Somoy TV
শিশুদের জন্য ফ্রি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির নামে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। টিফিনে মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি খেয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আরও নানা অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকশ কিলোমিটার দূর থেকে বাসি ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এমনকি শিক্ষকদের খাবার বিতরণ ‘শেখানোর’ নামেও খরচ করা হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে দারিদ্র্যপীড়িত দেড়শ উপজেলায় সরকারিভাবে বিনামূল্যে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করা হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে শুরুতে ‘ফ্রি মিডডে মিল’ বেশ সাড়া ফেলেছিল। তবে গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খেয়ে ২০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কামতা ও ধামসী স্কুলে গিয়েও দেখা যায়, মিডডে মিল যেন ভাগ্যনির্ভর। কেউ পুরো রুটি পাচ্ছে, কেউ অর্ধেক। খাবার বিতরণ ও মৌসুমি ফল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। শিক্ষার্থীরা জানায়, কাউকে একটি রুটি দেয়া হয়েছে, কেউ ডিম পেয়েছে, আবার কেউ দুটি রুটি পেয়েছে। শেষে যারা দাঁড়িয়েছে, তারা পেয়েছে শুধু একটি রুটি। উপজেলার ইউসুফগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা দুটি রুটির উৎপাদনের তারিখ এক হলেও একটি এতটাই শক্ত যে তা খাওয়া কঠিন। বিষয়টি দেখে বিব্রত হন প্রধান শিক্ষকও। তিনি বলেন, একই তারিখে উৎপাদন হলেও মানে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। জানা যায়, দিনাজপুরে উৎপাদিত খাবার ঢাকায় এনে পরে স্কুল পর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ২ হাজার ১৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও দেরিতে প্রকল্প শুরু হওয়ায় এর প্রায় অর্ধেক অর্থ ছাড় দেয়া হয়েছে। সে হিসেবে ১ হাজার ৯৮০ কোটি ৫১ লাখ টাকার কাজ ভাগ করে নিয়েছে কয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মেসার্স সমতা ট্রেডার্স একাই ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য ২৪০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। আরও পড়ুন: স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়ম পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে ঢাকা ও ময়মনসিংহে সরবরাহের জন্য খাবার তৈরি হচ্ছে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরের দিনাজপুরে। এই দুই বিভাগের ২৬টি উপজেলায় পাউরুটি উৎপাদনের পর শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে সময় লাগছে ৩০ থেকে ৫০ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রায় দেড় থেকে দুই দিন। অনেক সময় বিতরণের আগেই খাবারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করলেও ঠিকাদারদের শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই দায় সারছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্টো তিনি আউটসোর্সিংয়ের জন্য টেন্ডার দেয়া হলেও লোকবল সংকটের কথা বলেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ফিডিং কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ বলেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হচ্ছে। এদিকে, প্রকল্পের বাজেট নথি অনুযায়ী, খাবারের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে হ্যান্ডওয়াশ, প্রশিক্ষণ, আউটসোর্সিং ও ছাপাখানার কাজে। শুধু হ্যান্ডওয়াশ কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৮ কোটি টাকা। এছাড়া ১৫০ উপজেলার শিক্ষকদের খাবার বিতরণ শেখাতে প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা। মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ আরও বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের ঢাকায় এনে কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হ্যান্ডওয়াশসহ বিভিন্ন স্টেশনারি সামগ্রী সরবরাহের জন্যও আলাদা টেন্ডার করা হয়েছে। তবে অর্ধশত কোটি টাকার হ্যান্ডওয়াশ হয়তো শিশুদের হাত পরিষ্কার করবে, কিন্তু নিম্নমানের খাবার শিশুদের স্বাস্থ্যে কতটা পুষ্টি যোগাবে, সেই প্রশ্ন এখন থেকেই যাচ্ছে।
Go to News Site