Collector
স্মৃতির ভেতর হারানো প্রেমের খোঁজ | Collector
স্মৃতির ভেতর হারানো প্রেমের খোঁজ
Jagonews24

স্মৃতির ভেতর হারানো প্রেমের খোঁজ

পেছনে ফেলে আসা গ্রামের কথা কি কখনো ভোলা যায়? জীবনের যত দূরেই যাই, যত উঁচুতেই উঠি, শেকড়ের টান যেন অদৃশ্য এক সুতোয় টেনে রাখে আমাদের। সেই ধুলিমাখা মেঠো পথে হাঁটার দিনগুলো, কাঁধে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে নিরুদ্বেগে ছুটে চলা, কিংবা বিকেলের শেষ আলোয় মাঠের ঘাসে গড়িয়ে পড়া—সবকিছুই যেন আজও মনোজগতের এক কোণে সতেজ হয়ে বেঁচে আছে। শীতের সকাল মানেই ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। কুয়াশায় মোড়া গ্রাম, চারদিক সাদা চাদরে ঢাকা, আর সেই সময় খেজুর গাছের কাঁচা রসের স্বাদ—এ যেন এক অমৃতের স্পর্শ। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে দৌড়ে যাওয়া, গাছ থেকে নামানো মাটির হাঁড়ি থেকে টাটকা রস খাওয়া—এই সরল সুখের কোনো তুলনা হয় না। এখন শহরে হাজার রকম খাবার, কফিশপ, রেস্টুরেন্ট থাকলেও সেই এক গ্লাস কাঁচা রসের স্বাদ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বৈশাখ এলে গ্রাম যেন এক অন্যরকম উন্মাদনায় ভরে উঠত। কালবৈশাখীর আগমনী বার্তা নিয়ে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে যাওয়া, ঝড়ের তাণ্ডব, আর তারই ফাঁকে আম কুড়ানোর আনন্দ—এ যেন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। ঝড়ের ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে যেত কাঁচা আম কুড়ানোর উত্তেজনা। ঝড় থামার আগেই গাছতলায় দৌড়ে যাওয়া, কে কত বেশি আম পেল তা নিয়ে প্রতিযোগিতা—এই ছোট ছোট আনন্দগুলোই জীবনের বড় সম্পদ হয়ে আছে। প্রথম প্রেমের চিঠি লেখার সেই কাঁপা কাঁপা অনুভূতিও কি ভোলা যায়? অগোচরে লুকিয়ে রাখা কাগজে যত্ন করে লেখা কয়েকটি শব্দ, তারপর দিন গোনা—কবে সেই চিঠি পৌঁছাবে, কবে আসবে উত্তর। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনলেই বুকের ভেতর হঠাৎ করে ধুকপুক করে ওঠা, অকারণ ব্যস্ত হয়ে ওঠা—সেই প্রতীক্ষার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত মাধুর্য। চৈত্রের দাবদাহেও ছিল আলাদা এক আনন্দ। রোদে পুড়ে যাওয়া মাঠ, গরমে হাঁসফাঁস করা দুপুর—তার মধ্যেই আকাশে ঘুড়ি উড়ানো। নীল আকাশে রঙিন ঘুড়ির লড়াই, কার ঘুড়ি কারটাকে কাটবে—এই প্রতিযোগিতা যেন জীবনের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বাদ দিয়েছে। হাতে কাটা সুতো, মুখে বিজয়ের হাসি—এই স্মৃতিগুলো আজও চোখে ভাসে। গ্রামের মাঠ ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে বড় খেলার জায়গা। রাখাল বালকদের সঙ্গে গরু চরাতে যাওয়া, মাঠে বসে গল্প করা, কিংবা গরুর পেছনে দৌড়ানো—সবই ছিল এক অদ্ভুত মুক্তির অনুভূতি। সেখানে কোনো বাধা ছিল না, কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা সেই সময়গুলো আমাদের জীবনকে সহজভাবে দেখতে শিখিয়েছে। রাঙা মাটির পথে গরুর গাড়িতে চড়া ছিল আরেকটি অনন্য অভিজ্ঞতা। ধীরগতিতে চলা সেই গাড়ি, চাকার কঁক কঁক শব্দ, আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি—সব মিলিয়ে যেন এক শান্তির আবহ। আজকের দ্রুতগতির জীবনে যেখানে সবকিছু ছুটে চলছে, সেখানে সেই ধীরস্থির মুহূর্তগুলো যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। প্রথম প্রথম সাইকেল চালানো শেখার কথা মনে পড়লে আজও হাসি পায়। পড়ে যাওয়া, আবার উঠে দাঁড়ানো, ভয় আর উত্তেজনার মিশ্র অনুভূতি—এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলোই আমাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছে। সাইকেল চালানোর সময় পড়ে গিয়ে কপালের কাটা দাগ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। জীবনের বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস হয়তো সেখান থেকেই এসেছে। