Collector
মাতৃত্ব | Collector
মাতৃত্ব
Jagonews24

মাতৃত্ব

তিনি শুধু একজন মা ছিলেন না,তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব।গ্রামের ধুলো মাখা উঠোন থেকেতিনি দাঁড়িয়েছিলেন মানুষের পাশে,দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে,কুসংস্কারের বিরুদ্ধে,দুর্নীতির বিরুদ্ধে,কুশিক্ষার অন্ধকারের বিরুদ্ধে। যখন চারদিকে ছিল ভয়,অভাব, অনিশ্চয়তা আর অবহেলা,তখন তিনি শিখিয়েছিলেনএকজন মায়ের শক্তি কত বড় হতে পারে।তিনি বলতেন,‌‘সন্তানকে শুধু বড় করলেই হয় না,মানুষ করতে হয়।’ ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা দিনগুলোতেতিনি দেখেছিলেন একটি জাতির জন্ম।আর সেই সময় থেকেইনিজের ঘরের সন্তানদের মাঝেওস্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিলেন।তিনি বিশ্বাস করতেন,গ্রামবাংলার কাঁচা মাটির ঘর থেকেওজন্ম নিতে পারে বিজ্ঞানী,গবেষক,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,বিশ্বমানের নাগরিক। তিনি কোনো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন না,কোনো রাষ্ট্রীয় পদকও পাননি,কিন্তু তাঁর জীবন ছিল এক চলমান বিদ্যালয়।গ্রামের নারীদের তিনি বুঝিয়েছেনমাতৃত্ব মানে শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া নয়,মাতৃত্ব মানে চরিত্র গড়া,সাহস শেখানো,মানুষকে আলোকিত করা। ব্রিটিশ শাসনের ছায়ায় জন্ম নেওয়া সেই নারীপাকিস্তানি বৈষম্যের সময় পেরিয়েস্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন।তিনি জানতেন,একটি শিক্ষিত মাএকটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। নয়টি সন্তানকে তিনি বড় করেছেনঅক্লান্ত শ্রমে,অসীম ধৈর্যে,অদম্য বিশ্বাসে।তিনি প্রমাণ করেছেন,বাংলার মায়েরা চাইলেবিশ্বের প্রথম সারির নাগরিক তৈরি করতে পারেন।একটি গ্রামের মাবিশ্বকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখাতে পারেন। আমার আর মায়ের সম্পর্কআজকের নয়,এটি বহু বছরের জমে থাকানিঃশব্দ ভালোবাসার ইতিহাস। শৈশবের হাত ধরা পথ থেকেজীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত পর্যন্ততিনি ছিলেন আমার সাহস,আমার প্রথম বিদ্যালয়,আমার পৃথিবীকে দেখার জানালা। তারপর একদিনজীবনের প্রয়োজনেআমি হয়ে গেলাম দূর পরবাসী।বাংলার মাটির গন্ধ পেছনে ফেলেউত্তরের শীতল দেশেনতুন জীবন গড়ার সংগ্রাম শুরু হলো। কিন্তু দূরত্ব কখনোমায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ককে ভাঙতে পারেনি।হাজার মাইল দূরে থেকেওফোনের ওপারে তার কণ্ঠ শুনলেইমনে হতোআমি এখনো সেই গ্রামের সন্তান,যার জন্য মা রাত জেগে দোয়া করেন। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের প্রবাস জীবনেমায়ের ভালোবাসাই ছিলআমার শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ।আর তার জীবনের শেষ পনেরো বছরেবাংলাদেশ আর সুইডেনের মাঝখানেতিনি হয়ে উঠেছিলেনআমার দুই পৃথিবীর নীরব সেতুবন্ধন। আমার নতুন দেশের প্রতিটি পদক্ষেপেছিল তার আশীর্বাদ,ছিল তাঁর বিশ্বাস,ছিল তার নীরব উপস্থিতি। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই।২০০৬ সালের ডিসেম্বরের এক নীরব দিনেতিনি পৃথিবীর দায়িত্ব শেষ করেচলে গেছেন অনন্তের পথে।এখন তিনি ঘুমিয়ে আছেনসুইডেনের লিনশোপিং শহরের স্লাকা গ্রামেরএকটি শান্ত মুসলিম কবরস্থানে। তবুও আমি জানি,তিনি হারিয়ে যাননি।কারণ সন্তানের হৃদয়েমায়েরা কখনো মারা যান না। সফলতার আনন্দে,নিঃসঙ্গ রাতের নীরবতায়,অচেনা শহরের ভিড়ে,আজও আমি অনুভব করিতিনি ঠিক পাশে আছেন।যেন দূর আকাশের ওপার থেকেএখনো বলছেন,“মানুষের মাঝে তুমি মানুষ হয়ে বেঁচে থেকো বাবা।” মা দিবস শুধু একটি দিন নয়,এটি সেই মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতাযিনি নিজের জীবন নিঃশেষ করেসন্তানের ভবিষ্যৎ আলোকিত করেন। আজকের পৃথিবীতেযখন মানুষ পরিচয় খুঁজে ফেরেক্ষমতায়, সম্পদে, বাহ্যিক সাফল্যে,তখন আমি গর্ব করে বলতে চাই,আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়আমি একজন বাংলার মায়ের সন্তান। পৃথিবী জানুক,বাংলার মায়েরা শুধু সন্তান জন্ম দেন না,তাঁরা ইতিহাসও গড়েন।আমার মায়ের জীবনই ছিলতার এক নীরব প্রমাণ। আর পৃথিবীর বহু অজানা সাফল্যের পেছনেনীরবে দাঁড়িয়ে থাকেনএকজন বাংলার মা। হয়তো কাঁচা মাটির ঘরে বসেসন্তানের জন্য ভাত তুলে দিচ্ছেন,হয়তো গভীর রাতেঅন্ধকারের মধ্যে হাত তুলে দোয়া করছেন,হয়তো নিজের স্বপ্নগুলো নিঃশব্দে সরিয়ে রেখেসন্তানের ভবিষ্যৎ আলোকিত করছেন। পৃথিবী অনেক মহান মানুষের নাম মনে রাখে,কিন্তু তাদের পেছনে থাকামায়ের নীরব ত্যাগের ইতিহাসখুব কম মানুষই লিখে রাখে। রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।rahman.mridha@gmail.com

Go to News Site