Jagonews24
দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা। শুক্রবার (১৫ মে) নিজের ফেসবুক পোস্টে এ পরামর্শ দেন তিনি। ডা. তাসনিম জারা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, হাম খুবই সংক্রামক একটা রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। কোভিড বা ফ্লু-এর তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি। হামের ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার ২ ঘণ্টা পরেও সেখানে কেউ ঢুকলে হামে আক্রান্ত হতে পারেন। ঠিক এই কারণেই হামের আউটব্রেক ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। এটাই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ এর সীমা। এর নিচে নামলেই ফাঁক তৈরি হয়, আর সেই ফাঁক দিয়ে ভাইরাস ঢুকে পড়ে। কোথায় ফাঁকা আছে, সেটা খুঁজে বের করতে না পারলে ভাইরাস আটকানো সম্ভব না। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাংলাদেশে তো টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়া হয়, কভারেজও অনেক বেশি। তাহলে আউটব্রেক হচ্ছে কীভাবে? এর উত্তরে একটা মৌলিক বিষয় বুঝতে হবে। জাতীয় কভারেজ গড়ে ৯০ বা ৯৫ শতাংশ হলেও, এই গড়ের ভেতরে অনেক রকম তারতম্য থাকতে পারে। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় কভারেজ ৯৭ শতাংশ হতে পারে, কিন্তু কোনো একটা নির্দিষ্ট পকেটে, যেমন একটা চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, শহুরে বস্তি, কিংবা একটা প্রত্যন্ত উপজেলা, এসবের কোনোটাতে কভারেজ হয়তো ৬০ বা ৭০ শতাংশ। জাতীয় গড়ে এই পকেট ঢাকা পড়ে যায়, কিন্তু ভাইরাসের কাছে সেটা ঢাকা পড়ে না। এই ফাঁকা পকেটগুলোতে প্রাদুর্ভাব ঘটার সম্ভাবনা বেশি। একজন আক্রান্ত মানুষ এমন একটি কমিউনিটিতে ঢুকলে সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বাকি অঞ্চলের কভারেজ যত বেশিই হোক, এই পকেটে প্রাদুর্ভাব থামে না। তাহলে করণীয় কী? যেখানে কেস পাওয়া যাচ্ছে, সেই এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। শুধু জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে না, বরং ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম বা মহল্লা পর্যায়ে। এই চিহ্নিতকরণটা কীভাবে হবে? সরকারের পক্ষে একসাথে দেশের প্রতিটা ঘরে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো বাস্তবসম্মত না। তাই এমন একটি উপায় আমাদের বের করতে হবে, যেটা খুব অল্প সময়ে এবং সীমিত রিসোর্স দিয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।উপায়টা হলো একটি জাতীয় হাম হটলাইন বা কল সেন্টার চালু করা। এর মাধ্যমে হামের কেস শনাক্তকরণ, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড এবং চিকিৎসার সমন্বয়- সবগুলোই করা সম্ভব। আমাদের জাতীয় টেলিমেডিসিন অবকাঠামোর উপর দাঁড়িয়েই এটা চালু করা সম্ভব। এই কল সেন্টার কীভাবে কাজ করবে? প্রথমে গণমাধ্যমে এবং সামাজিক মাধ্যমে হামের লক্ষণগুলো প্রচার করতে হবে: জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, লাল র্যাশ যা সাধারণত চেহারা থেকে শুরু হয়ে নিচের দিকে ছড়ায়। এই লক্ষণগুলো দেখলেই অভিভাবকরা একটি নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করবেন। কল সেন্টারে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকেরা একটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলির মাধ্যমে যাচাই করবেন যে সম্ভাব্য হাম কি না। যদি সন্দেহজনক হয়, অভিভাবককে সরাসরি ওই এলাকার হামের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশনা দেবেন, যাতে তিনি এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে নতুন