Somoy TV
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরিকল্পনা করেছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খারাপ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক আবার ঠিক করা যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ড্র্প সাইট নিউজের এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে।ড্রপ সাইট নিউজ জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া কূটনৈতিক বার্তা, বিভিন্ন নথি ও ভেতরের সূত্রের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রথমবারের মতো ‘ক্যাবল আই-০৬৭৮’ নামে একটি গোপন নথিও প্রকাশ করেছে। এক্স-এ এক পোস্টে ড্রপ সাইট এটাকে সেই নথি বলে দাবি করেছে, যেটা ইমরান খানের সরকার পতনের সূচনা করেছিল। তবে প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা বা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক কয়েক বছর ধরেই খারাপ হচ্ছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে সরানো হলে ‘সবকিছু মাফ করে দেয়া হবে’। ‘সব মাফ করে দেয়া হবে’ ২০২১ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান উইলিয়াম জে. বার্নস ইসলামাবাদে যান। উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে পাকিস্তানের সহযোগিতা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে ড্রোন অভিযান চালাতে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বার্নসের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। খানের কার্যালয় নাকি জানায়, তিনি শুধু সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে কথা বলবেন। অথচ বাইডেন তখন পর্যন্ত খানের ফোনালাপের অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বার্নস পুরো দিন ইসলামাবাদে অপেক্ষা করলেও বৈঠক হয়নি। কয়েক সপ্তাহ পরই তালেবান কাবুল দখল করে নেয়, যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। আরও পড়ুন: ভারতের সেনাপ্রধানের হুমকির কী জবাব দিলো পাকিস্তান প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুরোধও ইমরান খান নাকচ করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সময় খানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো থাকলেও বাইডেন প্রশাসন তাকে অস্থিতিশীল, পশ্চিমবিরোধী এবং মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে মিল না রাখা নেতা হিসেবে দেখত বলে দাবি করেছে ড্রপ সাইট। একই সময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানকে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করার জন্য চাপ দিচ্ছিল, যা খান মানতে চাইছিলেন না। এতে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় যে, খান দেশকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানের জেনারেলরা গোপনে ওয়াশিংটনে লবিস্ট হিসেবে সিআইএর সাবেক ইসলামাবাদ স্টেশন প্রধানকে নিয়োগ দেন, কিন্তু এ বিষয়ে খানের সরকারকে জানানো হয়নি। এটিকে সেনাবাহিনীর বেসামরিক সরকারের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। যুদ্ধ শুরুর দিনই ইমরান খান মস্কো সফরে গিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র তাকে এই সফর বাতিল করতে বলেছিল, কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করেন। আরও পড়ুন: সৌদি আরবে যুদ্ধ বিমান ও হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করল পাকিস্তান পরের মাসে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ও মার্কিন কর্মকর্তা ডনাল্ড লু’র বৈঠকের একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তা ফাঁস হয়। সেখানে নাকি ডনাল্ড লু বলেন, ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে সরানো হলে ‘সবকিছু মাফ করে দেয়া হবে’। যদিও বাইডেন প্রশাসন যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে। এরপর ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল অনাস্থা ভোটে ইমরান খান ক্ষমতা হারান। এরপর শুরু হয় ব্যাপক দমন-পীড়ন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তাদের নির্বাচনী প্রতীক হারায়। দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার, দলত্যাগে বাধ্য করা বা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়। ইমরান খান এখনও কারাগারে আছেন। খান ক্ষমতা হারানোর পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইসলামাবাদ আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ায়, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করে এবং ধীরে ধীরে চীন থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)-এর বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প আর্থিক সংকট, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সামরিক নেতৃত্বের কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে স্থবির হয়ে পড়ে। আরও পড়ুন: ‘কুমারী মেয়ের’ মৌনতাই বিয়ের সম্মতি, আফগানিস্তানে নতুন আইন! প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের নতুন সামরিক-সমর্থিত সরকার গোপনে ইউক্রেনকে গোলাবারুদ সরবরাহ শুরু করে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও মধ্যবর্তী দেশগুলোর মাধ্যমে পাঠানো হতো। সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, পাকিস্তানের আইএমএফ ঋণ সহায়তা অব্যাহত রাখতে এই অস্ত্র সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আইএমএফ পাকিস্তানের জন্য ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অনুমোদন করে। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া ক্ষমতা ছাড়ার আগেই এসব পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি ওয়াশিংটন সফর করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা, পারমাণবিক নীতিতে উত্তেজনা কমানো এবং চীন থেকে কিছুটা দূরে সরে আসার ইঙ্গিত দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কিছুদিন পর প্রেসিডেন্ট বাইডেন পাকিস্তানকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি’ বলে মন্তব্য করেন, কারণ দেশটির কাছে ‘সমন্বয়হীন পারমাণবিক অস্ত্র’ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই বাজওয়া অবসরে যান।
Go to News Site