Collector
শ্রেণিকক্ষ-সংসার, মা দিবসে শিক্ষিকা মায়েদের অজানা অনুভূতি | Collector
শ্রেণিকক্ষ-সংসার, মা দিবসে শিক্ষিকা মায়েদের অজানা অনুভূতি
Jagonews24

শ্রেণিকক্ষ-সংসার, মা দিবসে শিক্ষিকা মায়েদের অজানা অনুভূতি

সকাল শুরু হয় হয়তো সন্তানের টিফিন গুছিয়ে, তারপর দ্রুত ছুটে যাওয়া শ্রেণিকক্ষে। কখনো বোর্ডে পাঠ লিখছেন, কখনো ফোনে খোঁজ নিচ্ছেন বাসায় থাকা সন্তানের। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েও আবার ফিরে যেতে হয় সংসারের অসংখ্য দায়িত্বে। তবুও মুখে থাকে মমতার হাসি। একজন কর্মজীবী মা, বিশেষ করে শিক্ষিকা মায়েরা, প্রতিদিনই একসঙ্গে বহন করেন পরিবার ও পেশার দুই বিশাল দায়িত্ব। মা দিবসকে ঘিরে সরকারি তিতুমীর কলেজের চারজন শিক্ষিকা তুলে ধরেছেন তাদের না বলা গল্প। লিখেছেন মোঃ দিদারুল ইসলাম সিফাত। কানিজ ফাতেমা সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ মা দিবস হলো মা ও মাতৃত্বের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জানানোর একটি বিশেষ দিন। জন্মের পর আমরা প্রথম যে কথা বা শব্দ বলি, তা হলো ‘মা’। মা হলেন সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক। মা নিজের সুখ-শান্তি ভুলে সন্তানকে আগলে রাখেন। মাকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিনের প্রয়োজন নেই; প্রতিটি দিনই মায়ের দিন। তবে এই দিনটি মায়েদের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। একটি পরিবার তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন তার কেন্দ্রে সবাইকে আগলে রাখার মতো একজন মা থাকেন। মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। মা সবসময় সন্তানের ভালোর জন্য দোয়া করেন। মায়েদের কোনো বিকল্প নেই। সন্তান যখন বলে, ‘মা আমি এটা খাবো’, মায়ের কাছে সেদিন উৎসব মনে হয়। আমাদের যখন অসুখ হয়, তখন প্রথমে আল্লাহর নামের পরেই ‘মা’ শব্দটা বেশি উচ্চারিত হয়। মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতিদিন হওয়া উচিত। মায়ের মতো আপনজন পৃথিবীতে আর কেউ হয় না। মায়ের কোনো বিকল্প হয় না। মা সবার জীবনের প্রথম শিক্ষক। সারাজীবন সন্তানের বিপদ-আপদে মা বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন। আমাদের জীবনে প্রতিটি দিনই যেন ‘মা দিবস’ হয় এই আশাই ব্যক্ত করছি।  অধ্যাপক ড. মোছাঃ জোহরা সুলতানা রুনী চেয়ারম্যান, ইতিহাস বিভাগ ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, একজন মা তার সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন। কারণ তিনি তো মা। মা তো আর হুট করে হওয়া যায় না; মা হওয়ার আগে অনেক প্রস্তুতি থাকে। নয় মাস দশ দিন ধরে মা হওয়ার যে আকুতি, তা তার দেহে তিল তিল করে গড়ে ওঠে। কাজেই সন্তানের জন্য মায়ের ত্যাগকে শুধু সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। সন্তানরা মাকে সবসময় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে পারে না, কারণ সন্তানের আশ্রয়স্থল হলো মা। তারা মায়ের কাছেই সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছলতা ও নিরাপত্তা অনুভব করে। কাজেই মা দিবসে মাকে ‘ভালোবাসি’ বলাটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। সন্তানরা সবসময়ই মাকে ভালোবাসে। যখন মা দিবস ছিল না, তখন হয়তো বলা হতো না যে ‘মা তোমায় অনেক ভালোবাসি’। একটি মা দিবস আছে বলেই আজ হয়তো বিশেষভাবে বলা যাচ্ছে। এই দিন সন্তানরা মাকে খুশি করার জন্য মাকে গিফট দেই। তবে এই দিন ছাড়াও অন্য দিনগুলোতে মা সবসময় তার সন্তানের জন্য ভালো কিছু প্রত্যাশা করেন। সন্তান ভালো কিছু করলে যেমন মা খুশি হন, তেমনি সন্তানের বিপদে মায়ের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা আর কেউ করে না। মা ও সন্তানের এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অনেক স্নেহ মমতা ও অনুভূতি প্রকাশ পায়। জন্মের পর থেকে মা-ই হলো সন্তানের প্রধান শিক্ষক। মা যখন পথ চলা শুরু করতে শেখান, তখন থেকেই শত বাধা ও প্রতিকূলতার মাঝেও মাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। মায়ের বৃদ্ধ বয়সে মায়ের সেবা করা এবং দেখাশোনা করা সন্তানের দায়িত্ব। মায়ের ছোট ছোট বিষয়গুলোতেও খেয়াল রাখা উচিত। