Somoy TV
যশোরে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন কৃষকরা। একটু দেরিতে চাষাবাদ করলেও অনুকূল পরিবেশ ও উন্নতমানের বীজ, সার ও কীটনাশকের সরবরাহ ঠিক থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। ফলে জেলাজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ; যা চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত জেলা যশোর। চলতি মৌসুমে জেলার আবাদযোগ্য এক লাখ ৯৭ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমির মধ্যে এক লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতেই বোরো আবাদ করা হয়েছে।একটু দেরিতে চাষাবাদ শুরু হলেও ভালো উৎপাদনের আশায় কৃষক মিনিকেট, রড মিনিকেট, ব্রি-৫০ বাসমতি, ব্রি-৬৩, ব্রি-৬৭, বীনা-২৫ ধানের মত বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের ধান রোপণ করেন। সেইসঙ্গে অনুকূল আবহাওয়া আর সার-কীটনাশকের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে এখন মাঠজুড়ে সোনালী ফসলের হাসি। সেই হাসি ঘরে তুলতে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই কৃষক-শ্রমিকদের। উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও ফলন ভালো হওয়ায় লাভের মুখ দেখার আশা তাদের।যশোর সদর উপজেলার পুলেরহাট এলাকার চাষি আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমি রড মিনিকেট ধান রোপণ করেছিলাম। ফলন মোটামুটি ভালো, হয়তো বিঘা প্রতি ২৫ মণ ধান হবে আশা করা যায়। কিন্তু এ বছর খরচ বেশি হয়ে গেছে। সার, কীটনাশকের দাম বেশি, শ্রমিকের মজুরি বেশি; ১০০০-১০৫০ টাকা। এতে করে উৎপাদন খরচ উঠে সামান্য কিছু লাভ হবে।ভাতুরিয়া এলাকার চাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তিন বিঘা জমিতে চিকেন মিনিকেট ধান করেছি। এই ধানটা মোটামুটি ভালো, তাই ২৫ মণ করে বিঘা প্রতি আশা করা যাচ্ছে। বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ২০-২২ হাজার টাকা। সেই হিসেবে এবার খুব বেশি লাভ হবে না। তার কারণ এবার খরচ পড়েছে বেশি।’আরও পড়ুন: ক্ষেতে নুয়ে পড়া পাকা ধানে গজিয়েছে চারা, দিশেহারা কৃষকচৌগাছা উপজেলার সলুয়া এলাকার চাষি আমিন উদ্দিন বলেন, ‘উৎপাদন সন্তোষজনক, কিন্তু খরচ বেশি। এ বছর কীটনাশক, সারসহ সবকিছুর খুব দাম বেশি। মনে করেন ৪০ টাকা করে এক কেজি টিএসপি, ৩০ টাকা ইউরিয়া, অন্যান্য সারেরও দাম বেশি। কীটনাশকও বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে। সবকিছু মিলে এবার খরচ অত্যন্ত বেশি। কী হবে বলা যাচ্ছে না, তবে আশা করা যায় গায় গায় থাকবে।’মনিরামপুর উপজেলার কুয়াদা এলাকার চাষি জয়নাল হোসেন বলেন, ‘আমি দুই বিঘা জমি চাষ করেছি। এ বছর ধান রোপণে দেরি করে ফেলেছি। ফাল্গুন মাসের দিকে এসে জমিতে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। তারপরও তুলনামূলক কম সময়ে ভালো ধান হয়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘আশা করা যায় ভালোভাবে ধান উঠে যাবে। অন্যান্য জেলায় ঝড়-বৃষ্টি প্রচুর হয়েছে, কিন্তু আমাদের যশোর জেলায় ঝড়-বৃষ্টি হলেও আমাদের ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছে। ধান যথেষ্ট পরিমাণে ভালো হয়েছে। প্রতিটা গোছায় প্রচুর ধান এবং সেই ধান ভালো পুষ্ট হয়েছে। বিঘা প্রতি ২৫ মণ ধান হবে আশা করা যায়। এখন বাজারে ধানের দামটা ভালো পেলে কষ্টটা সার্থক হবে।’কৃষি বিভাগের হিসেব বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ধান উৎপাদন হবে ১০ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি; যা থেকে চাল মিলবে প্রায় ৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। জেলাবাসীর চাহিদা মিটিয়েও বিপুল পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থাকবে।আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে কৃষকের ‘পাকা ধানে মই’, ঘরে ঘরে হাহাকারএ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (শস্য) সমরেন বিশ্বাস বলেন, কৃষকরা যাতে ভালোভাবে আবাদ করতে পারেন সেজন কৃষি বিভাগ সবসময় তাদের পাশে থাকে। বোরো আবাদ ভালো করতে সার, সেচসহ আনুষঙ্গিক কৃষি উপকরণ সরবরাহ ঠিক রাখা হয়েছে। কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যাতে নির্বিঘ্নে বোরো আবাদটা ঘরে তুলতে পারেন।’তিনি আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। কৃষকরা ইতিমধ্যে ৭০ শতাংশ ধান কেটেছে। বাকি ৩০ শতাংশ এখনো বাকি। কৃষক যাতে আবহাওয়া বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সময়ে ধান ঘরে তুলতে পারে সেজন্য আমরা মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করেছি। মসজিদ, মন্দিরের কমিটির নেতৃবৃন্দের দিয়ে প্রচার-প্রচারণা করা হচ্ছে।’কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা উৎপাদিত ধান থেকে প্রায় ৭ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৯ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করতে পারবো। এটা হলে আমাদের দুই লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত উৎপাদন হবে; যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখবে।’
Go to News Site