Jagonews24
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য—প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খাবার কোশারির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশের পরিচিত খাবার খিচুড়িতে। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে উপমহাদেশের এই সাধারণ খাবারই আজ মিশরের জাতীয় খাদ্যসংস্কৃতির এক অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছে। মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে শুরু করে দেশটির প্রত্যন্ত শহরের অলিগলি—সবখানেই সমান জনপ্রিয় কোশারি। রাস্তার পাশের ছোট দোকান থেকে অভিজাত রেস্তোরাঁ—সর্বত্রই এর কদর চোখেপড়ার মতো। সাধারণ উপকরণে তৈরি হলেও স্বাদ, পুষ্টিগুণ এবং ইতিহাসের দিক থেকে মিশরীয় খাদ্যজগতে এটি দখল করে আছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ মিশরে এলে তাদের হাত ধরেই খিচুড়ির ধারণাটি মিশরে পৌঁছে। পরবর্তীতে মিশরে বসবাসরত ইতালীয় সম্প্রদায়ের প্রভাবে এতে যুক্ত হয় পাস্তা। ধীরে ধীরে মিশরীয়রা নিজেদের স্বাদ ও রুচি অনুযায়ী এতে পেঁয়াজ বেরেস্তাঁ, ছোলা, টমেটো সস, রসুন ভিনেগার ও ঝাল মরিচের সস মিশিয়ে তৈরি করে এক নতুন রূপ—যা আজকের কোশারি। অনেক গবেষকের মতে, ‘কোশারি’ শব্দটির উৎপত্তিও উপমহাদেশের ‘খিচুড়ি’ শব্দ থেকে, যা সময়ের পরিক্রমায় আরবি উচ্চারণে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান নাম ধারণ করেছে। কোশারি মূলত চাল, মসুর ডাল, পাস্তা, ছোলা এবং ভাজা পেঁয়াজের এক অভিনব সংমিশ্রণ। এর ওপর ঢেলে দেওয়া হয় বিশেষভাবে প্রস্তুত টমেটো সস, রসুন-ভিনেগারের ঝাঁঝালো ড্রেসিং এবং ঝাল মরিচের সস। বিচিত্র উপকরণের এই মেলবন্ধন প্রথমে কিছুটা অচেনা মনে হলেও একবার স্বাদ নিলে এর প্রতি আলাদা আকর্ষণ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। মিশরে কোশারির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি বাস্তব কারণ। প্রথমত, এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী—অল্প খরচেই পেটভরে খাওয়া যায়। ফলে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে অফিসগামীদের কাছেও এটি সমান প্রিয়। দ্বিতীয়ত, এটি পুষ্টিগুণে ভরপুর। ডাল ও ছোলা থেকে প্রোটিন, চাল ও পাস্তা থেকে কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায়, যা শরীরের জন্য শক্তির ভালো উৎস। তৃতীয়ত, এটি নিরামিষভোজীদের জন্যও একটি আদর্শ খাবার। তবে কোশারি শুধু একটি খাবার নয়; এটি মিশরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। দেশটির প্রায় প্রতিটি এলাকায় কোশারির দোকান দেখা যায়। বিশেষ করে কায়রোর জনপ্রিয় কোশারি রেস্তোরাঁগুলোতে প্রতিদিন উপচেপড়া ভিড় প্রমাণ করে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। অনেক বিদেশি পর্যটকও পিরামিড দর্শনের পাশাপাশি কোশারির স্বাদ নেওয়াকে মিশর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন। স্বাদ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব সংমিশ্রণে কোশারি আজ শুধু মিশরের নয়, বিশ্বব্যাপী পরিচিত এক অনন্য খাবারে পরিণত হয়েছে। সাধারণ উপকরণে অসাধারণ স্বাদের এই পদ যেন প্রমাণ করে—খাবারের ইতিহাসও কখনো কখনো জাতি ও সংস্কৃতির মিলনের এক অনবদ্য দলিল হয়ে উঠতে পারে। এমআরএম
Go to News Site