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় সন্তানরা মায়ের এই বিষয়গুলোতে খেয়াল করতে পারছে না। অনেক সময় এগুলো ইচ্ছাকৃত হয়, আবার অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে। দেখা যায় যে সন্তানেরাও সন্তানের মা হন বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝে তারা সেটা করতে পারে না। তবে সন্তানের উচিত মাকে সবসময় সুরক্ষা দেওয়া। মায়ের বৃদ্ধ বয়সে একজন সন্তানের সবসময় তার পাশে থাকা ও যত্ন নেওয়া উচিত। একজন মা ও সন্তানের মধ্যে বোঝাপড়া ভালো থাকলে তাদের সম্পর্ক অনেক মধুর হয়। অধ্যাপক সেলিনা আক্তার উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ মায়ের প্রতি ভালোবাসা একদিনে বা এককথায় প্রকাশ করার মতো কোনো বিষয় নয়। কারণ মায়ের মমতা আমাদের সারা জীবনের পাথেয়। তবুও বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে মা দিবস পালনের একটি বিশেষ ইতিবাচক দিক রয়েছে। হাজারো ব্যস্ততার মাঝে অন্তত এই একটি দিন আমরা বিশেষভাবে মায়ের কথা ভাবি, তাকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করি এবং ছোট কোনো উপহার দিয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি। দিবসটি না থাকলে হয়তো জীবনের ব্যস্ততা দৌড়ে আমরা এই সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু প্রকাশের কথা ভুলে যেতাম। মায়ের অনুভূতি আসলে কেমন, তা একজন সন্তান নিজে মা বা বাবা না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না। সন্তান পৃথিবীতে আসার পর থেকেই মায়েদের ত্যাগের সূচনা হয়। নিজের আরাম-আয়েশ, শখ কিংবা বিশ্রামের কথা চিন্তা না করে তারা কেবল সন্তানের সুস্থতা ও ভবিষ্যতের কথা ভাবেন। বলা যায়, মায়েরা নিজের জন্য নয়, বরং সন্তানের ভালোর জন্যই বেঁচে থাকেন। জগতের অন্য সব সন্তানদের মাঝেও মায়েরা নিজের সন্তানকেই খুঁজে বেড়ান। তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মেজোদিদি গল্পের একটি বিখ্যাত উক্তি ‘কেষ্টের কষ্ট দেখে হিমাঙ্গিনীর মাতৃত্ব জাগিয়া উঠিল’ তবে জীবনের এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি হলো, সন্তান যখন বড় হয় বা কিশোর বয়সে পা দেয়, তখন অনেকেই মায়ের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারে না। বয়সের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে বা পারিপার্শ্বিক প্রভাবে সন্তানেরা মায়েদের থেকে দূরে সরে যায় কিংবা তাদের আবেগকে তুচ্ছজ্ঞান করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন সন্তানের মধ্যে পূর্ণ ম্যাচুরিটি বা পরিপক্কতা আসে, তখন সে পুনরায় বুঝতে পারে যে মা তার জন্য জীবনে কত কী বিসর্জন দিয়েছেন। পৃথিবীর নিয়মে সন্তান হয়তো অনেক সময় অনেক কারণে মায়ের থেকে দূরে সরে যায়, কখনো কখনো তাদের ভালোবাসায় ঘাটতিও দেখা দেয়; কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কখনো কমে না। শত অবহেলা বা দূরত্বেও মায়ের মমতা সারাজীবন একই থাকে। মায়ের এই সুগভীর অনুভূতি বা ত্যাগ আসলে ভাষায় লিখে বা মুখে বলে শেষ করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক ঋণ, যা কোনোদিন শোধ করা যায় না, কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়। রোকসানা আক্তার সহযোগী অধ্যাপক, গনিত বিভাগ ‘মা’ একটি ছোট শব্দ, কিন্তু এতে লুকানো থাকে পুরো পৃথিবীর ভালোবাসা, আশ্রয় আর শান্তি। এটি নিতান্তই একটি শব্দ নয় , এটি একটি অনুভূতি, একটি দায়িত্ব, এবং প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক অসাধারণ যাত্রা। জীবনের অনেক পরিচয়ের ভিড়ে ‘মা’ পরিচয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি জুগিয়েছে। মাতৃত্বের এই পথ কখনোই সহজ ছিল না। সংসার, দায়িত্ব, পরিবার, নিজের স্বপ্ন সবকিছুর ভার একসাথে বহন করতে গিয়ে বহুবার ক্লান্ত হয়েছি, ভেঙে পড়েছি নীরবেই। কিন্তু প্রতিবারই আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। কারণ একজন মা কখনোই হার মানতে শেখেন না। তার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে তার সন্তান, তার পরিবার, তার ভালোবাসা। একজন মা হিসেবে আমি শিখেছি ধৈর্য, সহনশীলতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ। সন্তানের মুখের হাসি আমাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি বাধা পেরিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি একজন মা নিজের ভেতরে এমন এক শক্তি ধারণ করেন, যার সম্পর্কে হয়তো তিনি নিজেও অবগত নন। আমার এই পথচলায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার নিজের মা। তার অগাধ ভালোবাসা আর সমর্থন আমাকে প্রতিনিয়ত সাহস ও শক্তি জোগায়। আজ আমি একজন মা হিসেবে যা কিছু শিখেছি, তার সিংহভাগ তার কাছ থেকে পাওয়া। এছাড়াও আমার জীবনের অনেক মা বন্ধু, আত্মীয় কিংবা পরিচিত নারীরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন তাদের শক্তি ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। তারা প্রমাণ করেছেন, একজন মা কেবল পরিবার-ই গড়েন না, তিনি মানুষ গড়েন, ভবিষ্যৎ গড়েন। এই মা দিবসে আমি পৃথিবীর সব মায়েদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, যারা নীরবে হাজারো কষ্ট সহ্য করেও সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। কারণ একজন মা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি এক অদম্য শক্তির নাম। আরও পড়ুনপহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ: ঐতিহ্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্তের পকেটতারুণ্যের ভাবনায় রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস কেএসকে

Go to News Site