিপত্য আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। শুরুতেই পরিস্কার হওয়া উচিত ‘ছায়া যুদ্ধ’ আসলে কী? ধরুন, দুইটা দেশ সরাসরি যুদ্ধ না জড়িয়ে—নিজেরা লড়াইয়ে না নেমে অন্য দেশ বা গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে একে অপরকে আঘাত করছে।এই অদৃশ্য, পরোক্ষ লড়াইকেই বলা হয় “শ্যাডো ওয়ার” বা ছায়া যুদ্ধ। এই ছায়া যুদ্ধ পরিচালিত হয় সাইবার আক্রমণ, প্রক্সি মিলিশিয়া ব্যবহার, গোপন গোয়েন্দা অভিযান, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং কূটনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে। অর্থাৎ যুদ্ধটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব বাস্তব এবং গভীর। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো ইরান–সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী বা দেশের সঙ্গে আমেরিকা ও তার মিত্রদের সমর্থিত শক্তির পরোক্ষ সংঘর্ষ। এই ধরনের সংঘাত সরাসরি যুদ্ধ না হয়েও পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীল করে রাখে। মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনীতিতে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এই অঞ্চলের গুরুত্ব মূলত তিনটি কারণে।  প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস মজুতের কেন্দ্র। দ্বিতীয়ত, এটি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকটাই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ছায়া যুদ্ধের আসল খেলোয়াড় কারা? এই ভূরাজনৈতিক খেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক শক্তি হলো আমেরিকা। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে আসছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষা। এর পাশাপাশি ইসরাইলকে সামরিক, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী রেখেছে। সৌদি, কাতার, আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো যার সহযোগী। ইসরাইল যে জোটের কাছে সহোদর ভাইয়ের মতো। অন্যদিকে ইরানের পাশে নিশ্চিতভাবেই আছে রাশিয়া চীন। ৪০ দিনের যুদ্ধে যা এখন পুরোপুরি স্পষ্ট। তাদের মূল লক্ষ্য প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার প্রভাব কমানো এবং ডলারের শক্তিক্ষয়। ফলে পুরো অঞ্চলটি একটি জটিল শক্তির খেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রক্সি গোষ্ঠী, কূটনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কেন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে এত সক্রিয়? আরব বিশ্বের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের হাতে থাকা তেলের সম্পদ বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এই দেশগুলোর সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সুতরাং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎস, তাই তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, তারা তাদের কৌশলগত মিত্র বিশেষ করে ইসরাইল–এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তৃতীয়ত, এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখাও তাদের লক্ষ্য। এছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্র বনাম আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য এই পুরো খেলায় সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো যুক্তরাষ্ট্র চায় মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও নিজের প্রভাব বজায় রাখতে।ইরান নিজের প্রভাব বলয় বাড়াতে চায়। তার বন্ধুদের চাওয়া আমেরিকার পতন।সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে চায়ইসরাইল নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়  এই বিপরীত স্বার্থগুলোই পুরো অঞ্চলকে অনিশ্চিত রাখে। কীভাবে তেল ও মার্কিন ডলার পুরো বিশ্বের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে?অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের বড় অংশই মার্কিন ডলার–এ সম্পন্ন হয়। এর ফলে বিশ্বের প্রায় সব দেশকে তেল কিনতে ডলার ব্যবহার করতে হয়। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব অর্জন করে। এই সমন্বয়কেই অনেক সময় ‘পেট্রোডলার সিস্টেম’ বলা হয়। যা ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করেছে। মিত্রতার নতুন পরিবর্তন একসময় আরব দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা আঞ্চলিক যুদ্ধ ও উত্তেজনা, ইরান-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্রের ধীরে ধীরে এই অঞ্চল থেকে মনোযোগ কমানো এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন—সব মিলিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় উত্তেজনার কেন্দ্রগুলোর একটি হলো ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যু। এখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরাইলের পাশে অবস্থান নেয়, যা অনেক আরব দেশ ও আঞ্চলিক শক্তির সাথে সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। এই সংঘাত শুধু স্থানীয় নয়—এটা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জোট ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। এই পরিবর্তনের কারণে অনেক আরব দেশ এখন আর এককভাবে কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভর করতে চায় না। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে নতুন কৌশল নিচ্ছে—বিশেষ করে চীন, রাশিয়া এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রতার মানচিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। কেন মার্কিন ডলার–এর আধিপত্য আজ চ্যালেঞ্জের মুখে? তবে এখন কিছু দেশ বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্যের চেষ্টা করছে, যাকে অনেকে “ডি-ডলারেজেশন” প্রবণতা হিসেবে দেখছেন। এটি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কেননা বর্তমানে অনেক দেশ ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। কারণ ডলার ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্যান্য দেশকে চাপ দিতে পারে। তাই চীন, রাশিয়া এবং কিছু আরব দেশ বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু করার চেষ্টা করছে। এছাড়া আঞ্চলিক জোট ও নতুন অর্থনৈতিক ব্লক তৈরি হওয়ায় ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। যদিও ডলার এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশ্বিক মুদ্রা, তবুও ভবিষ্যতে এর প্রভাব কমতে পারে। ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা সাধারণত তিনটি সম্ভাবনার কথা বলেন। প্রথমত, একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য তৈরি হতে পারে—যেখানে বড় কোনো যুদ্ধ ছাড়াই সব পক্ষ নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে সীমিত উত্তেজনার মধ্যেই সহাবস্থান করবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে, যেখানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াই আরও বাড়বে। তৃতীয়ত, নতুন জোট ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যেখানে আরব দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি শুধু যুদ্ধ বা তেলের গল্প নয়—এটা আসলে একটি বৃহৎ বৈশ্বিক ক্ষমতার খেলা। এখানে জ্বালানি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং কূটনীতি একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শক্তির ভারসাম্য, তেলের নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন ডলার–এর অর্থনৈতিক প্রভাব। তাই বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্য আজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘কৌশলগত দাবার বোর্ড’, যেখানে প্রতিটি চালের প্রভাব শুধু অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো বিশ্ব রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

Go to News Site