Somoy TV
তথ্য প্রযুক্তি উন্নয়নের এ যুগে স্মার্টফোনের ওপর আসক্তি শিশুদের দিন দিন বেড়েই চলেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনেক শিশু হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ডুব দেয় রিলস বা নানা ধরনের কনটেন্টের জগতে। কিছু শিশু স্মার্টফোনে ভিডিও দেখা ছাড়া খেতেই চায় না। কোনো কারণে হাত থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়া হলে শিশুকে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি শিশুর মধ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা জানতে দীর্ঘ সময় গবেষণা শুরু করেন গবেষকরা।জামা পেডিয়াট্রিক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, শিশুদের স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তির ক্ষতি ভয়াবহ। এটি তাদের শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আসুন এক নজরে জেনে নিই শিশুর স্মার্টফোন আসক্তির ভয়াবহ কিছু ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে- ১। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর চোখ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় চোখের পলক না ফেলে স্কিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিশুদের চোখের শুষ্কতা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, মাথা ব্যথা, ঘাড়-মেরুদণ্ড ও কাঁধে ব্যথা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থূলতা (ওজন বৃদ্ধি) সমস্যা বেড়ে যায়। ২। ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন আসক্তির ফলে দেরিতে কথা বলা, মনোযোগের ঘাটতি, খিটখিটে মেজাজ এবং অটিজমের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ৩। দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন দেখে খাওয়া বা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন পরিবর্তন করতে পারে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সমস্যা তৈরি করে। ৪। মোবাইল থেকে নির্গত রশ্মি শিশুদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। যা শিশুর সৃজনীশক্তি বিকাশে বাধা দেয়। ৫। শিশুর দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রা সমস্যা তীব্র হয়। স্মার্টফোনের নীল আলো ঘুমের হরমোন (মেলাটোনিন) উৎপাদনে বাধা দেয়। যে কারণে সারা দিনে শিশুর ঘুমের পরিমাণ কমতে শুরু করে। ৬। স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুরা বাস্তব জগত ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সাথে মিশতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ৭। স্মার্টফোনের আসক্তিতে এক জায়গায় দীর্ঘসময় বসে থাকতে হয় শিশুদের। এ কারণে প্রায়ই পেটের গোলযোগ সমস্যাতে ভুগতে দেখা যায় শিশুদের। ৮। গবেষকরা বলছেন, ১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যেসব শিশু মোবাইল, টিভি কিংবা ট্যাবের দিকে তাকিয়ে থাকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব শিশুদের স্মৃতিশক্তি ততই হ্রাস পায়। ৯। স্মার্টফোনের আসক্তিতে পড়া দীর্ঘ সময় মনে রাখতে না পারা, সহজে পড়া না বুঝা, কাউকে অল্প সময়ের ব্যভধানে ভুলে যাওয়ার সমস্যায় পড়ে শিশুরা। ১০। স্মার্টফোন আসক্তিতে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের রিলস দেখার প্রবণতা শিশুর সুন্দর ব্যক্তিত্ব তৈরির বদলে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিত্ব ও আচরণ তৈরি করে যা সমাজের চোখে দৃষ্টিকটু ও অনাকাঙিক্ষত। কী করবেন অভিভাবকরা? ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশের মারাত্মক স্মার্টফোন আসক্তি রয়েছে। এ আসক্তি রুখতে আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জামা পেডিয়াট্রিক গবেষণার গবেষকরা দিয়েছেন কিছু পরামর্শ। এগুলো হলো- ১। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ ও সুস্থ-রুচিশীল ব্যক্তিত্ব গঠনে অন্তত প্রথম ২ বছর টিভি, মোবাইল ফোন শিশুকে দেখানো উচিত নয়। ২। ২ থেকে ৫ বছরের শিশুদের বাঁধাধরা সময়ে টিভি, ফোন দেখার নিয়ম চালু করতে হবে। আরও পড়ুন: কোন শিশুরা পরবর্তী জীবনে সফল ও সুখী হয়? দেখুন হার্ভার্ডের গবেষণা ৩। ৫ বছরের ওপরের শিশুদের অনলাইনে পড়াশোনার চল ও শিক্ষামূলক ভিডিওতে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে অভিভাবকদের। ৪। মোবাইলে সময় কাটানোর পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের ইনডোর ও আউটডোর খেলায় শিশুকে ব্যস্ত রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময় শিশুদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথা বলা ও সময় কাটানোর অভ্যাসও চালু করতে হবে। ৫। শিশুকে অল্প বয়স থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। কোনটি খারাপ, কোনটি ভালো এ বোধ ছোটবেলা থেকেই তৈরি করলে শিশু নিজে থেকেই ভালো ও খারাপ কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারবে যা শিশুকে নৈতিকতার পথে ধাবিত করবে যা শিশুর রুচি ও ব্যক্তিত্ব উন্নত করতে কার্যকরী হবে। আরও পড়ুন: শিশুর ভালো ব্যক্তিত্ব গঠনের রহস্য কী?
Go to News Site