Collector
ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা | Collector
ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা
Jagonews24

ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরা

বৃষ্টিতেও ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। এতে বিপাকে পড়েছে ভোলার প্রায় ৩ লাখ জেলে। ইলিশ ধরা না পড়ায় এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। বাজারে ইলিশ কিনতে এসে খালি হাতে ফিরছেন ক্রেতারা। নদীতে ইলিশের এই খরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলছেন ইলিশ গবেষকরা। ভোলার সাত উপজেলায় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় ৩ লাখের বেশি জেলে। এদের মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭০ জন। দীর্ঘ দুই মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ মে থেকে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে আবারও মাছ শিকারে নেমেছেন জেলেরা। তবে নদীতে ইলিশ না পেয়ে হাহাকারে পড়েছেন এই বিশাল জনগোষ্ঠী। ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠির মাথা, ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতলি, শিবপুর ইউনিয়নের ভোলার খাল, ভেদুরিয়া ইউনিয়নের হাজির হাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। আরও পড়ুন- ভোলায় নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ শিকারে নেমেছেন জেলেরাসাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ইলিশশূন্য চাঁদপুরের ঘাটদুই মাস পর মধ্যরাতে নদীতে নামতে প্রস্তুত জেলেরা এদের মধ্যে ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠির মাথা গ্রামের জেলে মো. সৈয়দ মাঝি ও মো. মনির হোসেন মাঝি জানান, তারা দুইজন মিলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সদরের তুলাতুলি মেঘনা নদীতে একটি নৌকা নিয়ে দুইবারে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা জাল ফেলেন। কিন্তু তাদের জালে একটিও ইলিশি ধরা পড়েনি। তবে বেশ কয়েকটি বিভিন্ন সাইজের বাটা ও ছুরা বা তাপসী মাছ পেয়েছেন। তা ঘাটে বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৫০০ টাকা। ‘ক’দিন আগে নদীতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। ওই সময় অনেক ধার-দেনা করে সংসার চালিয়েছি। আজ বেশ কয়েক দিন ধরে ইলিশ পাচ্ছি না। এতে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতেও পারছি না। প্রতিদিনই সংসার ও সমিতির কিস্তির চাপে বিপাকে পড়ছি।’ প্রায় ২০ বছর ধরে জেলে পেশায় থাকা এই দুই জেলে জানান, নদীতে অনেকবার ইলিশের হাহাকার ছিল। তখনও তারা ২-৪টি ইলিশ পেয়েছেন। কিন্তু এমন হাহাকার কখনোই হয়নি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা। তুলাতুলি গ্রামের জেলে মো. শাজাহান মাঝি ও মজনু মাঝি জানান, প্রতি বছর বৃষ্টি শুরু হলে ইলিশ ধরা পড়তো। কিন্তু এ বছর মে মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও এখন পর্যন্ত তাদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না। এ বছরের মতো এমন খরা কখনোই তারা দেখেননি। নদীতে ইলিশের এমন সংকট হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ভোলার খাল এলাকার জেলে মো. রাসেল মাঝি ও নজরুল মাঝি বলেন, ‘ক’দিন আগে নদীতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। ওই সময় অনেক ধার-দেনা করে সংসার চালিয়েছি। আজ বেশ কয়েকদিন ধরে ইলিশ পাচ্ছি না। এতে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতেও পারছি না। প্রতিদিনই সংসার ও সমিতির কিস্তির চাপে বিপাকে পড়ছি।’ আরও পড়ুন- ‘নদীর সব জাটকা ধরা হয়ে গেছে, মনে হয় না সামনে ইলিশ পাবো’ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে স্যার‘ইলিশের বাড়িতেও’ বৈশাখের দাপট, কেজি সাড়ে ৩ হাজার টাকাকেজি সাইজের এক ইলিশ সাড়ে ৪ হাজার টাকা! ভেদুরিয়ার হাজির হাটের জেলে মো. নূরন্নবী মাঝি ও ইমন মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর নদীতে ইলিশের সংকট থাকায় আমাদের অনেক জেলে ভাইরা এখন নদীতে যায় না। অনেকে জেলে পেশা ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করছে। এদিকে নদীতে ইলিশ ধরা না পড়ায় এটির প্রভাব পড়েছে দেশের ৩৩ ভাগ ইলিশ আহরণের জেলা ভোলায়। ‘বাজারে এখন হাতেগোনা মাত্র ২-৩ জন ইলিশ নিয়ে আসেন বিক্রি করতে। তাও আবার মাত্র কয়েকটা ইলিশ। সেগুলো বিক্রি হয় উচ্চ মূল্যে। বাজারে ইলিশ এখন সোনার হরিণ। ইলিশের দাম বেশি হওয়ায় উচ্চবিত্তদের খাবারে পরিণত হয়েছে।’ শহরের কিচেন মার্কেটের ক্রেতা মো. আরিফুর রহমান ও মো. হোসেন জানান, বাজারে এখন হাতেগোনা মাত্র ২-৩ জন ইলিশ নিয়ে আসেন বিক্রি করতে। তাও আবার মাত্র কয়েকটা ইলিশ। সেগুলো বিক্রি হয় উচ্চ মূল্যে। বাজারে ইলিশ এখন সোনার হরিণ। ইলিশের দাম বেশি হওয়ায় উচ্চবিত্তদের খাবারে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে মাছ বিক্রেতা মো. রুহুল আমিন ও মো. নাগর জানান, তারা আগে প্রতিদিন ইলিশ মাছ বাজারে বিক্রি করতেন। কিন্তু বেশ কয়েকদিন ধরে বিক্রি করতে পারছেন না। কারণ ঘাটে ইলিশের সংকট। জেলে মাছ নিয়ে এলে ডাক উঠলে দাম অনেক বেশি ওঠে। ঢাকা, বরিশাল ও চাঁদপুরের আড়তে যারা পাইকারি বিক্রি করেন, তারাই বেশি দাম দিয়ে কিনে নেন। তিনি বলেন, আমরা যারা লোকাল বাজারে বিক্রি করি, তারাতো বেশি দাম দিয়ে কিনে বিক্রি করতে পারবো না। তাই কিনতে পারি না। এজন্য এখন ছোট ছোট মাছ বাজারে বিক্রি হয়। তবে ইলিশ বিক্রি করলে অল্প সময়ের মধ্যে মাছ বিক্রি হয়ে যেত, আবার লাভও বেশি হতো। মাছ বিক্রেতা মো. ইব্রাহীম জানান, ঘাটে আগের মতো ইলিশ কেনা যায় না। অল্প কয়টা কিনে আনি, তাও বেশি দাম দিয়ে। আর বাজার দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি করতে অনেক সময় লাগে। আগে ৫০০ গ্রামের ইলিশ বাজারে খুচরা বিক্রি করতাম সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা, এখন বিক্রি করি ২২০০-২৫০০ টাকা। ৩০০-৩৫০ গ্রামের ইলিশ আগে ছিল ৫০০-৬০০ টাকা, এখন তা ১৫০০-১৬০০ টাকা। জাটকা আগে বিক্রি করতাম ২০০-৩০০ টাকা কেজি, এখন তা বিক্রি করি ১২০০ টাকা কেজি। আর ১ কেজি ওজনের ইলিশ আগে বিক্রি করতাম ১৭০০-২০০০ টাকা, এখন তা বিক্রি করি ৪০০০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা কেজি। ‘ঘাটে ইলিশের সংকট। জেলে মাছ নিয়ে এলে ডাক উঠলে দাম অনেক বেশি ওঠে। ঢাকা, বরিশাল ও চাঁদপুরের আড়তে যারা পাইকারি বিক্রি করেন, তারাই বেশি দাম দিয়ে কিনে নেন।’ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনগত কারণে বর্তমানে নদীতে ইলিশ খুইব কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যদি আরও বেশি বৃদ্ধি পায়, তাহলে নদীতে ইলিশ কিছুটা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান জানান, জুলাই থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইলিশের ভরা মৌসুম। তবে মে ও জুন মাসে বৃষ্টিপাত থাকায় নদীতে ইলিশের বেশ বিচরণ থাকে, কিন্তু সেটা ভরা মৌসুমের চেয়ে কম। এই ইলিশ গবেষক জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে খুব কম পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ নিয়ে গবেষণা করে সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ইলিশ সম্পদ হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়াও জাটকা ও মা ইলিশ ধরা পড়ার ফলে ধীর ধীরে ইলিশ উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়ে। এফএ/এমএস

Go to News Site