Collector
ঋণ করে ফলানো আলুই এখন কৃষকের ‘গলার কাঁটা’ | Collector
ঋণ করে ফলানো আলুই এখন কৃষকের ‘গলার কাঁটা’
Somoy TV

ঋণ করে ফলানো আলুই এখন কৃষকের ‘গলার কাঁটা’

ঋণ নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদন করা আলুই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য। একদিকে বাজারে চাহিদা নেই, অন্যদিকে সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার মেট্রিক টন আলু। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা।রংপুরের পীরগাছার কৃষক ফজলুর রহমান ও আশিকুর রহমান স্বপ্ন দেখেছিলেন, আলুর ভালো দাম পেলে সংসারের চাকা ঘুরবে। কিন্তু সেই আলুই এখন তাদের দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মজুত রাখা আলু পচে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সেগুলো ফেলে দিতে হচ্ছে। ঋণের কিস্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। সময় সংবাদকে ফজলুর রহমান বলেন, ধারদেনা করে এবার প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, আলুর দাম নেই। হিমাগারে জায়গা না পাওয়ায় বাড়িতেই বস্তায় করে আলু রেখেছিলাম। এখন সেগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাধ্য হয়ে বস্তাসহ প্রায় সব আলু ফেলে দিচ্ছি। আরও পড়ুন: কুড়িগ্রাম / আলুর দরপতনে বিপাকে কৃষক, হিমাগারে রাখার পরামর্শ কৃষি বিভাগের আরেক কৃষক আশিকুর রহমান বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আলু আবাদ করেছি। কিন্তু এবার এই আলুই সর্বস্বান্ত করে দিল। বাজারে দাম নেই, হিমাগারেও জায়গা পাইনি। বাড়িতে এনে রাখার পর এখন আলুতে পচন ধরেছে। সব আলু মাটি খুঁড়ে পুঁতে রেখেছি যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়। এদিকে এনজিওর লোকজন প্রতিদিন কিস্তির জন্য বাড়িতে আসে। ভয়ে বাড়িতেই থাকি না। সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবে তাও জানি না। সরেজমিনে রংপুরের গঙ্গাচড়া, পীরগাছা, তারাগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের বাড়িতে আলুর স্তুপ পড়ে আছে। পচা আলু থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কৃষকদের দাবি, বাজারে চাহিদা কম এবং হিমাগারে জায়গার সংকটই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। পীরগাছা সদরের অনন্তরাম গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, পীরগাছার হিমাগারগুলোতে জায়গা নেই। বাইরে নিতে গেলে খরচ বেশি পড়ে। তাই বাড়িতে আলু রেখে এখন মহাবিপদে পড়েছি। মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম ছিল ১২ টাকা, এখন ৮ টাকা। অথচ উৎপাদন খরচ পড়েছে ১৬ টাকা। তার ওপর আলুতে পচন ধরেছে। এখন বিক্রি করলে অর্ধেকই লোকসান হবে। বিরাহীম গ্রামের কৃষক সাহেব আলী বলেন, এক বছর লাভ হলে দুই বছর লোকসান। এখন আলু চাষ পুরোপুরি ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। গত দুই বছর ধরে টানা লোকসানে মনোবল ভেঙে গেছে। গঙ্গাচড়ার আলুচাষি আব্দুর রহিম জানান, ঋণ করে চাষ করি। দাম না পেলে ঋণ শোধ করতেই হিমশিম খেতে হয়। এবার তো আলু পচে যাওয়ায় ক্ষতি আরও বেড়ে গেল। ইকরচালী গ্রামের কৃষক আজহারুল ইসলাম বলেন, পরে বিক্রি করলে বেশি দাম পাবো ভেবে আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন আলুর দাম ৯ টাকা। এই অবস্থা আরও ১৫ দিন চললে এবার কোরবানি দেয়া সম্ভব হবে না। আলু যেন আমাদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে। ঈদের আনন্দও কেড়ে নিয়েছে। আরও পড়ুন: আলুর দরপতনের হাহাকারের মাঝেই লোকসানের পাল্লা ভারী করল অকাল বৃষ্টি রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ বনিক বলেন, আলু চাষের সবচেয়ে বড় সংকট হলো উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের অসামঞ্জস্য। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৮ থেকে ৩০ টাকা, যা কয়েক বছর আগেও ছিল ৭ থেকে ১০ টাকার মধ্যে। বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। অথচ মৌসুমে মাঠপর্যায়ে আলুর দাম নেমে আসে ৮ থেকে ১০ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচও ওঠে না। ফলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার ও কৃষি বিভাগ কৃষকদের পাশে না দাঁড়ালে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রণোদনার আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে কৃষি বিভাগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক আলু মাঠেই পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সে কারণে কিছু এলাকায় দ্রুত আলুতে পচন ধরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাদের প্রণোদনার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে প্রায় ২৮ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু এসব আলু সংরক্ষণের জন্য ৭২টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ৭ লাখ ২৭ হাজার ৫৪৫ মেট্রিক টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। ফলে প্রায় ৭০ শতাংশ আলু সংরক্ষণ করতে না পেরে কৃষকদের উৎপাদন মৌসুমেই লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে। অনেকে আবার বাড়িতেই আলু সংরক্ষণ করছেন।

Go to News Site