Somoy TV
কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কার্যকরভাবে বজায় আছে কি না-এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সিভিল সোসাইটি ও এনজিও কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগে নতুন করে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে, পাশাপাশি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।সোমবার (১১ মে) দুপুরে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ‘কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিওর কর্মকর্তারা দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে একটি পৃথক কমিশন গঠনের দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমানে কক্সবাজারে ১৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার উপস্থিতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে সংকট শুরুর পর স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে কো-চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং নাফ নদীতে জোরদার টহল নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্তে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং এতে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বক্তারা অভিযোগ করেন, উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য ইট, সিমেন্ট ও লোহা দিয়ে স্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাদের মতে, বিশ্বের অন্য কোথাও শরণার্থী সংকটে এ ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নজির নেই। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় সরকার ও জনগণের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই নেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়।সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় এনজিওদের পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তারা দাবি করেন, মানবিক সহায়তার অর্থ বরাদ্দে স্থানীয় এনজিওর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং কমপক্ষে ২৫ শতাংশ তহবিল সরাসরি স্থানীয় সংস্থাগুলোকে দিতে হবে। তারা আরও অভিযোগ করেন, কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকাণ্ড প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারে।আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন শেল্টার নির্মাণ নিয়ে যা বলছে ইউএনএইচসিআর বক্তারা জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। বিকল্প হিসেবে নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের প্রস্তাব দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এ অবস্থায় একটি জবাবদিহিমূলক ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠনের দাবি জানানো হয়, যা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও জনগণের সামনে তুলে ধরবে। বক্তারা বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় গঠিত বিভিন্ন সমন্বয় কাঠামোতে স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ অংশগ্রহণ নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এসব কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।সিসিএনএফের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর ব্র্যাক ও ইনফিনিক্সের মাধ্যমে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী কাঠামোর ঘর নির্মাণ করছে। যা স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তিনি বলেন, এর ফলে স্থানীয়দের মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। নির্মাণে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে যা পরিবেশবান্ধব নয় (যেমন প্লাস্টিক ত্রিপল)। তিনি আরও বলেন, সারা পৃথিবীতে শরণার্থীদের জন্য এমন কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নজির নেই। এটা বাস্তবায়ন হলে আরও রোহিঙ্গার ঢল সামলাতে হবে। তাই এ সিদ্ধান্ত জনগণ ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে বলেও জানান জাহাঙ্গীর আলম। সিসিএনএফের সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে ১৫০ মিলিয়ন তহবিল দিয়েছে। যার ৯২% জাতিসংঘ ও ৮% আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেয়া। কিন্তু তাদের স্থানীয়করণ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই তহবিলের ২৫% সরাসরি স্থানীয় এনজিওকে দেয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, মহান সংসদে আইন করা উচিত যাতে জাতিসংঘের কোনো সংস্থা স্থানীয় এনজিও ব্যতিরেখে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারে। পাশাপাশি তিনি যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনাকে (Joint Response Plan) স্থানীয় এনজিওর জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান, যেখানে বেশির ভাগ জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এনজিও দখল করে আছে। কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, ব্র্যাক স্থানীয় এনজিওর জন্য একটি পুল ফান্ড বাস্তবতায় করছে। এতে মাত্র ২২% স্থানীয় এনজিও এবং ৭৮% জাতীয় এনজিও তহবিল পাচ্ছে। কিন্তু এই তহবিল তো স্থানীয় এনজিওর জন্য। সিইএইচআরডিএফর প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য ৮০০০ একর বনভূমি নষ্ট করে তাদের থাকার ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে। বনভূমির এই ধ্বংস কক্সবাজারের পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে আসছে। পানির স্থর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ করে নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা এবং পুকুর খননের ওপর জোর দেন তিনি। কম্বাইন হিউম্যান রাইটস ওয়াল্ডের কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হাসান বলেন, ক্যাম্পে এনজিও সুশীলনের মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য কর্মুসচি রোহিঙ্গাদের ভেন্ডরশিপ প্রদান করার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। এ ধরনের কার্যক্রমকে সঠিকভাবে তদারকি করা জরুরি।
Go to News Site