কাউকে সংক্রমিত না করেন। সুস্থ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটা কেস নিয়মিত ফলো-আপ করবেন। এই কল সেন্টারের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে আসতে হবে, যা নিয়মিত বিরতিতে প্রকাশিত হবে। প্রতিটা কল হবে ভৌগোলিকভাবে চিহ্নিত একটি ডেটা পয়েন্ট। রিয়েল-টাইমে দেখা যাবে কোন ইউনিয়নে, কোন ওয়ার্ডে, কোন পাড়ায় কেস বাড়ছে। হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট সংগ্রহের চেয়ে এভাবে তথ্য অনেক দ্রুত আসবে। এই ম্যাপ দেখেই সরকার ঠিক করতে পারবে কোন কোন এলাকায় কখন দ্রুত কেস-ফাইন্ডিং ও টিকা টিম পাঠাতে হবে। এই মডেল প্রমাণিত। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ১১১, কোভিডকালীন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের হেল্পলাইন, পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার সময় এই হটলাইন সারভেইলেন্স কাজ করেছে। রিসোর্সের সীমাবদ্ধতা থাকলে এটা সুবিধাজনক। এত মানুষের কাছে যেহেতু যাওয়া সম্ভব না, তাই তাদেরকে এর মাধ্যমে একটি সিস্টেমে নিয়ে আসা যায়। এই কল সেন্টারের ভিত্তিতে চিহ্নিত প্রতিটা এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করে ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। ধারণাটা সহজ। যখন কোনো এলাকায় একজন আক্রান্ত মানুষ পাওয়া যায়, তখন সেই কেসকে কেন্দ্রে রেখে চারপাশে কয়েক স্তরে টিকা দেওয়া হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে আসা সবাই, যেমন পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, তার ক্লাসের, মসজিদ-মাদরাসা-স্কুলের সহপাঠীদের প্রথমে টিকার আওতায় আনা হয়। পর্যাপ্ত রিসোর্স থাকলে পুরো গ্রাম বা মহল্লাকেই টিকার আওতায় আনা যেতে পারে। এই কৌশলের পেছনে যুক্তি হলো ভাইরাসের চারপাশে একটা প্রতিরোধক বলয় তৈরি করা, যেন সংক্রমণ আর সামনে এগোতে না পারে। ভাইরাস এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে চাইলে যাতে এই বলয়ের ভেতরে আটকে যায়।তবে ভ্যাকসিনেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা মাথায় রাখতে হবে। হামের টিকা দেওয়ার পর শরীরে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। অর্থাৎ আজ টিকা দিলেই কাল সে সুরক্ষিত, এমনটা না। এজন্যই টিকার পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। এখানে একটি বিষয় আলাদাভাবে বলা দরকার, যেটা পত্রিকায় বারবার আসছে। আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে অভিভাবকরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন। কখনো কখনো সিট পাওয়া যাচ্ছে না, কখনো কখনো যথাযথ চিকিৎসা মিলছে না, কিংবা হাসপাতাল থেকেই পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে আরেক জায়গায়। এটা মানবিক বিপর্যয় তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে এটা একটা মারাত্মক সংক্রমণ-ব্যবস্থাপনার বিপর্যয়ও। কারণ একজন হামে আক্রান্ত শিশু যে হাসপাতালে ঢোকেন, সেখানকার জরুরি বিভাগে, ওয়ার্ড, করিডরে অন্য রোগের জন্য আসা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা থাকেন। যাঁদের অনেকেই হয়তো হামের ঝুঁকিতে আছেন, যেমন ছয় মাসের কম বয়সী শিশু যারা এখনো টিকার বয়সে পৌঁছায়নি, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, গর্ভবতী মা যার কখনো হাম হয়নি বা টিকা নেননি। হামের ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় এবং আক্রান্ত শিশু চলে যাওয়ার পরও ২ ঘণ্টার মধ্যে সেই বাতাসে নতুন কেউ এলে সংক্রমিত হতে পারেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘোরাঘুরি মানে প্রতিটা হাসপাতালে