Somoy TV
রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব হারাচ্ছে, কমছে সহায়তার তহবিলও। শুরুতে বছরে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা মিললেও গত বছর থেকে তা নেমেছে ৪০০-৫০০ মিলিয়নে। এমন পরিস্থিতিতে সংকটটি ফের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ইউএনএইচসিআর ও ডব্লিউএফপির যৌথ উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় কমিশন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন।বিশ্বের সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির এখন কক্সবাজারে। উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমিজুড়ে ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এসব মানুষ প্রায় ৯ বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এদিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বড় চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। উজাড় হয়েছে বনভূমি, ধ্বংস হয়েছে পাহাড়, বেড়েছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এর মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি। বিশ্বজুড়ে একের পর এক বড় সংকটের ভিড়ে গুরুত্ব হারাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু। সংকটের শুরুতে বছরে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা মিললেও গত বছর থেকে তা নেমে এসেছে প্রায় ৪০০-৫০০ মিলিয়নে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে মাঠে নেমেছে জাতিসংঘ। ইউএনএইচসিআর ও ডব্লিউএফপির যৌথ উদ্যোগে দাতাদেশ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় কমিশন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের ২৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল গত দুইদিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ২৩ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ইউএনএইচসিআরের ৩ জন, ডব্লিউএফপির ৩ জন, দাতা দেশ অস্ট্রেলিয়ার ৫ জন, কানাডার ২ জন, ইউরোপীয় কমিশনের ২ জন, ফ্রান্সের ৩ জন, নেদারল্যান্ডসের ১ জন, সুইডেনের ১ জন ও যুক্তরাজ্যের ৩ জন সদস্য ছিল। আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা তোহার বাড়ি আছে চট্টগ্রামে, বানিয়েছে এনআইডি-পাসপোর্ট প্রতিনিধিদলটি গত রোববার (১৭ মে) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউএনএইচসিআর রেজিস্ট্রেশন সেন্টার, অপুষ্টি চিকিৎসা কেন্দ্র, ডব্লিউএফপির খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম, লজিস্টিক হাব, এলপিজি বিতরণ কার্যক্রম ও নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করে। এ সময় তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও বিভিন্ন কার্যক্রমের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর সোমবার (১৮ মে) স্থানীয় কৃষকদের মানবিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তকরণ কার্যক্রম, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন কেন্দ্র, স্কুল ফিডিং ও লার্নিং সেন্টার, নারী ও কিশোরীদের নিরাপদ কেন্দ্র, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম এবং রোহিঙ্গা কালচারাল মেমোরি সেন্টার পরিদর্শন করেন প্রতিনিধিদল। এরপর বিকেলে প্রতিনিধিদলটি শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করে। বৈঠক শেষে ইউএনএইচসিআরের ডেপুটি হাইকমিশনার ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক জানান, বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জেলা প্রশাসক মো: আ: মান্নান বলেন, প্রতিনিধি দলের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, সীমিত আয়তনের কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান স্থানীয় জনগণের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায়। আরও পড়ুন: টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোলাগুলি, প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত ১ তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেন তারা নিজ নিজ সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের পক্ষ থেকে প্রতি বছর যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা (জেআরপি) গ্রহণ করা হয়। আগে এ খাতে গড়ে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল পাওয়া গেলেও গত বছর থেকে তা কমে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে এবারের সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় অর্থায়নকারী প্রধান দেশগুলোর প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর দূতাবাস এবং প্রতিনিধি দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ইউএনএইচসিআর ও ডব্লিউএফপির যৌথ ডোনার টিমও এই সফরে অংশ নেয়। আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার, রূপ নিচ্ছে জাতীয় সংকটে তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাগুলোর মধ্যে খাদ্য সহায়তা অন্যতম, যা মূলত ডব্লিউএফপি ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে দেয়া হয়। খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাদ্য না থাকলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অস্থিরতা বাড়ে। তাই এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং বিভিন্ন অসামাজিক কার্যক্রম কমাতে ডোনারদের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিজানুর রহমান বলেন, সফরের সময় প্রতিনিধি দলের কাছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সফর শেষে প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে তাদের সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অবহিত করবেন। তিনি জানান, প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন ইউএনএইচসিআরের ডেপুটি হাইকমিশনার। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বর্তমানে বিশ্বে একাধিক বড় সংকট চলমান থাকায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। তবে এই সফরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আনার চেষ্টা করা হবে।
Go to News Site