Collector
ইরানে আমিরাতের ‘গোপন হামলা’ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা বাড়াচ্ছে | Collector
ইরানে আমিরাতের ‘গোপন হামলা’ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা বাড়াচ্ছে
Jagonews24

ইরানে আমিরাতের ‘গোপন হামলা’ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা বাড়াচ্ছে

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) গোপনে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে বলে খবর প্রকাশ হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার ফলে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ সরাসরি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সময়ে কুয়েত জানিয়েছে, দেশটির মালিকানাধীন বুবিয়ান দ্বীপে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ চালানোর চেষ্টা করার সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অন্তত চার সদস্যকে আটক করা হয়েছে। বুবিয়ান দ্বীপ কুয়েতের উপকূলীয় দ্বীপমালার মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইউএই গোপনে ইরানের লাজান দ্বীপে হামলা চালায়। ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে এই হামলা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরু হলে ইউএই আরও বড় টার্গেটে পরিণত হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার (১১ মে) বলেছেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া ছাড় না দেওয়ায় যুদ্ধবিরতি এখন ‘সুতোয় ঝুলছে’। মঙ্গলবার পেন্টাগন জানায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহ আগে দেওয়া হিসাবের তুলনায় এটি প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলার বেশি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আগের সংঘাতে ইরান ইউএইকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর শাসকগোষ্ঠীর ইরানবিরোধী কূটনৈতিক অবস্থানের কারণেই দেশটি ব্যাপক হামলার মুখে পড়ে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউএইর কূটনৈতিক বৈরিতা কেবল রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সামরিক রূপও নিয়েছিল। প্রতিবেদনে এমন কিছু ছবির উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ইউএই ব্যবহৃত ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান ও চীনা উইং লং ড্রোনকে ইরানের আকাশে অভিযান চালাতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সে সময় ইউএই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা শুধু নিজেদের তেল ও বন্দর স্থাপনা রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পাল্টা সামরিক অভিযানও চালাতে চায়। একই সময়ে ইরান অভিযোগ করেছিল, ইউএই ও কুয়েতও তাদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত ছিল। তবে এখন পর্যন্ত ইউএই কাতার কিংবা সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানে আনতে পারেনি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং হামলার জবাব দিতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে একসঙ্গে নামানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের গোয়েন্দা মূল্যায়নে দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করা হচ্ছিল, উপসাগরীয় কিছু দেশ তাদের আকাশসীমা বা মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের বিমানবাহিনীও উপসাগরীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দিয়েছে। তবে এসব দেশ নিজেদের জনগণের কাছে বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে তারা শুধু নিরপেক্ষ উপসাগরীয় মিত্রদের রক্ষা করছে, যারা সংঘাতের বাইরে থাকতে চায়। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানিয়েছেন, ইসরায়েল ইউএইর প্রতিরক্ষা জোরদারে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা পাঠিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও এই ইস্যুতে বিভাজন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইউএইর মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠেছে- ইরানের হামলার জবাবে আরব দেশগুলোর কি সরাসরি সামরিক প্রতিশোধ নেওয়া উচিত, নাকি এতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে। সৌদি আরবের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত তুর্কি আল-ফয়সাল এক নিবন্ধে সৌদি অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, সৌদি আরবের সংযমই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি লিখেছেন, যদি ইসরায়েলের পরিকল্পনা সফল হয়ে আমাদের ও ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হতো, তাহলে পুরো অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো এবং ইসরায়েল এই অঞ্চলে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে সক্ষম হতো। তার মতে, সৌদি আরব যদি এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাবে, লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হবে, হজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্প থমকে যাবে। অন্যদিকে কুয়েতি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে মাছ ধরার নৌকায় করে বুবিয়ান দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করা চার আইআরজিসি কমান্ডারের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও ইরানি গণমাধ্যম এখনো এই ঘটনার খবর প্রকাশ করেনি। এই ঘটনার পর ইউএই একটি বিবৃতি দিয়ে কুয়েতের প্রতি সংহতি জানায় এবং আইআরজিসির ‘শত্রুতামূলক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ প্রতিহত করার প্রশংসা করে। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কুয়েতি কিছু প্রতিবেদনে বুবিয়ান দ্বীপে মার্কিন উপস্থিতির পরিবর্তে চীনের উপস্থিতির কথাও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর ইরানবিরোধী অবস্থানের পেছনে আদর্শগত দ্বন্দ্বও রয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সই করার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলেছে। ইউএই মনে করে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই ইরান অন্যায্যভাবে আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ইরানি হামলার কারণে ইউএইর সবচেয়ে বড় গ্যাস প্ল্যান্ট প্রায় দুই বছর বন্ধ হয়ে গেছে বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক অ্যাডনক গ্যাস জানিয়েছে, আগামী বছরের আগে প্ল্যান্টটি পুরোপুরি মেরামত করা সম্ভব হবে না। কোম্পানিটি মঙ্গলবার (১২ মে) জানায়, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্ল্যান্টটির উৎপাদন সক্ষমতা ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে এবং ২০২৭ সালে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরবে। তবে ইউএইর এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক জোট তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক জোটের দিকে এগোচ্ছে যেখানে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতার একসঙ্গে থাকবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদ এখন আমাদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি। তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যা-ই ঘটুক না কেন, গাজা ইস্যু থেকে মনোযোগ সরানো উচিত নয়। ফিদান আরও বলেন, গাজা, বৈরুত, পশ্চিম তীর ও সিরিয়ায় সম্প্রসারণবাদ বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং আরও অসংখ্য মানুষকে ঘরছাড়া করেছে। আঞ্চলিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। এদিকে, মঙ্গলবার (১২ মে) ওমানের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইরান। বৈঠকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য বিভিন্ন সেবা বাবদ অর্থ আদায়ের বিষয়ও রয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান এসএএইচ

Go to News Site