Jagonews24
লিজের নামে জমি দখল ও কোটি টাকার মেশিনারিজ লুটপাটে অস্তিত্ব হারিয়েছে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের (বিজেসি) পাটক্রয়কেন্দ্র। একটা সময় পাট চাষি ও ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে মুখর থাকা পাটক্রয়কেন্দ্রটিতে এখন দখলদারদের উৎসব। সেখানে গড়ে উঠেছে পাকা বসতবাড়ি, মসজিদ, চিকিৎসা ও বাণিজ্যকেন্দ্র। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সাড়ে তিন একরের বিশাল এলাকায় একের পর এক স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও সম্পদ রক্ষায় কেউই নেননি তেমন উদ্যোগ। তথ্য বলছে, পাট চাষে সমৃদ্ধ চলনবিল অঞ্চলের চাষিদের বিপণন সুবিধার্থে বিট্রিশ আমলে পাবনার ভাঙ্গুড়া পৌর এলাকার চৌবাড়িয়া গ্রামে সাড়ে তিন একর সুবিশাল জায়গা নিয়ে মদনলাল আগরওয়ালা পাটক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ভাঙ্গুড়া পাটক্রয়কেন্দ্র নামে পরিচিতি পাওয়া বিজেসির এই প্রতিষ্ঠানে কৃষকের কাছ থেকে কেনা পাট প্রক্রিয়াজাত করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে পাঠানো হতো। ছিল নানা ধরনের যন্ত্রপাতিও। রাষ্টায়ত্ত পাটকলগুলো লোকসানে বন্ধ হতে শুরু করলে বন্ধ হয়ে যায় ভাঙ্গুড়া পাটক্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রমও। স্থানীয়রা জানান, কার্যক্রম বন্ধের পর অরক্ষিত হয়ে পড়ে ভাঙ্গুড়া পাটক্রয়কেন্দ্রের পুরো এলাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালীদের দৃষ্টি পড়ে পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির মূল্যবান জমির ওপর। প্রশাসনের নাকের ডগায় অফিসের কয়েকটি কক্ষ ছাড়া একে একে দখল হয়ে যায় সবটুকু ফাঁকা জায়গা। ‘পাটক্রয়কেন্দ্রের প্রায় পুরো এলাকাই এখন অবৈধ দখলে। দখলদাররা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সেখানে গড়ে তুলেছেন পাকা স্থায়ী স্থাপনা। ১০-১২টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, স্কুলভবন, মাদরাসা এমনকি মসজিদও’ অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ দখলদারদের অনেকেই সরকারি এ জায়গা বিক্রি করেছেন। হয়েছে কয়েক দফা হাত বদলও। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএম গোলজার হোসেন নামের এক ব্যক্তি নামমাত্র মূল্যে পাটক্রয়কেন্দ্রটি ভাড়া নিয়েছেন। তিনিও শর্ত ভঙ্গ করে বিজেসির মূল্যবান যন্ত্রাংশ গোপনে বিক্রি, স্থাপনা তৈরি করে অন্যপক্ষের কাছে ভাড়া ও বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা ও জামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বিলবিধৌত এলাকায় ব্যাপক পাটের আবাদ হয়। আগে এ আবাদ আরও বেশি ছিল। সেসময়ই এই পাটের কুটির (পাটক্রয়কেন্দ্র) স্থাপন করা হয় এখানে। আমাদের বাপ-দাদাদের আমলে ব্যাপক রমরমা ব্যবসা ছিল এখানে। চাষিরা পাটের সঠিক দাম পেতেন। কিন্তু কয়েক দশক আগে এটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর লিজের নামে এখানকার বড় বড় সব যন্ত্রপাতি গায়েব হয়ে যায়। লিজদাতা পরিচয়ে রাতের আঁধারে এগুলো লুট করে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা কামিয়েছে। এমনকি কুটিরের সরকারি জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে বড় বড় বিল্ডিং। এগুলো দেখার কেউ নেই।’ আরেক বাসিন্দা শামীম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আঞ্জু মাস্টার (গোলজার) লিজের নামে কুটিরের বড় একটা অংশ দখল নিয়েছেন। নিজেও অন্যদের কাছে ভাড়া দিচ্ছেন। রাতের আঁধারে এখানকার সব মেশিন বিক্রি করে দিয়েছেন। সরকারি জায়গা বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।’ পেশায় একজন পাট ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা একসময় এই কুটিরে পাটের ব্যবসা করেছি। অথচ এটি এখন দখল হয়ে আছে। এটি উদ্ধার করে পাট চাষিদের কল্যাণে ব্যবহার করা হোক।’ ‘ইজারাবহির্ভূত অবৈধ দখলদার এবং বেশ কিছু পাকা স্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে’—ইউএনও অভিযোগের সূত্র ধরে সম্প্রতি ভাঙ্গুড়া পাটক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে অনেক অভিযোগের সত্যতা মেলে। জানা যায়, পাটক্রয়কেন্দ্রের প্রায় পুরো এলাকাই এখন অবৈধ দখলে। দখলদাররা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সেখানে গড়ে তুলেছেন পাকা স্থায়ী স্থাপনা। ১০-১২টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, স্কুলভবন, মাদরাসা এমনকি মসজিদও। সাংবাদিক আসার খবর পেয়েই দ্রুত দরজায় তালা লাগিয়ে সটকে পড়েন বাসিন্দারা। একটি বাড়িতে গিয়ে একজন নারীকে পাওয়া গেলেও তিনি নিজেকে ‘ভাড়াটিয়া’ দাবি করে কথা বলতে রাজি হননি। স্থানীয়দের