Collector
বিশ্বকাপ ছেড়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে: ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ভরসা রাশিদ মেখলুফির সেই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ | Collector
বিশ্বকাপ ছেড়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে: ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ভরসা রাশিদ মেখলুফির সেই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ
Somoy TV

বিশ্বকাপ ছেড়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে: ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ভরসা রাশিদ মেখলুফির সেই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ

ফুটবল কখনো কখনো রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, আর সেই রাজনীতি বদলে দেয় ইতিহাসের গতিপথ। রাশিদ মেখলুফির গল্পটা সেরকমই। ১৯৫৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ঠিক আগে তিনি ফ্রান্স জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে এমন এক দলে যোগ দেন, যাকে তখনও ফিফা স্বীকৃতি দেয়নি। আর সেই দলটি ছিল আফ্রিকায় ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়ার স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতীক।১৯৫০–এর দশকের শেষ দিকে আলজেরিয়া পার করছিল অস্থির সময়। ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (এফএলএন) ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রাম শুরু করেছিল। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ফ্রান্স ১৯৫৮ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাশিদ মেখলুফির প্রতিভার কারণে ফ্রান্সকে শিরোপার অন্যতম দাবিদারও ধরা হচ্ছিল।তৎকালীন ফরাসি উপনিবেশ, বর্তমানে আলজেরিয়ার সেতিফে জন্ম নেওয়া মেখলুফি দ্রুতই নজর কাড়েন। তিনি সেন্ট এতিয়েনে অভিষেকের পর দারুণ পারফরম্যান্সে একবার ফরাসি লিগ শিরোপা জেতেন এবং ফ্রান্সের জার্সিতেও অভিষেক হয় তার। কিন্তু প্রথম বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময় একটি সিদ্ধান্ত তার ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়।এফএলএন স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ফুটবলকে বেছে নিয়েছিল। 'ইন্ডিপেনডেন্স ইলেভেন' নামে একটি দলও গঠন করে তারা, যা ছিল ফরাসি আলজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের একটি দল, যারা অস্তিত্বের জন্য লড়াই করা একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। রাশিদ মেখলুফি। ছবি: এল'ইকুইপেএই পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন মোহামেদ বউমেজরা।  তিনি গোপনে ফরাসি লিগে খেলা ৩৩ জন ফুটবলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন রাশিদ মেখলুফিও, যিনি দ্রুতই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগে কুরাসাও শিবিরে অঘটন১৯৫৮ সালের ১৩ ও ১৪ এপ্রিলের মধ্যে, হাঁটুর চোটের কারণে হাসপাতালে এক রাত কাটানোর পর মেখলুফি তিন সতীর্থকে নিয়ে গোপনে ক্যাম্প ছাড়েন। তারা ফ্রান্স–সুইজারল্যান্ড সীমান্তের দিকে পালিয়ে যান। তবে সবাই পালাতে সক্ষম হননি, কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হন। যারা পালাতে সক্ষম হন, তারা পৌঁছান তিউনিসে, যেটি তখন অস্থায়ী আলজেরীয় সরকারের কেন্দ্র ছিল।ফ্রান্স, এফএলএন ও ফিফার দ্বন্দ্ব:এরপর ফ্রান্স সরকার, ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের দল এবং ফিফার মধ্যে শুরু হয় এক ধরনের ত্রিমুখী লড়াই। ফরাসি সংবাদপত্র শিরোনাম করে, 'আলজেরীয় ফুটবলাররা নিখোঁজ'। বিভিন্ন ক্লাব তাদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করে দেয়। কিন্তু মেখলুফির নেতৃত্বে স্বাধীনতার দলটি বিশ্বজুড়ে সফর শুরু করে, নিজেদের দেশ ও স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরতে থাকে।প্রথমদিকে ফিফা এই দলকে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি যারা তাদের বিপক্ষে খেলবে, তাদের শাস্তির হুমকিও দিয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থান কিছুটা নরম হয়। দলটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও প্রীতি ম্যাচ খেলতে আর বাধা দেওয়া হয়নি।স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠা:১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই দলটি আলজেরীয় সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হয়। তারা বিশেষ করে এশিয়া এবং তৎকালীন কমিউনিস্ট ব্লকের বিভিন্ন দেশে সফর করে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় আলজেরীয় জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে।এই চার বছরে রাশিদ ৪০টি ম্যাচ খেলেন। এর জন্য তাকে ইউরোপীয় ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় ত্যাগ করতে হয়েছিল।অন্যদিকে ফ্রান্স জাতীয় দল ১৯৫৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে ফাইনালে উঠতে পারেনি। আজও প্রশ্ন ওঠে, মেখলুফি দলে থাকলে কি ফলটা অন্যরকম হতে পারত?স্বাধীনতা ও স্বীকৃতি:চার বছর ধরে চলমান যুদ্ধে ফরাসি জনগণের সমর্থন ক্রমেই কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে আলজেরীয় ফুটবলারদের জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন বাড়ে। এভিয়ান অ্যাকোর্ডসের মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটে এবং আলজেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর এফএলএনের দলটি নতুন জাতীয় দলে রূপ নেয়, যা পরে ফিফার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।ইউরোপে প্রত্যাবর্তন:সংগ্রাম শেষ হওয়ার পর রাশিদ কয়েকজন সতীর্থের মতো ইউরোপে ফিরে যান। তিনি আবারও সেন্ট এতিয়েনে যোগ দেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি আবার দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। তার সহায়তায় দলটি শীর্ষ বিভাগে উন্নীত হয় এবং পরে তিনটি লিগ ওয়ান শিরোপা জেতে।তিনি ১৫১ গোল করে ক্লাবটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে অবসর নেন। এছাড়া তিনবার লিগের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন।আরও পড়ুন:বার্সেলোনার শিরোপা উদ্‌যাপনে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে লামিনআলজেরিয়া জাতীয় দলে খেলোয়াড়ি এবং কোচিং ক্যারিয়ার:১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি আলজেরিয়া জাতীয় দলের হয়ে ১০টি ম্যাচ খেলেন এবং ৫টি গোল করেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি ফ্রান্স, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, তিউনিসিয়া এবং লেবাননে কোচিং করিয়েছেন। এমনকি ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে তিনি আলজেরিয়া জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের সদস্য ছিলেন।নিজ দেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া এই মহান ফুটবলার ২০২৪ সালে ৮৮ বছর বয়সে মারা যান।

Go to News Site