Collector
কিশোরীদের মাসিকের ব্যথা বেশি হয় কেন? যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন | Collector
কিশোরীদের মাসিকের ব্যথা বেশি হয় কেন? যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
Jagonews24

কিশোরীদের মাসিকের ব্যথা বেশি হয় কেন? যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

‘মাসিকের ব্যথা’ নারীদের জীবনের এক পরিচিত বাস্তবতা। তবে এই ব্যথা কি সব বয়সে একই থাকে? কেন কিশোরীদের বেশি কষ্ট হয়, আবার বয়স বাড়লে অনেকের কমে যায়? হঠাৎ ব্যথা বেড়ে গেলে কি সেটি কোনো জটিলতার ইঙ্গিত? এমন নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীনের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ।  জাগো নিউজ: মাসিকের ব্যথা কি সব বয়সেই একই রকম হয়, নাকি বয়সভেদে এর মাত্রা পরিবর্তিত হয়? ডা. রুখসানা পারভীন: মাসিকের ব্যথা সব বয়সে একরকম থাকে না, এটি বয়সভেদে পরিবর্তিত হয়। কিশোরী বয়সে সাধারণত ব্যথা বেশি হয়, কারণ তখন শরীর নতুন করে হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে থাকে। প্রজনন বয়সে অনেক নারীর ক্ষেত্রে ব্যথা কিছুটা সহনীয় হয়ে আসে, আবার সন্তান জন্মের পর অনেকের ক্ষেত্রে তা আরও কমে যায়। অন্যদিকে, ৩০ বা ৪০ বছরের পর যদি নতুন করে ব্যথা শুরু হয় বা বেড়ে যায়, সেটি স্বাভাবিক নয়; বরং কোনো শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। জাগো নিউজ: কিশোরী বয়সে (প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার সময়) ব্যথা বেশি হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো কী? ডা. রুখসানা পারভীন: প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার সময় শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ বেশি পরিমাণে তৈরি হয়। এটি জরায়ুর পেশিকে সংকুচিত করে, যেন রক্ত বের হতে পারে। কিন্তু এই সংকোচন যখন বেশি হয়, তখনই ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে। এছাড়া, এই বয়সে জরায়ুর মুখ (সার্ভিক্স) তুলনামূলক সংকীর্ণ থাকে, ফলে রক্ত বের হতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি হয় এবং ব্যথা বাড়ে। মানসিক চাপ, ভয় বা অজানা উদ্বেগও এই সময় ব্যথার অনুভূতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। জাগো নিউজ: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাসিকের ব্যথা কমে যায়, এর কারণ কী? ডা. রুখসানা পারভীন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের হরমোনগুলো একটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছায়। জরায়ুর গঠনেও কিছু পরিবর্তন আসে। যারা সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে জরায়ুর মুখ কিছুটা প্রসারিত থাকে, ফলে মাসিকের রক্ত সহজে বের হতে পারে। এতে জরায়ুর অতিরিক্ত সংকোচনের প্রয়োজন হয় না, ফলে ব্যথা কম অনুভূত হয়। এছাড়া, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক নারী নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হন এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনেন, যা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। জাগো নিউজ: ৩০ বা ৪০ বছরের পর হঠাৎ করে মাসিকের ব্যথা বেড়ে গেলে সেটি কি কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে? ডা. রুখসানা পারভীন: অবশ্যই হতে পারে। এই বয়সে হঠাৎ ব্যথা বেড়ে যাওয়া বা নতুন করে ব্যথা শুরু হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষণ। এটি এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর ফাইব্রয়েড, অ্যাডেনোমায়োসিস বা পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজের মতো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। অনেক সময় জরায়ুর ভেতরের টিস্যু বাইরে ছড়িয়ে পড়লে (এন্ডোমেট্রিওসিস) তীব্র ব্যথা হয়। আবার ফাইব্রয়েড হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও ব্যথা-দুটোই দেখা দিতে পারে। তাই এই ধরনের পরিবর্তন হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। জাগো নিউজ: বয়স ছাড়াও কোন কোন শারীরিক বা হরমোনজনিত কারণ মাসিকের ব্যথাকে প্রভাবিত করে? ডা. রুখসানা পারভীন: বয়স ছাড়াও অনেকগুলো বিষয় মাসিকের ব্যথাকে প্রভাবিত করে। যেমন- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের অসামঞ্জস্যতা অতিরিক্ত