Jagonews24
• ৬ বছর ধরে আমদানি বন্ধ• কেবল রপ্তানি হচ্ছে মাছ• ডলার সংকটে আমদানিকারকরা বিমুখ• বন্ধের শঙ্কায় পুরো বাণিজ্য মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নে অবস্থিত চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে পণ্য আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমদানির পর এবার ধস নেমেছে রপ্তানি বাণিজ্যেও। বর্তমানে এই রুটে মাছ ছাড়া অন্য কোনো পণ্য ভারতে যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, অবকাঠামোগত সমস্যা ও ডলার সংকটের সমাধান না হলে যেকোনো সময় মাছ রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর থেকেই চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন ও অভিবাসন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। একসময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহর ও আগরতলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এ রুট দিয়ে প্রচুর ফল, কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হতো। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। তবে ২০২০ সাল থেকে ডলার সংকট ও শুল্ক (ট্যাক্স) বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য থমকে যায়। সবশেষ ২০২৪ সাল থেকে মাছ ছাড়া আর কোনো পণ্যই রপ্তানি হচ্ছে না। সময় যত যাচ্ছে, এ বন্দরে বাণিজ্য ততই সংকুচিত হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২০ সাল থেকে আমদানিতে ভাটা পড়ে আর এখন বন্ধের পথে রপ্তানি। মাত্র দুই বছর আগেও এ রুট দিয়ে নিয়মিত মাছ, সিমেন্ট, প্লাস্টিক সামগ্রী ও জুসসহ নানা পণ্য রপ্তানি হতো। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, সংকট ও অতিরিক্ত করের কারণে এখন কেবল মাছ রপ্তানিই কোনোমতে টিকে আছে। আগে সিমেন্ট ও প্লাস্টিক পণ্য পাঠানো গেলেও এখন ভারতের ব্যবসায়ীরা তা নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এছাড়া আগে নিয়মিত ফল ও সবজি আমদানি হলেও বর্তমানে বছরে কেবল দুই-একটি গাড়ি আদা আমদানি করা হয়। আরও পড়ুন:খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধসবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল সরেজমিনে চাতলাপুর শুল্ক স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, বিডিএফ অ্যাগ্রো, জারা এন্টারপ্রাইজ, ফাবি এন্টারপ্রাইজ, রিমন ট্রেডার্স ও প্রাণ-আরএফএলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আগে এখানে নিয়মিত বাণিজ্য করতো। ছয় বছর ধরে আমদানি বন্ধ থাকলেও গত দুই বছর ধরে রপ্তানিও প্রায় বন্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সীমান্তের অবকাঠামো দুর্বলতা, মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা ও রাস্তার বেহাল দশার কারণে তারা এ রুট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ‘ডলার সংকটের কারণে আমদানিমূল্য অনেক বেড়ে গেছে, তাই আমদানি পুরোপুরি বন্ধ। আগে মাছ ও প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করা হতো, কিন্তু দুই বছর ধরে প্লাস্টিক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। কিছু পণ্য ৯৫ রুপিতে কিনে ডলার সংকটের কারণে ৮০-৮২ রুপিতে বিক্রি করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান এড়াতে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।’ শুল্ক স্টেশনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালেও প্রতি মাসে গড়ে ৪০০-৫০০ টন মাছ, ৫০০-৬০০ টন সিমেন্ট এবং ৫০-৭০ টন প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হতো। তবে গত দুই বছরে মাছ ছাড়া বাকি সব পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে কেবল আদা ও সাতকরা আমদানি করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তর করা হলে পুরো অঞ্চলের দৃশ্যপট বদলে যাবে। আমদানি ও রপ্তানিকারক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, প্রধানত ডলার সংকট, অতিরিক্ত কর ও ভারতীয় বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না পাওয়ায় এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভারত থেকে কাঙ্ক্ষিত পণ্য পাওয়া যায় না বলে আমদানিও বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশনটি ত্রিপুরা রাজ্যের এক প্রান্তে হওয়ায় ভৌগোলিক কারণেও বাণিজ্য কিছুটা কম হয়। তবে দুই দেশের যৌথ আলোচনার মাধ্যমে শুল্কহার কমানো গেলে আবারও বাণিজ্য গতিশীল করা সম্ভব। আরও পড়ুন:আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পবন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্যপ্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’ ফাবি এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে আমদানিমূল্য অনেক বেড়ে গেছে। তাই আমদানি পুরোপুরি বন্ধ। আগে মাছ ও প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করা হতো, কিন্তু দুই বছর ধরে প্লাস্টিক রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। কিছু পণ্য ৯৫ রুপিতে কিনে ডলার সংকটের কারণে ৮০-৮২ রুপিতে বিক্রি করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান এড়াতে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।’ ‘বর্তমানে মাছ ছাড়া তেমন কিছু রপ্তানি হয় না। একইভাবে মাঝেমধ্যে আদা ও সাতকরা ছাড়া কিছুই আমদানি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা শুল্ক বৃদ্ধি ও ডলার সংকটের কথা জানিয়ে বাণিজ্য কমিয়ে দিয়েছেন। আমরা এই রুটে সব ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি সচল করতে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছি। বাণিজ্য বাড়লে এই অঞ্চলটি একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক জোনে পরিণত হবে।’ আমদানি ও রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী রুবেল আহমদ বলেন, চাতলাপুর স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে আগে নিয়মিত আমদানি রপ্তানি করা হতো। বিশেষ করে প্লাস্টিক, মাছ, সিমেনসহ অন্যান্য জিনিসপত্র। তবে যত সময় যাচ্ছে এই স্টেশন দিয়ে বৃহৎ আকারে আমদানি-রপ্তানি করার কথা থাকলেও সময়ের সাথে সঙ্গে তা কমে আসছে। এই স্থলবন্দর নিয়ে এখনই ভারত-বাংলাদেশ আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। চাতলাপুর শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মং সাচিং মারমা বলেন, ‘বর্তমানে মাছ ছাড়া তেমন কিছু রপ্তানি হয় না। একইভাবে মাঝেমধ্যে আদা ও সাতকরা ছাড়া কিছুই আমদানি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা শুল্ক বৃদ্ধি ও ডলার সংকটের কথা জানিয়ে বাণিজ্য কমিয়ে দিয়েছেন। আমরা এ রুটে সব ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি সচল করতে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছি। বাণিজ্য বাড়লে এ অঞ্চলটি একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক জোনে পরিণত হবে।’ এ বিষয়ে মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও ব্যবসায়ী নেতা হাসান আহমেদ জাবেদ বলেন, চাতলাপুর স্থল ও শুল্ক স্টেশন পুরোপুরি চালু হলে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের আমূল পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ব্যাবসায়িক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোসহ নানা সমস্যার কারণে আমদানি ও রপ্তানি কমে যাচ্ছে। সরকারের কাছে স্থলবন্দরটি পুরোদমে চালু করার দাবি জানাচ্ছি। এমএন/এমএস
Go to News Site