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ডাংগুলি খেলা, মাটি দিয়ে মার্বেল বানিয়ে খেলা—এসব ছিল আমাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। তখন কোনো মোবাইল ফোন ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, কিন্তু আনন্দের কোনো অভাব ছিল না। বরং সেই সীমিত উপকরণেই আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম অসীম সুখ। বর্ষাকালে গ্রামের রূপ ছিল একেবারেই ভিন্ন। টিপটিপ বৃষ্টি, কাদামাখা পথ, আর সেই বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া—এই সবকিছুই ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। কখনো রাতভর মাছ ধরা, কখনো খালে-বিলে সাঁতার কাটা—প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকার সেই অভিজ্ঞতা আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা। বসন্তে কোকিলের কুহু ডাক যেন গ্রামের প্রাণকে নতুন করে জাগিয়ে তুলত। গাছে গাছে নতুন পাতা, ফুলের সুবাস, আর সেই মিষ্টি সুর—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি। তখন মনে হতো, পৃথিবীটা যেন সত্যিই খুব সুন্দর। বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল আরেকটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। গ্রামের ছোট্ট সিনেমা হল, টিকিট কাটার জন্য লাইনে দাঁড়ানো, আর ভেতরে ঢুকে হৈচৈ—এইসব মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। বন্ধুত্বের সেই বন্ধন, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—এসব আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। প্রথম প্রেমের চিঠি লেখার সেই কাঁপা কাঁপা অনুভূতিও কি ভোলা যায়? অগোচরে লুকিয়ে রাখা কাগজে যত্ন করে লেখা কয়েকটি শব্দ, তারপর দিন গোনা—কবে সেই চিঠি পৌঁছাবে, কবে আসবে উত্তর। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনলেই বুকের ভেতর হঠাৎ করে ধুকপুক করে ওঠা, অকারণ ব্যস্ত হয়ে ওঠা—সেই প্রতীক্ষার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত মাধুর্য। শৈশবের প্রিয় বন্ধু-বান্ধব, সেইসব চেনা মুখগুলো—যাদের সঙ্গে হেসে-খেলে কেটেছে জীবনের সবচেয়ে নির্মল সময়—আজ তারা ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, আর কেউ কেউ হয়তো আর এই পৃথিবীতেই নেই। তবুও হঠাৎ করেই কোনো বিকেলে, কোনো গানের সুরে, কিংবা কোনো নির্জন মুহূর্তে তাদের মুখগুলো ভেসে ওঠে মনে। মনে হয়, সময় বয়ে গেলেও সম্পর্কের সেই উষ্ণতা কোথাও যেন থেকে যায়, স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে। প্রথম প্রথম শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার সেই অনুভূতিও ছিল ভীষণ অন্যরকম। ভোরের আলো ফোটার আগেই বন্ধুদের নিয়ে বের হওয়া, খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া, আর গভীর শ্রদ্ধায় ফুল অর্পণ—সেই মুহূর্তগুলো আমাদের ভেতরে এক অদৃশ্য চেতনার জন্ম দিত। পাড়ায় পাড়ায় মঞ্চনাটকের মহড়া, সংলাপ মুখস্থ করা, ছোট্ট মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখা—এসব ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক বেড়ে ওঠার প্রথম পাঠ। নিজেদের উদ্যোগে দেয়াল পত্রিকা বের করা, হাতে আঁকা ছবি আর লেখা দিয়ে সাজানো সেই পত্রিকা ঘিরে কত