নতুন একদল মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনটা কাজ করা দরকার। ১- প্রতিটা এলাকায় একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র। যেখানে সম্ভাব্য হামের রোগীদের পাঠানো হবে। প্রবেশের পরেই অন্য রোগীদের সঙ্গে না মিশে তাদেরকে আলাদা করে ফেলা হবে, ভর্তির জন্য আলাদা আইসোলেশন কক্ষ থাকবে, যথাযথ ভেন্টিলেশন থাকবে, এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাপ্রাপ্ত হবেন। কল সেন্টার থেকে সরাসরি অভিভাবককে এই কেন্দ্রের নির্দিষ্ট কক্ষে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে। বাকি হাসপাতালগুলোতে সন্দেহভাজন কেস এলে তাঁদের অবিলম্বে আইসোলেট করে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে রেফার করার একটি স্পষ্ট প্রটোকল থাকতে হবে। ২- একটি ন্যাশনাল বেড-অ্যাভেইলেবিলিটি ড্যাশবোর্ড। যেখানে রিয়েল-টাইম আপডেট পাওয়া যাবে কোন হাসপাতালে কয়টা বেড খালি আছে, কয়টা আইসিউ সিট খালি আছে। কল সেন্টার থেকে সেই ড্যাশবোর্ড দেখে রোগীদেরকে সঠিক জায়গায় পাঠাবেন, যাতে আবার হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটতে না হয়। এই ব্যবস্থা না থাকার ভয়ংকর পরিণতি আমরা অনেকবার দেখেছি। হাসপাতালে সিট না পেয়ে দিশেহারা অভিভাবকদের কাছ থেকে দালাল চক্র টাকা হাতিয়ে নেয়। বিশেষ করে আইসিইউ বেড খুঁজতে খুঁজতে অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে রোগী মারা যায়। ৩- আইসিইউ সমস্যার জরুরি সমাধান। এবারের প্রাদুর্ভাবে অনেকে গুরুতর অসুস্থ হচ্ছেন। আইসিইউ সংকট আছে, বিশেষ করে ঢাকার বাইরে। হুট করে শিশুদের আইসিইউ ক্যাপাসিটি বাড়ানো প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তবে জরুরি ভিত্তিতে প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউ-সম্বলিত প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে সমন্বয় করা প্রয়োজন, যাতে প্রাণগুলো বাঁচানো যায়। বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছিল। প্রতি জেলায় না হলেও অন্তত প্রতি বিভাগে একটা প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউ-সম্বলিত প্রাইভেট হাসপাতালের সঙ্গে পার্টনারশিপ স্থাপন করে গুরুতর শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল খরচ। আমাদের স্বাস্থ্যখাতে আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার ৭৩ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ধার-দেনা করে, সম্পদ বিক্রি করে অনেকে চিকিৎসা করাচ্ছেন। ঢাকায় শিশুকে এনে তাকে চিকিৎসা করানোর খরচ, বাবা-মায়ের থাকা-খাওয়ার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। টাকার অভাবে অনেকেই দেরিতে হাসপাতালে নিচ্ছেন, যাতে জটিলতা বাড়ছে, এবং এই সময়ে অন্যদের মাঝেও হাম ছড়িয়ে পড়ছে। হামে আক্রান্ত রোগীদের ওষুধসহ চিকিৎসার খরচ সরকারিভাবে বহন করা উচিত। তার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি রোগীদের একটা এককালীন থোক-বরাদ্দ দেয়ার কথা বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে তারা চিকিৎসা শেষ করে বাড়ি যেতে পারেন। মোট কথা, হামের প্রাদুর্ভাব এমন না যে আমরা প্রথমবার এই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি। বিশ্বে এমন প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করার কৌশল প্রমাণিত, পদ্ধতি জানা। যেটা দরকার সেটা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়।এই সংকট এক সময় শেষ হবে। কিন্তু যে প্রশ্নটা থেকে যাবে, কেন আমরা এই অবস্থায় এসে পড়লাম। সেই প্রশ্নের জবাব আমাদের নিতেই হবে। সেটার জন্য প্রয়োজন সংসদীয় তদন্ত কমিটি। এনএইচআর
Go to News Site