কাছ থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কথা হয় একটি বাড়ির মালিক স্থানীয় জরিনা রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলীর সঙ্গে। প্রথমে তিনি পাটক্রয়কেন্দ্রে বসতি স্থাপন করে আছেন বলে স্বীকার করেন। তবে কীভাবে সেখানে বসতি গড়েছেন—এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেত শুরু করেন। অফিসে খোঁজ নেওয়ার কথা বলে ফোন কেটে দেন। আরেক দখলদার পার্শ্ববর্তী উপজেলার একটি কলেজের শিক্ষক মো. শামীম। শুরুতে তিনি এ বিষয়ে কোনো আলাপ করতে চাননি। তিনি তাদের প্রতিনিধি তৈয়বের সঙ্গে আলাপ করতে বলেন। সবশেষ প্রশ্নের মুখে তিনি বলেন, ‘আমি ২০১১ সাল থেকে এডিসি থেকে রসিদ কেটে লিজ নিয়ে আছি।’ ‘ভাঙ্গুড়ার ওই পাটকেন্দ্রে আমাদের মোট সাড়ে তিন একরের মতো জমি রয়েছে। সেখানকার ২ দশমিক ১৯ একর জায়গা স্থানীয় গোলজার হোসেনকে লিজ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বাকি জমিগুলো বিভিন্নভাবে দখল হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। এক্ষেত্রে দখলমুক্ত করতে পাবনা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। শিগগির এটি দখলমুক্ত করা হবে’—উপপরিচালক ‘পাট মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি জেলা প্রশাসন থেকে কীভাবে নিলেন’—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি কুটিরের (পাটক্রয়কেন্দ্র) সম্পত্তি না, এটি অর্পিত সম্পত্তি। প্রয়োজনে এসিল্যান্ড অফিসে গিয়ে খোঁজ নেন।’ পরে লিজের কাগজপত্র দেখতে চাইলে সেটি দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। আরও পড়ুন: ইলিশ উধাও, জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষছেন গবেষকরাছাত্রদের আবাসিক হল এখন ‘স্টাফ কোয়ার্টার’আয়ের পাল্লা হালকা, ব্যয়ের ভারে ন্যুব্জ শ্রমজীবীএমপির প্রভাবে গ্রামে ‘নির্বাসিত’ জেলা স্বাস্থ্যসেবাটেকনাফের খাল-বিল এখন রোহিঙ্গাদের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়চতুর্মুখী চাপে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষি বিজেসির ক্রয়কেন্দ্রের পরিত্যক্ত ঘরগুলো ঘেঁষেই আধাপাকা ভবনে ক্লাস চলছে মিফতাহুল ফালাহ প্রিক্যাডেট মাদরাসার। সেখানে কথা হয় মাদরাসার মালিক গোলাম মোস্তফা রবির সঙ্গে। প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে জায়গাটি এককালীন বন্দোবস্ত নিয়েছেন জানালেও পরেই তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আঞ্জু মাস্টার জুট করপোরেশন থেকে লিজ নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে আমি ভাড়া হিসেবে নিছি। উনাকে একটা মাসিক ভাড়া দেয়া হয়।’ ‘সরকারি জায়গায় আধাপাকা স্থাপনা কীভাবে করলেন’—জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পাকা স্থাপনা তো অনেকে করছে। তাদের দেখে করছি। এতে বাধাগ্রস্ত হই নাই।’ মাদরাসা থেকে একটু এগোলেই মূল সড়কের পাশে ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সুবিশাল দোতলা ভবন। সরকারি জায়গায় কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠলো জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ লিজ নিয়েছে দাবি করে। কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান। অভিযোগের বিষয়ে বিজেসির চুক্তিভুক্ত ভাড়াটিয়া বিএম গোলজার হোসেন ওরফে আঞ্জু মাস্টার জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৩ সাল থেকে প্রথমে এক বছরের জন্য লিজ নিয়েছি। পরে তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা হয়েছে। লিজ নিয়ে আমি খামার করছি। বিক্রির অথরিটি আমার নাই, করিও নাই। আমি ভাড়া নেয়ার আগেই অনেক জায়গা বেদখল হয়েছে। তবে ভাড়া দেওয়ার পারমিশন আছে।’ চুক্তিপত্রের ৫ নম্বর শর্ত অনুযায়ী বিজেসি থেকে ভাড়াকৃত সম্পত্তি অন্য কারও কাছে ভাড়া বা হস্তান্তর করা যাবে না। বিষয়টি তাকে জানালে তিনি আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি। এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান জানান, ইজারা বহির্ভূত অবৈধ দখলদার এবং বেশ কিছু পাকা স্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মাকছিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাঙ্গুড়ার ওই পাটকেন্দ্রে আমাদের মোট সাড়ে তিন একরের মতো জমি রয়েছে। সেখানকার ২ দশমিক ১৯ একর জায়গা স্থানীয় গোলজার হোসেনকে লিজ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বাকি জমিগুলো বিভিন্নভাবে দখল হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। এক্ষেত্রে দখলমুক্ত করতে পাবনা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। শিগগির এটি দখলমুক্ত করা হবে।’ এসআর/এএসএম
Go to News Site