Somoy TV
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্য খুনের ঘটনায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এমন পরিস্থিতিতে শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।শনিবার (৯ মে) দিবাগত গভীর রাতে সরকারি তৎপরতা ও তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিহতদের মরদেহ শেষ পর্যন্ত তাদের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে পাঠানো সম্ভব হয়। গভীর রাতে ফ্রিজিং ভ্যানে মরদেহগুলো গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলে উপস্থিত অনেকে প্রশাসনের এমন মানবিক ভূমিকা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শোকের এই কঠিন সময়ে জেলা প্রশাসনের দ্রুত ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে। আরও পড়ুন: গাজীপুরে ৫ খুন: ভাইকে কল করে ফোরকান বলেন, ‘সবাইকে মাইরা ফেলছি, আমারে আর পাবি না’ এর আগে গতকাল শনিবার সকালেই ঘটনাস্থলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত হন। কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক এবং জেলা প্রশাসনের দুইজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে গিয়ে শোকাহত পরিবারের খোঁজখবর নেন। ঘটনার ভয়াবহতা দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। জেলা প্রশাসক মানবিকতার জায়গা থেকে নিয়মের ঊর্ধ্বে গিয়ে উদ্যোগ নেন। সাধারণত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেলা ২টার পর ময়নাতদন্ত করা হয় না। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা এবং মরদেহের দ্রুত পচনের আশঙ্কায় তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় রাতের মধ্যেই পাঁচটি মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবহনে বাধা হতে পারে বৃষ্টি; এমন আশঙ্কা থেকে তিনি ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করেন। প্রথমে পিকআপ ভ্যানে মরদেহ পাঠানোর কথা ভাবা হলেও দীর্ঘ পথ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তিনি ঝুঁকি নিতে চাননি। পরে তিনি নিজ উদ্যোগে দুটি ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া তিনি দাফন ও পরিবহনসহ সব ব্যয় নিজ তদারকিতে বহনের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ চলে গেলেও তার মরদেহের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’ এদিকে, গোপালগঞ্জ জেলার পাইককান্দি গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত মোল্লার কন্যা শারমিন খানম (৩৫) এবং তার পরিবারের সদস্যদের এই হত্যাকাণ্ডে এলাকায় শোক চলছে। নিহতরা হলেন-শারমিন খানম, তার ভাই রসুল (২২), এবং শারমিন-ফোরকান দম্পতির তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২)। পুলিশের ধারণা, শারমিনের স্বামী ফোরকানই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পলাতক রয়েছে। এর আগে শনিবার ভোরে উপজেলার রাউতকোনা (পূর্ব পাড়া) গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে ফোরকানের স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান পলাতক থাকলেও মুঠোফোনে স্বজনদের কাছে খুনের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। স্বজনদের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান মিয়া তার ভাই মিশকাতকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না’। ফোরকান পেশায় গাড়িচালক ছিলেন এবং গত পাঁচ বছর ধরে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। শারমিনের ভাই শাহীন মোল্লা জানান, গত শুক্রবার সকালে ফোরকান তার ছোট ভাই রসুলকে ফোন করে রাজেন্দ্রপুরের একটি পোশাক কারখানায় সাড়ে ১৯ হাজার টাকা বেতনে চাকরির ব্যবস্থা হওয়ার কথা জানান। সেই আশ্বাসে রসুল শুক্রবার সন্ধ্যায় বোনের বাসায় আসেন। শারমিনের এক ফুপু বলেন, রসুল অন্য জায়গায় চাকরি করতেন, কিন্তু নতুন চাকরির কথা বলে ফোরকান তাকে ডেকে এনে হত্যা করেন। আরও পড়ুন: গাজীপুরে ৫ হত্যা: লাশের ওপর অভিযোগপত্র, যা লেখা আছেহত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রতিটি লাশের ওপর কম্পিউটারে টাইপ করা একটি করে লিখিত অভিযোগপত্র পেয়েছে। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি বরাবর লেখা ওই অভিন্ন অভিযোগে ফোরকান তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়া এবং তার উপার্জিত ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে বাবার বাড়িতে জমি কেনার দাবি করেছেন। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ৩ মে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে হাত-পা বেঁধে মারধর করেছিলেন। তবে শারমিনের স্বজনরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।নিহত শারমিনের আরেক ফুপুর দাবি, ফোরকান আরেকটি বিয়ে করার কথা স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, যা নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝগড়া চলছিল। ছয়-সাত মাস আগে ফোরকান শারমিনকে এমনভাবে মারধর করেছিলেন যে তাকে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এমনকি ফোরকান আগে থেকেই পাসপোর্ট করে রেখেছিলেন এবং শনিবারই তার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল বলে স্বজনরা আশঙ্কা করছেন।গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান এ ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন। প্রতিটি লাশের ওপর অভিযোগের কপি রাখা ছিল। বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।’
Go to News Site