উচ্ছ্বাস! ক্লাব-সমিতির আড্ডা, পরিকল্পনা, হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত সময়। তখন বুঝিনি, এই ছোট ছোট আয়োজনই আমাদের ভেতরে বুনে দিচ্ছিল দায়িত্ববোধ, সৃজনশীলতা আর একসঙ্গে পথ চলার শক্তি। প্রথম রেডিও শোনার সেই বিস্ময়ভরা অনুভূতিও আজো মনে দাগ কেটে আছে। ছোট্ট একটি যন্ত্র, অথচ তার ভেতর থেকে ভেসে আসত গান, খবর, নাটক—মনে হতো যেন দূরের এক অজানা জগত আমাদের খুব কাছে চলে এসেছে। ‘মধুমালা’ নাটক শোনার জন্য উঠান ভরতি মানুষ আসতো। ক্লাবঘরে প্রথম প্রথম টেলিভিশন দেখা ছিল যেন উৎসবের মতো— বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপের সময়- পাড়ার মানুষজন একসঙ্গে জড়ো হওয়া, নির্দিষ্ট সময়ের আগে জায়গা দখল করে বসে পড়া, আর সাদাকালো পর্দায় চলা অনুষ্ঠান দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকা। আর গ্রামে কোনো বিয়ের আয়োজন মানেই মাইক বাজানোর সেই স্মরণীয় মুহূর্ত—গানের তালে তালে উচ্ছ্বাস, ঘোষণার ভঙ্গি, আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়া আনন্দের ঢেউ। এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই আমাদের শৈশবকে করেছে রঙিন, আর স্মৃতির ভাণ্ডারকে করেছে অফুরান। সময়ের সাথে সাথে আমরা বড় হয়েছি, গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এসেছি। ইট-কাঠ-পাথরের এই নগরীতে জীবন অনেক বেশি যান্ত্রিক, অনেক বেশি ব্যস্ত। এখানে সময়ের মূল্য আছে, কিন্তু সময়ের অনুভূতি নেই। এখানে সম্পর্ক আছে, কিন্তু সেই আন্তরিকতা অনেকটাই অনুপস্থিত। শহরের কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে যখন হঠাৎ করে গ্রামের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়—আমরা কি সত্যিই এগিয়েছি, নাকি কিছু মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছি? স্মৃতির জাবর কাটতে কাটতে সময় চলে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি আবার ফিরে যাওয়া যেত সেই শৈশবে, সেই গ্রামে! কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সেই সুযোগ দেয় না। জীবন আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, পেছনে ফিরে তাকানোর সময় খুব কমই দেয়। তবুও মন চায়, একবার হলেও ফিরে যাই—সেই রাঙা মাটির পথে, সেই শৈশবের দিনগুলোতে। গ্রাম শুধু একটি স্থান নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমাদের শেকড়, আমাদের পরিচয়। যত দূরেই যাই না কেন, সেই শেকড়ের টান আমরা কখনো অস্বীকার করতে পারি না। হয়তো আমরা শহরের নাগরিক হয়ে গেছি, কিন্তু আমাদের ভেতরের সেই গ্রামের মানুষটি এখনো বেঁচে আছে—নিঃশব্দে, নীরবে। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের শক্তি, আমাদের আশ্রয়। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে যখন আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন এই স্মৃতিগুলোই আমাদের সান্ত্বনা দেয়, আমাদের নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগায়। তাই পেছনে ফেলে আসা গ্রামের কথা কখনো ভোলা যায় না, সেটা তো প্রথম প্রেমের মত। প্রথম প্রেম কি কখনো ভোলা সম্ভব? ফিরে যেতে ইচ্ছে করে—গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথে, যেখানে জীবনের সরলতা আছে, আন্তরিকতা আছে, আর আছে নিখাদ আনন্দ। হয়তো বাস্তবে ফেরা সম্ভব নয়, কিন্তু মনে মনে সেই পথেই আমরা বারবার ফিরে যাই। সেই ফিরে যাওয়াতেই যেন আমাদের প্রকৃত শান্তি, আমাদের সত্যিকারের ঘর। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com এইচআর/এএসএম

Go to News Site