প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন উৎপাদন থাইরয়েড সমস্যাও কখনো ভূমিকা রাখতে পারে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন শরীরে প্রদাহজনিত সমস্যা এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কোনো গাইনি সমস্যা থাকলে সেটিও ব্যথার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। জাগো নিউজ: যারা অল্প বয়স থেকেই তীব্র মাসিক ব্যথায় ভোগেন, তাদের ভবিষ্যতে ঝুঁকি বেশি থাকে কি? ডা. রুখসানা পারভীন: সব ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে এমনটা বলা যাবে না। অনেক নারীর ক্ষেত্রেই এটি প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া, যা বয়সের সঙ্গে কমে যায়। তবে যদি ব্যথা খুব বেশি হয়, নিয়মিত হয় এবং ব্যথানাশকেও কাজ না করে, তাহলে সেটি সেকেন্ডারি কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো রোগ দীর্ঘদিন অচিহ্নিত থাকলে ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই তীব্র ব্যথা থাকলে সেটিকে অবহেলা না করে পরীক্ষা করানো উচিত। জাগো নিউজ: জীবনযাত্রা (খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, স্ট্রেস) কি বয়সের তুলনায় বেশি প্রভাব ফেলে মাসিকের ব্যথায়? ডা. রুখসানা পারভীন: অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার প্রভাব বয়সের থেকেও বেশি হতে পারে। অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ফাস্টফুড বা অস্বাস্থ্যকর খাবার এসব শরীরে প্রদাহ বাড়ায় এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অন্যদিকে, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ এসব মাসিকের ব্যথা কমাতে খুব কার্যকর ভূমিকা রাখে। মানসিক প্রশান্তিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জাগো নিউজ: বয়স অনুযায়ী মাসিকের ব্যথা কমানোর চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনায় কি কোনো পার্থক্য আছে? ডা. রুখসানা পারভীন: হ্যাঁ, বয়স অনুযায়ী চিকিৎসার ধরন ভিন্ন হয়। কিশোরীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যথানাশক ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রজনন বয়সে হরমোনাল থেরাপি বা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার করা হতে পারে। আর বয়স বেশি হলে বা কোনো রোগ ধরা পড়লে তার নির্দিষ্ট চিকিৎসার (যেমন: অপারেশন) প্রয়োজন হতে পারে। তাই রোগীর বয়স, উপসর্গ এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। আরও পড়ুননীরবে বাড়ছে কোলোরেক্টাল ক্যানসার, সচেতনতার ঘাটতিতে দেরিতে শনাক্তবমি-ডায়রিয়া হালকাভাবে নেবেন না, হতে পারে ‘স্টমাক ফ্লু’ভয় নয়, সময়মতো সার্জারি বাঁচাতে পারে জীবন জাগো নিউজ: একজন নারীর কখন মাসিকের ব্যথাকে স্বাভাবিক না ভেবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত? ডা. রুখসানা পারভীন: যদি মাসিকের ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়, অথবা হঠাৎ করে ব্যথার ধরন বদলে যায় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এছাড়া অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অনিয়মিত মাসিক, সহবাসের সময় ব্যথা বা মাসিকের বাইরেও পেলভিক পেইন থাকলে সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এই লক্ষণগুলো অনেক সময় গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। জাগো নিউজ: মাসিকের ব্যথা নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো কী এবং সেগুলো কতটা ক্ষতিকর? ডা. রুখসানা পারভীন: সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, ‘মাসিকের ব্যথা স্বাভাবিক, সহ্য করতেই হবে।’ এই মানসিকতা নারীদের চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত করে। অনেকে আবার মনে করেন, বিয়ে বা সন্তান হলেই ব্যথা পুরোপুরি সেরে যাবে, যা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। এই ভুল ধারণাগুলোর কারণে অনেক নারী দেরিতে চিকিৎসা নেন, ফলে রোগ জটিল হয়ে যায়। তাই সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। জাগো নিউজ: সবশেষে পাঠকদের জন্য যদি কোনো বার্তা দিতেন। ডা. রুখসানা পারভীন: অবশ্যই। মাসিকের ব্যথাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। শরীরের যে কোনো পরিবর্তনই একটি বার্তা দেয়। সেই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো পদক্ষেপ নিলেই সুস্থ থাকা সম্ভব। জেএস/এমএমএআর

Go to News Site