Collector
একটি কোল শূন্য হওয়া মানে একটি পৃথিবী নিভে যাওয়া | Collector
একটি কোল শূন্য হওয়া মানে একটি পৃথিবী নিভে যাওয়া
Jagonews24

একটি কোল শূন্য হওয়া মানে একটি পৃথিবী নিভে যাওয়া

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৩১টি শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ২৯ হাজার ৭৪৬ শিশু। ৯ মে শনিবার পর্যন্ত সরকারি হিসেবে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৫২ শিশু। অথচ এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব এমন একটি দুর্যোগ। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা একটি কার্যকর ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেললেও তা ঠিকভাবে নতুন করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। গত দুই দশকে দেশে হাম টিকার আওতা ধীরে ধীরে বেড়েছিল এবং এটি স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ ছিল। কিন্তু অবহেলা ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেই সাফল্য আজ ম্লান হয়ে গেছে। আমাদের দেশে নতুন সরকার এসে আগের ব্যবস্থার ওপর সন্দেহ করে এবং সেটি পরিবর্তন করতে গিয়ে পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলে। ১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি মার্চ ২০২৫-এ কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই বাতিল করা হয়। পরে যে অস্থায়ী প্রকল্প নেয়া হয়, সেটিও নভেম্বর ২০২৫-এর আগে অনুমোদন পায়নি। ফলে টিকা কেনা বন্ধ হয়ে যায়, ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের সরবরাহ কমে যায় এবং জরুরি মজুদও শেষ হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা। আমরা জানতাম বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করত কিন্তু কর্মকর্তারা হঠাৎ করে নিয়ম বদলে অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও তাদের এ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না এবং ইউনিসেফ এ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। ফলাফল—নতুন কোনো পদ্ধতিতেই একটি টিকাও দেশে আসেনি। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এমন ভুলের সুযোগ নেই। একটি ভবনের প্রধান দেয়াল ভাঙার আগে যেমন বিকল্প কাঠামো নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বন্ধ করার আগেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা জরুরি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা স্থগিত করেছে, জনবল কাঠামো বাতিল করেছে এবং অর্থায়নের প্রক্রিয়া আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই সংকটে পড়েছে। ফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এমন ভুলের সুযোগ নেই। একটি ভবনের প্রধান দেয়াল ভাঙার আগে যেমন বিকল্প কাঠামো নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বন্ধ করার আগেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা জরুরি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা স্থগিত করেছে, জনবল কাঠামো বাতিল করেছে এবং অর্থায়নের প্রক্রিয়া আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই সংকটে পড়েছে। ফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেছেন, কর্মকর্তারা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন না এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেরি হয়েছে। তিনি আরো জানান, ইউনিসেফের সতর্কবার্তা তিনি গত ৩০ ডিসেম্বরে পান। কিন্তু এর আগেই বিশেষজ্ঞরা টিকা কাভারেজ কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। সারা দেশে ২০২০ সাল থেকেই বকেয়া থাকা অতিরিক্ত হাম টিকাদান কর্মসূচি আরো পিছিয়ে এপ্রিল ২০২৬-এ নেয়া হয়, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব যথাসময়ে অনুধাবন করতে না পারার ইঙ্গিত দেয়। এর ফল ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ১৪ শতাংশ পেয়েছিল মাত্র একটি ডোজ। অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ব্যবস্থাগত ফাঁকেই তারা পড়ে গেছে। এছাড়া কৃমিনাশক ও ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিও এক বছরের বেশি সময় বন্ধ ছিল, যা শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরো দুর্বল করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো আগের ব্যবস্থাকে উন্নত করা, কিন্তু তা করতে হলে পরিকল্পনা ও সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে ব্যর্থতার মানে হলো মানুষের জীবনহানি। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তগুলো সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এখন প্রয়োজন একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি, যারা প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করবে। শিশুদের এ মৃত্যুগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যারা একটি কার্যকর কর্মসূচিকে ভেঙে দিয়েছে, তাদের প্রত্যেকটি মৃত্যুর জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যে বাবা-মায়ের কোল শূন্য হচ্ছে তাদের কথা ভাবতে হবে। যে শিশুরা আক্রান্ত হয়েছে তাদের বাঁচাতে হবে। এভাবে প্রতিদিন শিশুদের অকাল মৃত্যু আর দেখতে চাইনা। লেখক : সাংবাদিক। এইচআর/জেআইএম

Go to News Site