Collector
হাওড়ের পানি থেকে শেষ সম্বলটুকু তোলার চেষ্টা | Collector
হাওড়ের পানি থেকে শেষ সম্বলটুকু তোলার চেষ্টা
Somoy TV

হাওড়ের পানি থেকে শেষ সম্বলটুকু তোলার চেষ্টা

বন্যা ছাড়াই এবছর নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতেই তলিয়ে নষ্ট হয়েছে ৩৭২ কোটি টাকার অধিক মূল্যের ধান। যে যেভাবে পারছেন পানি থেকে শেষ সম্বলটুকু তুলে আনার চেষ্টা করছেন।অতিরিক্ত শ্রমিক মজুরি, ধানের দাম কম সব মিলিয়ে দিশেহারা কৃষক। বর্গায় জমি আবাদে বিপাকে প্রান্তিক চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মাসেই শেষ হবে সর্বত্র ধান কাটা। তবে এবারের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে নাব্যতা সংকটকে দায়ী করছে কৃষি বিভাগ। চলছে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের কাজ। তবে মাঠ ঘুরে দেখা গেছে সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক। নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলের একমাত্র ফসল বোরো ধান। আর এই ফসলই এবার তলিয়ে গেছে বন্যা ছাড়াই অতিবৃষ্টির কারণে। জলাবদ্ধতা রূপ নিয়েছে বন্যায়। বৈশাখে যখন চারদিকে ধানের মৌ মৌ গন্ধ থাকার কথা, তখন বাতাসে ছড়িয়েছে পচা ধানের গন্ধ। আর ডুবে যাওয়া শেষ সম্বল রক্ষায় চালিয়েছেন প্রাণপণ লড়াই। পানিতে নেমে ধান কেটে নৌকায় করে পাড়ে নিয়েছেন অনেকে। আবার টাকার অভাবে অনেকে প্লাস্টিকে করেই টেনে তুলেছেন ধান। এমন চিত্র নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলের প্রতিটি উপজেলার। শুধু হাওড় নয়, অপরিকল্পিত বাঁধে পানি নামার জায়গা না থাকায় এবার বৃষ্টির পানিতেই জলাবদ্ধতায় ডুবেছে আপামর কৃষকের স্বপ্ন। সর্বত্র কম বেশি একই অবস্থা। প্রান্তিক কৃষকদের চোখেমুখে অনিশ্চয়তা। হাজারো বর্গা চাষিরা নিঃস্ব। নিজের ধান হারিয়ে অনেকে অন্যের ধান কেটে দিচ্ছেন। যেগুলো তুলেছে তার অর্ধেকে গজিয়েছে চারা। বাকি অর্ধেকে দাম নেই। ফলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও বছরের একমাত্র ফসল জোটেনি কপালে। ধান শুকানোর পর কমেছে আরও অর্ধেকে। কাঁচাই বিক্রি করছেন পানির দামে। ভুক্তভোগীরা জানান, জেলার ১০ উপজেলার এখন বেশিরভাগ উপজেলাগুলোর হাওড়, বিল ও নিচু জমি সিংহভাগ পানিতে তলিয়েছে। বেশিরভাগ প্রান্তিক কৃষক নিজের সব জমি ডুবে গিয়ে এখন অন্যের ধান কেটে দিচ্ছেন দেড়/দুই হাজার টাকা মজুরিতে। তারওপর অতিবৃষ্টি আর বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকও পাওয়া যায়নি। তিন হাজার টাকা পর্যন্ত শ্রমিক মজুরি দিয়ে ধান কাটিয়েছেন অনেক কৃষক। এছাড়াও জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করায় তখন হারভেস্টার মেশিন পায়নি। তা না হলে কিছু ধান কেটে নিতে পারতেন। কিছু মেশিন পাওয়া গেলেও জলাবদ্ধতায় পানিতে নামাতে পারেনি। কাটতে গিয়ে বিকল হয়েছে অনেক মেশিন।  এছাড়া বিগত সময়ে সরকারের ভর্তুকি মূল্যে দেয়া হারভেস্টার মেশিনেও দুর্নীতি হওয়ায় কাগজে কলমে মেশিনের তালিকা অনুযায়ী মাঠে পাওয়া যায় নি। মেশিন সংকটও দুর্ভোগে ফেলেছে কৃষকদের। এর বাইরে বছর বছর প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ছিল না কোনো সমীক্ষা। দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের অর্থের লোভে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ কর্মসূচির ফলে মাটিতে ভরাট হয়েছে উল্টো জলাশয়। যে কারণে সেচের পানি পাওয়া যায়নি সময় মতো। মেশিন বসিয়ে পানির জন্যেও খরচ করতে হয়েছে। আবার বৃষ্টির পানি যখন নেমে যাওয়ার কথা, তখন পানি নামার জায়গা না থাকায় জমি তলিয়ে গেছে। আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় পাচারকালে ৬৬৭ বস্তা সরকারি চাল জব্দআটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী মঙ্গলসিদ্ধ এলাকার কৃষক সলিম উদ্দিন ও স্ত্রী কৃষাণী রোকেয়া আক্তার জানান, তারা আগে ছিলেন বানিয়াজান ইউনিয়নের মোবারকপুর গ্রামে। সেখান থেকে তেলিগাতী ইউনিয়নের খাজান্তি মঙ্গলসিদ্ধ গ্রামে বাগরার ধলি পুরি হাওড়ে একমাত্র ফসল তাদের বোরো আবাদ করেন। মাত্র পাঁচকাঠা জমিতে। এবার আরও আট কাঠা বর্গা নিয়ে মোট ১৩ কাঠা আবাদ করেছিলেন। যার অর্ধেকের বেশি তলিয়ে গেছে। খাল খনন কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতির কারণে ১০ কিলোমিটার খালটি দুই তিন কিলোমিটার করে বন্ধ করে দেয়। যে কারণে এবার তাদের হাওড়ে বৃষ্টির পানি জমেই ফসল সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। এখন বর্গা নেয়া জমির টাকা ঠিকই দিতে হবে। ফসলের আশায় ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন যা এখন মড়ার ওপর খারার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বাড়ি বদল করায় জাতীয় পরিচয় পত্রের ঠিকানা বানিয়াজান ইউনিয়ন হওয়ায় তেলিগাতী ইউনিয়নের সুবিধা পাচ্ছেন না। এমন নানা সঙ্গটে পড়েছে এই কৃষক দম্পতি। স্ত্রী রোকেয়া বলন, ৬ মণ ধান তিনি সিদ্ধ করে শুকিয়ে ৩ মণ পেয়েছেন। সরকারের দামে বিক্রি করতে গিয়ে ধান উপযুক্ত করতে গেলে কিছুই থাকে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিক খরচসহ সব মিলিয়ে কোন রকমে পানিতে ডুবে ধান কেটে এনে বিক্রি উপযোগী করার চেষ্টা করে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা দরেই বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এদিকে ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষক মামুন মিয়া জানান, ডুবে যাওয়া ধান কাটলেও পাড়ে আনতে গেলে নৌকা লাগে। আর নৌকা ভাড়া দিতে গেলে দেড় থেকে দুই মণ ধান দিতে হয়। শ্রমিক লাগে দেড় দুই হাজার টাকা। নৌকা খরচ এরপর আছে মাড়াই খরচ। সব মিলিয়ে খাবারের জন্যও কিছুই থাকে না। তাই নৌকার খরচ বাঁচানোর জন্য অন্তত প্লাস্টিকের নৌকা বা ত্রিপালে করে গানগুলো আনার চেষ্টা করছেন। কৃষি বিভাগের সুযোগ সুবিধা তারা পান না। আরও পড়ুন: হাওড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেবে সরকারকৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবার নেত্রকোনায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে জেলার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ মোট ৬ উপজেলার হাওড়ে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমি আবাদের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর। পুরো নষ্ট হয়েছে ১০ হাজার ৪২৭ হেক্টর। জেলার সর্বত্র ডুবেছে ১৮ হাজার ৪৪৭ হেক্টর। সব মিলিয়ে নষ্ট হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭৭ হেক্টর। যার আর্থিক মূল্যে ক্ষতি ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ। শুধু হাওড়ে ক্ষতি হয়েছে ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকার। কৃষি বিভাগের আরও তথ্য মতে, জেলার চার লক্ষাধিক কৃষকের মধ্যে এবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭৭ হাজার ৩৬৩ জন। তার মধ্যে হাওড়েই ৩৮ হাজার ২৩৮ জন এবং নন হাওড়ে ৩৯ হাজার ১২৫ জন।

Go to News Site