Collector
বিনিয়োগের বড় বাধা জ্বালানি সংকট ও আমলাতান্ত্রিক দেয়াল | Collector
বিনিয়োগের বড় বাধা জ্বালানি সংকট ও আমলাতান্ত্রিক দেয়াল
Jagonews24

বিনিয়োগের বড় বাধা জ্বালানি সংকট ও আমলাতান্ত্রিক দেয়াল

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা বহুদিনের। প্রতিটি বাজেটের আগে, প্রতিটি বিনিয়োগ সম্মেলনের মঞ্চে, প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—“এফডিআই” বা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। কারণ সরকার জানে, শুধু দেশীয় বিনিয়োগ দিয়ে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সম্ভাবনার গল্প যত বড়, বিনিয়োগের বাস্তব চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক ছোট অর্থনীতিও যেখানে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, “জ্বালানি সংকট সমাধান করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে না।” একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ আনা শুধু বিডার একার দায়িত্ব নয়। সরকারের ভেতরে ছোট ছোট সরকার রয়েছে, যার কারণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।” এই বক্তব্য কেবল একটি প্রশাসনিক মন্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের বিনিয়োগ বাস্তবতার নির্যাস। একজন কলামিস্ট হিসেবে মনে হয়, সরকার যদি সত্যিই বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, তাহলে এখন আর শুধু সম্মেলন, স্লোগান কিংবা বিদেশ সফরে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, প্রশাসনিক সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিনিয়োগকারীরা আসলে কী চান? অনেক সময় আমরা মনে করি, কর ছাড় দিলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রথমেই তিনটি বিষয় বিবেচনা করেন—নীতিগত স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। বাংলাদেশে এই তিন ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে। ধরা যাক, একটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস কারখানা স্থাপন করতে চায়। তারা জমি পেল, প্রাথমিক অনুমোদনও পেল। কিন্তু এরপর শুরু হয় বাস্তব দুর্ভোগ। কখনও গ্যাস সংযোগ নেই, কখনও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা নেই, কখনও বন্দর থেকে কাঁচামাল ছাড় করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। আবার একটি অনুমোদনের জন্য এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস। বিদেশি বিনিয়োগ মূলত আস্থার বিষয়। বিনিয়োগকারী তখনই আসবেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে এই দেশে ব্যবসা করলে নিয়ম হঠাৎ বদলে যাবে না, জ্বালানি থাকবে, বন্দরে পণ্য আটকে থাকবে না এবং প্রশাসন তাকে সহযোগিতা করবে। অনেক বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার চেয়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়াই বেশি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কাগজে “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেটি “মাল্টি স্টপ ভোগান্তি”-তে পরিণত হয়। জ্বালানি সংকট: বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অস্থিরতা আশিক চৌধুরীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত জ্বালানি সংকট নিয়ে। কারণ একটি শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ঠিক রক্তসঞ্চালনের মতো। সেটি বন্ধ হলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, লোডশেডিং এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া বা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করেন, তখন তিনি শুধু শ্রমিকের মজুরি দেখেন না; তিনি দেখেন উৎপাদন কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো সম্ভব। ভিয়েতনামের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে শিল্পাঞ্চলভিত্তিক বিদ্যুৎ, গ্যাস, বন্দর ও সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করেছিল। ফলে স্যামসাং, ইন্টেল, এলজির মতো বড় কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশ এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। “সরকারের ভেতরে ছোট ছোট সরকার” আশিক চৌধুরীর এই মন্তব্যটি সম্ভবত বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বাস্তব চিত্র। এখানে প্রায় প্রতিটি দপ্তর নিজেকে আলাদা ক্ষমতার কেন্দ্র মনে করে। একজন বিনিয়োগকারীকে ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে বিডা, এনবিআর, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাস কোম্পানি, সিটি করপোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে হয়। প্রতিটি দপ্তরের আলাদা নিয়ম, আলাদা চাহিদা, আলাদা সময়সীমা। ফলে বিনিয়োগকারী বুঝতে পারেন না, আসলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের জন্য চাকরি তৈরি করতে হলে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে এখনও এমন অনেক বিনিয়োগ প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো শুধু অনুমোদনের জটিলতায় বছরের পর বছর আটকে আছে। এই বিলম্ব শুধু বিনিয়োগকারীর ক্ষতি করে না; দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিরও ক্ষতি করে। কারণ ব্যবসা অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না। শুধু কর ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ আসে না বাংলাদেশ প্রায়ই বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডের ঘোষণা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি বিদ্যুৎ না থাকে, বন্দর অকার্যকর হয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে—তাহলে শুধু কর ছাড় দিয়ে কতটা বিনিয়োগ আনা সম্ভব? অনেক বিদেশি কোম্পানি বলেছে, তারা করের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় “Ease of Doing Business”-কে। অর্থাৎ ব্যবসা পরিচালনা কত সহজ। সিঙ্গাপুরের সাফল্যের বড় কারণ কর কম নয়; বরং সেখানে ব্যবসা শুরু করতে সময় কম লাগে, নীতিগত স্বচ্ছতা আছে এবং দুর্নীতি তুলনামূলক কম। বাংলাদেশেও যদি বিনিয়োগ বাড়াতে হয়, তাহলে “অনুমোদনের সংস্কৃতি” থেকে বের হয়ে “সহযোগিতার সংস্কৃতি” গড়ে তুলতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে কী করতে হবে? জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই; শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আমদানিনির্ভরতার মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। এছাড়া প্রকৃত অর্থে “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” চালু করতে হবে। একজন বিনিয়োগকারী যেন একটি জায়গা থেকেই সব অনুমোদন পান। প্রতিটি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে এবং সেটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। অন্যদিকে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা কমাতে ডিজিটাল প্রশাসন বাড়াতে হবে। মানুষের মুখাপেক্ষী সিস্টেম যত কমবে, অনিশ্চয়তাও তত কমবে। এছাড়াও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। হঠাৎ কর পরিবর্তন, ডলার নিয়ন্ত্রণ বা আমদানি নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। সবশেষে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি জরুরি। আস্থা ছাড়া বিনিয়োগ আসে না বিদেশি বিনিয়োগ মূলত আস্থার বিষয়। বিনিয়োগকারী তখনই আসবেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে এই দেশে ব্যবসা করলে নিয়ম হঠাৎ বদলে যাবে না, জ্বালানি থাকবে, বন্দরে পণ্য আটকে থাকবে না এবং প্রশাসন তাকে সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের জন্য চাকরি তৈরি করতে হলে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগ শুধু আহ্বান জানিয়ে আসে না। বিনিয়োগ আসে প্রস্তুতি দেখে, নীতির স্থিরতা দেখে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা দেখে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের বক্তব্য তাই সরকারের জন্য এক ধরনের সতর্কসংকেত। এখন প্রয়োজন বাস্তবতা স্বীকার করার সাহস এবং সংস্কারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় বিশ্ব কারও জন্য অপেক্ষা করে না। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com এইচআর/এমএস

Go to News Site