Collector
চতুর্মুখী চাপে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষি | Collector
চতুর্মুখী চাপে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষি
Jagonews24

চতুর্মুখী চাপে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষি

• এক মণ ধানেও মিটছে না একজন শ্রমিকের মজুরি• খরচের ভারে কুপকাত কৃষক• বিক্রির সময় মণপ্রতি দুই কেজি বেশি দিতে হয় ধান• চাষ করে কৃষক, গোডাউনে ধান দেয় সিন্ডিকেট দেশের সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলায় পুরোদমে শুরু হয়েছে ধান কাটা ও মাড়াই। তবে সোনালি ফসলের হাসিতেও মলিন কৃষকের মুখ। ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। অনেক জায়গায় উৎপাদন খরচতো দূরে কথা, ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক। টানা বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের সংকটকালীন সময়ে ধান কাটা ও মাড়াই মেশিনের অভাব, নিম্নাঞ্চলের পানি বের হওয়ার জায়গায় বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার ও জবরদখল এবং শ্রমিকের চড়া মজুরিদে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষিরা। কৃষকরা জানিয়েছেন, ধানের দাম ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। আর সিন্ডিকেটের থাবায় সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে ধান-চাল দিতেও পারেন না প্রান্তিক অঞ্চলের কৃষকরা। সেখানে ধান দেন রাজনৈতিক নেতা ও বড় বড় পাইকাররা। যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠছে না। শেরপুরের বার্ষিক চাল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে বোরো আবাদ থেকে। বোরো ধানের মৌসুম চলে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। সংকট নিরসনে সরকার এরই মধ্যে বোরো ধান সংগ্রহ শুরু করেছে। তবে কৃষকরা তার আগেই চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি শুরু করে দিয়েছেন। তবে প্রতিমণে দুই কেজি বেশি করে দিতে হচ্ছে। ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের নাওকুঁচি গ্রামের জাহেদ আলী বলেন, ঝিনাইগাতী সদর বাজারের ধানের হাট হচ্ছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট। হাটে ধান বিক্রি করতে গেলে প্রতিমণে দুই কেজি ধান বেশি দিতে হয়। ১০ মণ ধানে তাহলে আধা মণ চলে যায়। পাশে থাকা কৃষক শহিজল ইসলাম বলেন, ‘বাপুরে, ধান বিক্রি করতে গেলে ৪২ কেজিতে এক মণ ধরে কেনে তারা। সব পাইকাররা একইভাবে কেনে। এতে আমাদের অনেক লোকসান হয়।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে একই গ্রামের মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ধান কিনতে গেলে ৪০ কেজি টানটান ওজনে মেপে দেয় আর বিক্রি করতে গেলে দেড় থেকে দুই কেজি বেশি দিতে হয় প্রতি মণে। বইখাতায় লেখা ৪০ কেজিতে এক মণ, আর এখানে ৪২ কেজিতে এক মণ। আমাদের দেখার কেউ নেই।’ এদিকে সরকার ৩৬ টাকা কেজিতে ধান কিনছে, যা প্রতিমণের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু এ দরে কৃষক ধান বিক্রি করতে পারে না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন কৃষকরা। শেরপুর সদর উপজেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের যোগিনীবাগ গ্রামের কৃষক রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমার দাদা এ অঞ্চলে প্রায় ৩০ বছর ইউপি সদস্যের দায়িত্বে ছিলেন। অনেক ধানচাষি এসে সরকারি গোডাউনে ধান দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলতেন, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। আমি নিজেও অনেকবার চেষ্টা করেছি, তৃতীয়পক্ষ ছাড়া সেখানে ধান দেওয়া সম্ভব না।’ পার্শ্ববর্তী যোগিনীমুড়া এলাকার কৃষক মেজবাউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রায় ১০ একর জমিতে ধান চাষ করতাম। কিন্তু সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে পারিনি। আমরা ধান নিয়ে গেলে, নানাবিধ প্রশ্ন আর কাগজপত্র চান গোডাউনের লোকজন। কিন্তু যারা কৃষক না, এমন সিন্ডিকেটের কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের কিছুই লাগে না। এজন্য রাগ করে সব জমিতে কলা চাষ করেছি।’ শ্রীবরদী উপজেলার খড়িয়া কাজির চরের কৃষক মাহফুজ মিয়া বলেন, ‘সরকার ধান কিনছে ১৪০০ টাকায়। আর আমরা হাটে বিক্রি করছি ৭০০-৮০০ টাকায়। আমাদের ধান গোডাউনে নেয় না। দালালদের ধান গোডাউনে যায়। যারা জীবনে মাঠে গিয়ে ধানের কাজ করেনি, এসি রুমে বসে থাকে, তারাই গোডাউনের লোকজনের কাছে বড় কৃষক!’ এদিকে দেড় মণ ধানেও মিলছে না একজন শ্রমিকের মজুরি। ১ হাজার থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত একজন শ্রমিকের মজুরি। নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বোরো চাষি আলমাস আলী বলেন, ধানের দাম কমে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। হালচাষ, সেচ, কীটনাশক সবকিছুর খরচ বেড়েছে। দোকানের ধার-দেনা, ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবো সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। বর্তমানে একজন শ্রমিকের জন্য ১ হাজার থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। জেলার বোরো চাষিরা জানান, এবার ধান উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় গত বছরের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২০ শতাংশ। এতে প্রতি মণ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১১০০ টাকার বেশি। কিন্তু ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে মণ। ফলে লোকসান গুনছেন তারা। ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, বাজারে প্রতিমণে দুই কেজি বেশি ধান রাখার তথ্যটি শুনেছি। হাটে গিয়ে দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ কোনোভাবেই আমাদের কৃষক ভাইদের প্রতি অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না। তারা দেশের অহংকার। বাংলাদেশ কৃষক সমিতির শেরপুর জেলার সভাপতি সোলাইমান আহমেদ বলেন, সরকার ধান ও চাল কেনে দুটি কারণে। একটি সরকারের প্রয়োজনীয় মজুত তৈরি, অন্যটি হচ্ছে কৃষক যাতে দাম পায়। কিন্তু এই কেনাকাটার সময় নির্ধারণের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে বছরের পর বছর কৃষকরা ঠকে আসছে। কৃষকদের জায়গায় সরকারি গোডাউনে ধান চাল বিক্রি করে একটি সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। যেখানে প্রশাসন নির্বিকার। ফলে সরকারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য সফল হয় না। তিনি বলেন, একদিকে বাজারে কৃষক ঠকছে, অন্যদিকে সরকারের কাছেও ধান বিক্রি করতে পারছে না তারা। সরকারের নির্ধারিত দরে কৃষকরা সার কিনতে পারে না, ১০৫০ টাকার বস্তা ১৫০০ টাকার কমে পাওয়া মানে যুদ্ধ জয় করা। ডিজেল সংকটের কারণে সেচ ব্যাহত হওয়ায় আবাদে ফলন কমেছে। সব মিলিয়ে চতুর্মুখী চাপে রয়েছেন শেরপুরের কৃষকরা। এফএ/এমএস

Go to News Site