Jagonews24
মা মানেই ত্যাগ, ভালোবাসা আর নিরন্তর দায়িত্বের আরেক নাম। সংসার, সন্তান ও পরিবারের যত্ন নিতে গিয়ে অধিকাংশ মা নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার সুযোগই পান না। দিনের পর দিন কোমরব্যথা, ঘাড়ব্যথা, হাঁটুর সমস্যা কিংবা হাড় ক্ষয়ের মতো জটিলতা তারা নীরবে সহ্য করেন। মা দিবস উপলক্ষে মায়েদের হাড়ের স্বাস্থ্য, স্পাইন সমস্যা, গর্ভধারণ-পরবর্তী শারীরিক পরিবর্তন এবং সচেতনতা নিয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) আবাসিক সার্জন ডা. মো. সাইফুর রহমান খান সোহানের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। জাগো নিউজ: মা হওয়ার পর নারীদের শরীরে সবচেয়ে বেশি কোন ধরনের হাড়, জয়েন্ট বা স্পাইনের সমস্যা দেখা যায়? ডা. সাইফুর রহমান খান: মা হওয়ার পর নারীদের শরীরে নানা ধরনের শারীরিক পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের সময় শরীরের হরমোন, ওজন এবং মাংসপেশির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন হয়। এ কারণে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কোমরব্যথা, ঘাড়ব্যথা, হাঁটুব্যথা এবং স্পাইনের সমস্যা। গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন দ্রুত বাড়ে এবং মেরুদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে অনেকের লাম্বার স্পাইন বা কোমরের অংশে ব্যথা তৈরি হয়। আবার সন্তানকে দীর্ঘসময় কোলে নেওয়া, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় ভুল ভঙ্গিতে বসা কিংবা ঘুমের অনিয়মের কারণেও ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা বাড়ে। অনেক মায়ের ক্ষেত্রে পেলভিক জয়েন্টেও ব্যথা শুরু হয়। এছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। জাগো নিউজ: দীর্ঘসময় সংসারের কাজ, সন্তানকে কোলে নেওয়া বা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাজ করার কারণে মায়েদের কোমর ও ঘাড়ের ব্যথা কতটা বাড়ছে? ডা. সাইফুর রহমান খান: এটি এখন খুব সাধারণ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে অধিকাংশ মা দিনের বড় একটি সময় দাঁড়িয়ে বা ঝুঁকে কাজ করেন। রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, সন্তানকে কোলে নেওয়া, এসব কাজ শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে একই ভঙ্গিতে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকা কোমরের ডিস্ক ও মাংসপেশিতে চাপ বাড়ায়। আবার সন্তানকে একদিকে কাত করে কোলে নেওয়ার অভ্যাস ঘাড় ও কাঁধের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ফলে ক্রনিক পেইন বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তৈরি হয়। আমরা এখন অনেক কম বয়সী মায়ের মধ্যেও সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস বা ঘাড়ের ডিস্ক সমস্যার লক্ষণ দেখছি। এর পেছনে জীবনযাপনের ধরনও বড় কারণ। জাগো নিউজ: সন্তান জন্মের পর অনেক মায়ের হাঁটু বা কোমরে ব্যথা শুরু হয়। এর মূল কারণ কী? ডা. সাইফুর রহমান খান: গর্ভাবস্থার সময় শরীরে ‘রিল্যাক্সিন’ নামে একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শরীরের লিগামেন্ট ও জয়েন্টকে কিছুটা শিথিল করে। এটি স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সন্তান জন্মের পরও কিছু সময় শরীর সেই দুর্বল অবস্থায় থাকে। এ সময় যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টি ও ব্যায়াম না হয়, তাহলে হাঁটু ও কোমরে ব্যথা শুরু হতে পারে। এছাড়া ওজন বেড়ে যাওয়া, রক্তস্বল্পতা, ক্যালসিয়ামের অভাব এবং পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়াও ব্যথা বাড়ায়। অনেক মা সন্তান জন্মের পর খুব দ্রুত স্বাভাবিক কাজে ফিরে যান। এতে শরীর পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই অতিরিক্ত চাপ পড়ে। জাগো নিউজ: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি–এর ঘাটতি মায়েদের হাড়ের স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলে? ডা. সাইফুর রহমান খান: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শরীর থেকে প্রচুর ক্যালসিয়াম শিশুর শরীরে যায়। যদি মা পর্যাপ্ত পুষ্টি না পান, তাহলে তার নিজের হাড় দুর্বল হতে শুরু করে। ভিটামিন ডি–এর অভাবে শরীর ক্যালসিয়াম ঠিকমতো শোষণ করতে পারে না। ফলে হাড় ক্ষয়, মাংসপেশির দুর্বলতা, দাঁতে সমস্যা, এমনকি ছোট আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বর্তমানে শহরাঞ্চলের অনেক নারী সূর্যের আলো কম পান, শারীরিক পরিশ্রমও কম করেন। এতে ভিটামিন ডি ঘাটতি আরও বাড়ছে। জাগো নিউজ: বর্তমানে কম বয়সী মায়েদের মধ্যেও স্পাইন বা ডিস্কজনিত সমস্যা বাড়ছে কি? এর পেছনে কী কারণ দেখছেন? ডা. সাইফুর রহমান খান: অবশ্যই বাড়ছে। আগে আমরা সাধারণত ৪০ বছরের পর ডিস্ক সমস্যা বেশি দেখতাম। এখন ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যেও এ সমস্যা বাড়ছে। এর বড় কারণ হলো অনিয়মিত জীবনযাপন, দীর্ঘসময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার, শারীরিক ব্যায়ামের অভাব এবং ভুল ভঙ্গিতে বসা। সন্তানকে কোলে নেওয়ার সময়ও অনেকে শরীরের সঠিক ভঙ্গি মেনে চলেন না। অতিরিক্ত ওজনও একটি বড় কারণ। স্থূলতা স্পাইনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। আরও পড়ুনঅতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধানীরবে বাড়ছে কোলোরেক্টাল ক্যানসার, সচেতনতার ঘাটতিতে দেরিতে শনাক্ত জাগো নিউজ: গর্ভাবস্থায় ও সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের কী ধরনের ব্যায়াম বা শারীরিক যত্ন নেওয়া উচিত? ডা. সাইফুর রহমান খান: প্রথম কথা হলো যেকোনো ব্যায়াম চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত। সাধারণভাবে হালকা হাঁটা, পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ, স্ট্রেচিং এবং ব্যাক স্ট্রেন্থেনিং ব্যায়াম উপকারী। গর্ভাবস্থায় দীর্ঘসময় একভাবে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। আর সন্তান জন্মের পর শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে হবে। মায়েদের পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং সঠিক ভঙ্গিতে বসা-উঠার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও পিঠে সাপোর্ট দিয়ে বসা উচিত। জাগো নিউজ: অনেক মা ব্যথাকে স্বাভাবিক ভেবে চিকিৎসা নেন না। কোন লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি? ডা. সাইফুর রহমান খান: এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক মা বছরের পর বছর ব্যথা সহ্য করেন। কিন্তু কিছু লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন- ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়া হাত বা পায়ে ঝিনঝিন অনুভব হওয়া দুর্বলতা বা অবশ ভাব হাঁটতে সমস্যা হওয়া কোমরব্যথা থেকে পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া হঠাৎ ভারসাম্য হারানো প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এসব লক্ষণ স্পাইন বা নার্ভের জটিল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তখন দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। জাগো নিউজ: ঘরে ও অফিসে কাজ সামলানো কর্মজীবী মায়েদের জন্য হাড় ও স্পাইন সুস্থ রাখতে আপনার বিশেষ পরামর্শ কী? ডা. সাইফুর রহমান খান: কর্মজীবী মায়েদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা নিজের জন্য সময় পান না। তাই আমি বলব, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিজের শরীরের জন্য রাখুন। দীর্ঘসময় বসে কাজ করলে প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পর উঠে হাঁটুন। সঠিক উচ্চতার চেয়ার ব্যবহার করুন। মোবাইল ফোন নিচু হয়ে না দেখে চোখের সমান উচ্চতায় ব্যবহার করুন। খাবারের তালিকায় দুধ, ডিম, মাছ, শাকসবজি রাখুন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যথাকে অবহেলা করবেন না। জাগো নিউজ: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়েদের অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি কতটা বাড়ে? এটি প্রতিরোধে কী করা উচিত? ডা. সাইফুর রহমান খান: নারীদের মেনোপজের পর অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কারণ তখন শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যায়, যা হাড়কে সুরক্ষা দেয়। হাড় ক্ষয় শুরু হলে প্রথমদিকে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। কিন্তু পরে সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। এটি প্রতিরোধে নিয়মিত হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার, সূর্যের আলো গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট নেওয়া জরুরি। নির্দিষ্ট বয়সের পর হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষাও করা উচিত। জাগো নিউজ: মা দিবসে দেশের সব মায়েদের উদ্দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিজের যত্ন নেওয়া নিয়ে আপনার বার্তা কী? ডা. সাইফুর রহমান খান: আমাদের সমাজে মায়েরা সবার যত্ন নেন, কিন্তু নিজের শরীরের কথা সবচেয়ে কম ভাবেন। আমি সব মায়ের কাছে বলতে চাই, নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াও দায়িত্বের অংশ। ব্যথা, ক্লান্তি বা দুর্বলতাকে অবহেলা করবেন না। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, সুষম খাবার খান, শরীরচর্চা করুন এবং মানসিক সুস্থতার দিকেও গুরুত্ব দিন। একজন সুস্থ মা মানেই একটি সুস্থ পরিবার। তাই মা দিবসে শুধু শুভেচ্ছা নয়, মায়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রতিও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। জেএস/এমএমএআর
Go to News Site