Collector
ময়মনসিংহ সিটিতে নেই পর্যাপ্ত মাঠ, স্ক্রিনে আসক্ত হচ্ছে শিশুরা | Collector
ময়মনসিংহ সিটিতে নেই পর্যাপ্ত মাঠ, স্ক্রিনে আসক্ত হচ্ছে শিশুরা
Somoy TV

ময়মনসিংহ সিটিতে নেই পর্যাপ্ত মাঠ, স্ক্রিনে আসক্ত হচ্ছে শিশুরা

খেলার মাঠের তীব্র সংকটে প্রাণচাঞ্চল্য হারাচ্ছে ময়মনসিংহ নগরী। পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থানের অভাবে চার দেয়ালের মাঝেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে শিশুদের দুরন্ত শৈশব। মাঠের সবুজ থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশু-কিশোররা ক্রমশ আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইল ফোনের নীল আলোয়।সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার আট বছর পেরিয়ে গেলেও ময়মনসিংহ নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের কোথাও গড়ে ওঠেনি নিজস্ব খেলার মাঠ, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র। ফলে এই প্রাচীন শহরের শিশু-কিশোররা বেড়ে উঠছে এক ধরনের হাহাকার নিয়ে।  ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদে দিন দিন জনবসতি বাড়লেও আবাসন চাহিদা মেটাতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর। আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বহুতল ভবনগুলো। শহুরে কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছে দুরন্ত শৈশব। চার দেয়ালের বাইরে এক চিলতে সবুজ যেন এখন সোনার হরিণ। খেলাধুলার জন্য ময়মনসিংহ শহরের অলিগলিতে কোনো রকমে টিকে আছে কৈশোরের প্রাণচঞ্চলতা।  নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় শহরের গলি বা মূল রাস্তাই এখন শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ। কোথাও আবার রেললাইনের পাশে ময়লা-আবর্জনা ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ঝুঁকি নিয়েই ক্রিকেট বা ফুটবলে মেতেছে তারা। বিকেল হলে ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে না বলে জানায় শিশুরা। তারা বলে, ‘আশেপাশে কোনো খেলার জায়গা নেই। সার্কিট হাউস মাঠে যেতে চাইলে অনেক দূরে যেতে হয়। সেখানে গিয়েও অন্যদের ভিড়ে স্থান পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার গলিতেই খেলতে হয়।’ শিশুদের আক্ষেপ, ‘অনেকে বলে এই প্রজন্ম নাকি মোবাইল আসক্ত হয়ে পড়ছে, কিন্তু এটা কেউ বলে না যে খেলার জায়গা নেই। তখন মোবাইলে গেমস খেলা ছাড়া কী বা করার আছে।’ আরও পড়ুন: মুক্তাগাছা বাইপাস সড়কের কাজ শেষ হবে কবে? উন্মুক্ত পার্ক ও পর্যাপ্ত পরিসরের অভাবে প্রাতঃভ্রমণ বা শরীরচর্চার জন্য নগরবাসীর ভরসা এখন সীমিত কিছু জায়গা। ছবি: সময় সংবাদ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বয়সভেদে একটি করে প্লে-লট, প্লে-গ্রাউন্ড এবং প্লে-ফিল্ড থাকা বাঞ্ছনীয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী ময়মনসিংহের ৫ লাখ ৭১ হাজার জনসংখ্যার জন্য প্রায় ৫.১৪ বর্গকিলোমিটার (১ হাজার ২৭০ একর) উন্মুক্ত স্থানের প্রয়োজন।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিডিসি-র মতে, সুস্থ থাকার জন্য মাথাপিছু অন্তত ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত স্থান এবং প্রতিদিন এক ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রম জরুরি। অথচ তাত্ত্বিকভাবে যেখানে ১১৫ থেকে ১৯১টি ওপেন স্পেস ইউনিটের চাহিদা রয়েছে, সেখানে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব মাঠের সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। এদিকে নগরীতে হাঁটাহাঁটি, শরীরচর্চা বা একটু বুক ভরে শ্বাস নেয়ার জন্য নগরবাসীর একমাত্র ভরসা ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের জয়নুল আবেদিন পার্ক। ছুটির দিন কিংবা উৎসবে এই এক চিলতে জায়গাতেই ভিড় জমান পুরো নগরের মানুষ।  মইনুল হক নামে এক নগরবাসী বলেন, ‘আমরা শহরের মধ্যে একদম বদ্ধ অবস্থায় আছি। নিঃশ্বাস ফেলার একটু জায়গা নেই। প্রশস্ত পরিসর যেখানে শিশু মন বিকশিত হবে, এই দিকটিতে সিটি প্রশাসনের নজর দেয়া দরকার।’ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবুল মনসুর বলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। খেলার মাঠ আর বিনোদন কেন্দ্রের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। শুধু শিশুদের পড়াশোনার কথা ভাবলেই হবে না, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও ভাবতে হবে।’ আরও পড়ুন: ২০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে রোগীরাই যেন ডাক্তার খেলার মাঠ না থাকায় বাইরে বের হলেও খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা, অলস সময় পার করায় ব্যাহত হচ্ছে বিকাশ। ছবি: সময় সংবাদ পরিকল্পনাবিদ ও নগরবিদরা বলছেন, ময়মনসিংহ সিটিতে ন্যূনতম ৩৭টি খেলার মাঠ দরকার। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সদস্য সচিব ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল বলেন, ‘তাত্ত্বিকভাবে প্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একটি করে খেলার জায়গা ধরলে ১১৫ থেকে ১১৯টি ওপেন স্পেস ইউনিটের চাহিদা তৈরি হয়। তবে ময়মনসিংহের বাস্তবতায় এতগুলো আলাদা মাঠ নির্মাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হলো ৩৩টি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে বহুমুখী নেইবারহুড পার্ক বা মাঠ, ৩৩টি অঞ্চলে একটি করে কমিউনিটি পার্ক এবং পুরো শহরের জন্য অন্তত একটি বড় সিটি পার্ক তৈরি করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘শহর মানে কেবল কংক্রিটের ভবন, ড্রেন আর রাস্তা নয়; শহর মানে মানুষের সুস্থভাবে শ্বাস নেয়ার জায়গা। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের জন্য মাঠ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমরা একটি শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু প্রজন্ম পেতে যাচ্ছি। তাই প্রশাসনের উচিত শুধু অবকাঠামো নয়, নাগরিকদের মানসিক বিকাশে পাবলিক স্পেস বা গণপরিসরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া।’ তবে আশার কথা শুনিয়েছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনায়ও রয়েছে। আমরা আশা করছি আগামীতে আমাদের নিজস্ব খেলার মাঠ থাকবে। সেই সাথে খালকেন্দ্রিক দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ করে মাঠকে পার্ক তৈরি করার কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।’

Go to News Site