Jagonews24
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্প খাতের মন্থর গতির কারণে এখনো অনিশ্চয়তার বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি দেশের অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন খাত প্রত্যাশিত গতি ফিরে না পাওয়ায় উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবার ওপর চাপ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এ বাজেট প্রণয়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের কর-সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন খাতে করহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কৃষিপণ্যে উৎসে কর বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রণোদনায় উৎসে কর দ্বিগুণ করা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। সম্প্রতি বাজেটসংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বৈঠকে এনবিআরের বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। তবে কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে আরও যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আরও পড়ুনআসছে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট, কর্মসংস্থান-মূল্যস্ফীতিতে নজরইশতেহার পূরণে ৫ অগ্রাধিকার, দুই কার্ডেই বরাদ্দ ১৭ হাজার কোটি টাকাতিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয়ে বৈদেশিক ঋণ লাখ কোটিরও বেশি আসন্ন বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে স্থানীয় ঋণপত্র (এলসি) কমিশনের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কর বৃদ্ধির আওতায় আসতে পারে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, দারুচিনি, লবঙ্গ ও খেজুরসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য। পাশাপাশি কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ এবং সব ধরনের ফল আমদানিতেও একই করহার কার্যকরের প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ কর বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পণ্যের দাম এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া জাহাজ ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি ব্যয়ও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা বাড়ানোর পরিবর্তে করের চাপ বৃদ্ধি করা হলে কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে পারে। তার মতে, এ ধরনের নীতি অব্যাহত থাকলে অনেক উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে এই খাত ছেড়ে অন্য ব্যবসায় চলে যেতে পারেন। ‘রপ্তানি খাতে করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বর্তমানে তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হলেও আসন্ন বাজেটে তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার চিন্তা করা হচ্ছে। এতে রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।’ —বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান রপ্তানি খাতেও করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। বর্তমানে এ প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হলেও আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার চিন্তা করা হচ্ছে। এতে রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, যেসব খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়, সেখানে মুনাফার হিসাব ভিন্নভাবে বিবেচিত হয়। সরকার একদিকে প্রণোদনা দিচ্ছে, অন্যদিকে কর বাড়িয়ে সেই সুবিধার বড় অংশ আবার ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিপণ্য ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম খাতেও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, এলইডি লাইট কিংবা সিসি ক্যামেরা বিলাস পণ্য নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণে পরিণত হয়েছে। এসব পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব বাজারদরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ‘প্রযুক্তিপণ্য ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মোবাইল, ফ্রিজ, এসি, এলইডি লাইট ও সিসি ক্যামেরার কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব বাজারদরে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।’ — বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান একই সঙ্গে এটিএম মেশিনসহ প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা সরঞ্জামের খরচও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। যদিও এসব প্রস্তাব আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে পানীয় বা বেভারেজ পণ্যে নতুন করে কর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র, বিশেষ করে পিস্তল, রিভলভার ও শর্টগানের লাইসেন্সধারীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায়ের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এজন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন ফি বা কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর। আসন্ন বাজেটে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাত থেকেও নতুন করে কর আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক প্রস্তাবে ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলের ওপর বছরে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসিতে পাঁচ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের কথা ছিল। আরও পড়ুনকরপোরেট গভর্নেন্সের খসড়া: স্বতন্ত্র পরিচালক থেকে অডিট সবখানে কড়াকড়িসিগারেটকে তরুণদের নাগালের বাইরে রাখতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জীবনমান উন্নয়নে জোর তবে এ করহার তুলনামূলক বেশি মনে করে তা পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলে কর এক হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসিতে তিন হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট ও বাজার মন্দার মধ্যে নতুন কর আরোপ করা হলে বিক্রি আরও কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ওপর পড়বে বলে মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে মোটরসাইকেল ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সচিব এবং অ্যাটলাস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শামসুল আরেফিন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে তিন থেকে চার মাস ধরে মোটরসাইকেলের বাজারে মন্দাভাব চলছে। এর মধ্যে অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতির মুখে পড়বেন এবং অতিরিক্ত খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের বহন করতে হবে। হোন্ডার চিফ মার্কেটিং অফিসার শাহ মো. আশেকুর রহমানের মতে, নতুন কর আরোপ হলে মোটরসাইকেল খাতে সংকট আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা কম সিসির মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তারা বেশি প্রভাবিত হবেন। আরও পড়ুনপাবজি-সিওডি খেলতেও দিতে হবে করঅসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের দাম বাড়ানোর দাবি চিকিৎসকদের সোনা আমদানির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। বর্তমানে সোনা আমদানিতে ৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর রয়েছে। বৈধ পথে সোনা আমদানি উৎসাহিত করতে প্রতি ভরিতে পাঁচ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল এনবিআর। তবে সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় এ হার আরও কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সিগারেটের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন তিনি। সবমিলিয়ে কর বাড়ানোর নানা পরিকল্পনার মধ্যেও ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কে কিছুটা স্বস্তির আভাস পাওয়া গেছে। আগে ব্যাংক হিসাবে তিন লাখ টাকার বেশি জমা থাকলেই আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হতো। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সেই সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা হচ্ছে। ফলে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের ওপর কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। পাঁচ লাখ টাকার বেশি জমা থাকলে ৫০০ টাকা শুল্ক প্রযোজ্য হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ পরিবর্তনের ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। এসএম/এমএএইচ/এমএমএআর/এমএফএ
Go to News Site