Jagonews24
ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের ঘটনাগুলো শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তরের ইতিহাস নয়; এগুলো মানুষের ত্যাগ, ধৈর্য ও অটল ইমানের গভীর শিক্ষা বহন করে। নবুয়্যতের শুরুর দিকেই যখন মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের একটি অংশকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরত। নবুয়্যতের চতুর্থ বছর থেকে শুরু হওয়া এই হিজরতের মাধ্যমে সাহাবিরা এমন এক ভূখণ্ডে আশ্রয় নেন, যেখানে ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশি তাদের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। আবিসিনিয়ায় সাহাবিরা অল্প কিছুদিন নয়, দীর্ঘ প্রায় ষোলো বছর অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে তাদের অনেক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। নতুন পরিবেশে বেড়ে ওঠা সেই শিশুদের শৈশব গড়ে ওঠে ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার আবহে। তারা আবিসিনিয়ার ভাষা শেখে, সেখানকার মানুষদের সঙ্গে মিশে বড় হয়। ফলে তাদের মানসিক জগতেও দুই সংস্কৃতির এক মিশ্র অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। এমনই একজন সাহাবির কন্যা ছিলেন উম্মে খালেদ। তার পিতা খালেদ ইবনে সাঈদ ইবনুল আস ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের সাহাবিদের অন্যতম। তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, আর সেখানেই জন্ম হয়েছিল তার কন্যা আমাতা বিনতে খালেদের। যদিও তিনি ‘উম্মে খালেদ’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা—সবকিছুই হয়েছিল আবিসিনিয়ার পরিবেশে। তাই হাবশি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল সহজাত। পরবর্তীকালে খায়বার বিজয়ের পর যখন আবিসিনিয়ায় অবস্থানকারী সাহাবিদের বড় একটি অংশ মদিনায় ফিরে আসেন, তখন খালেদ ইবনু সাঈদও তার পরিবার নিয়ে মদিনায় চলে আসেন। ছোট্ট উম্মে খালেদ এতদিন শুধু মা-বাবার মুখে রাসুলুল্লাহর (সা.) কথা শুনেছিলেন; এবার তিনি তাঁকে নিজের চোখে দেখলেন। সাহাবিয়া হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ছয় বা সাত বছর। একদিন রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে কিছু কাপড় উপহার হিসেবে আনা হয়। সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল নকশাওয়ালা সুন্দর কালো চাদর। তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই চাদরটি কাকে দেব?’ সাহাবিরা ভদ্রতাবশত নীরব থাকলেন। তখন তিনি বললেন, ‘উম্মে খালেদকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ ছোট্ট উম্মে খালেদকে ডেকে আনা হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তাকে সেই চাদরটি পরিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার জন্য দোয়াও করলেন—‘ব্যবহার করো এবং পুরাতন করো।’ আরবদের ভাষায় এটি ছিল দীর্ঘজীবনের দুআ; অর্থাৎ এতদিন বেঁচে থাকো যেন কাপড়টি ব্যবহার করতে করতে পুরোনো হয়ে যায়। তারপর নবীজি (সা.) তাকিয়ে দেখলেন, চাদরটি উম্মে খালেদকে কেমন মানিয়েছে এবং উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘সানা, সানা ইয়া উম্মা খালেদ।’ অর্থাৎ সুন্দর, সুন্দর, উম্মে খালেদ! আবিসিনিয়ার ভাষায় ‘সানা’ অর্থ সুন্দর। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, নবীজি (সা.) আরবি শব্দ ব্যবহার করেননি। ‘সুন্দর’ বোঝাতে আরবিতে বহু শব্দ ছিল; তিনি চাইলে বলতে পারতেন ‘জামিল’ কিংবা ‘মা আজমালাহু’। কিন্তু তিনি আবিসিনিয়ার ভাষার শব্দ ব্যবহার করলেন—‘সানা’। কারণ উম্মে খালেদের শৈশব কেটেছে আবিসিনিয়ায়। এই ভাষা তার হৃদয়ের ভাষা। এই শব্দ তার কাছে বেশি পরিচিত, বেশি আপন। একজন শিশুর সঙ্গে তার পরিচিত ভাষায় কথা বলার মধ্যে গভীর মানসিক প্রভাব রয়েছে। ছোট্ট উম্মে খালেদ হয়তো মদিনার পরিবেশে নিজেকে কিছুটা আলাদা ভাবতেন। নতুন সমাজ, নতুন মানুষ, নতুন ভাষা—সবকিছুই তার জন্য ছিল অপরিচিত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তার সঙ্গে তার পরিচিত ভাষায় কথা বললেন, তখন হয়তো তার মনে মুহূর্তেই এক ধরনের স্বস্তি ও আপনত্ব তৈরি হয়েছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন—এই সমাজে তিনি বহিরাগত নন; তার ভাষা, তার বেড়ে ওঠা, তার অভিজ্ঞতাও এখানে সম্মানিত। এই ঘটনাটি শুধু একটি শিশুকে খুশি করার গল্প নয়; বরং এটি মানবিক যোগাযোগের এক অনন্য শিক্ষা। মানুষকে আপন করে নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার হৃদয়ের ভাষায় কথা বলা। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি স্মৃতি, আবেগ ও পরিচয়েরও অংশ। কেউ যখন আমাদের ভাষায় কথা বলে, তখন আমরা অবচেতনে তার প্রতি আকৃষ্ট হই। মনে হয়, সে আমাদের বুঝতে চায়, আমাদের জগতে প্রবেশ করতে চায়। উম্মে খালেদের ঘটনা আমাদের শেখায়, ইসলামের দৃষ্টিতে ভিন্ন সংস্কৃতি বা ভাষা কোনো দূরত্বের কারণ নয়। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে শেখায়। একজন মানুষ কোথায় জন্মেছে, কোন ভাষায় কথা বলে, কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছে—এসবকে অবজ্ঞা নয়, বরং সহমর্মিতার সঙ্গে বিবেচনা করতে বলে। আজকের বিশ্বে অভিবাসন, প্রবাসজীবন ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা খুব সাধারণ বিষয়। অসংখ্য শিশু এক দেশে জন্ম নেয়, অন্য দেশে বেড়ে ওঠে, আবার কোনো এক সময় মাতৃভূমিতে ফিরে আসে। এই শিশুদের মানসিক জগৎ বুঝতে পারা জরুরি। তারা অনেক সময় দুই সংস্কৃতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের সঙ্গে আচরণে যদি আন্তরিকতা ও বোঝাপড়া থাকে, তাহলে তারা সহজেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ওএফএফ
Go to News Site