Jagonews24
বাংলাদেশ থেকে পোশাক, চামড়া ও প্লাস্টিকের মতো বেশ কয়েক ধরনের পণ্য রপ্তানি হয় নিউজিল্যান্ডে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ওশেনিয়া অঞ্চলের এই দেশটিতে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট যে পরিমাণ আয় করে, তার প্রায় দ্বিগুণ অর্থ চলে যাচ্ছে দেশটি থেকে শুধু গুঁড়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানিতে। এ পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের এমন চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডে মোট ৯ কোটি ৯৭ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। যেখানে ওই বছরে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ শুধু গুঁড়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করেছে প্রায় ১৮ কোটি ডলারের। প্রতিবেদন বলছে, ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৩৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ, অর্থবছর হিসাবে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখন ২৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার। শীর্ষ রপ্তানিকারকের পাশাপাশি কোয়ালিটি ও কমপ্লায়েন্সেও নিউজিল্যান্ড সেরা। আমদানি পলিসিতে দুধের ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, নিউজিল্যান্ড সেগুলো মেনে ব্যবসা করে। যে কারণে দুধের জন্য দেশটি আমাদের কাছে সবচেয়ে সেরা সোর্স।—দেবব্রত রায় অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তথ্য বলছে, দেশে বছরে আনুমানিক ৩০ কোটি ডলার মূল্যের দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করা হয়। অর্থাৎ, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট আমদানি করা দুগ্ধজাত পণ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসছে নিউজিল্যান্ড থেকে। তথ্য বলছে, এর বাইরে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও পোল্যান্ড থেকেও দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। আরও পড়ুনবাংলাদেশে স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যে আগ্রহী নিউজিল্যান্ডরপ্তানি ও কৃষিখাতে বাড়তি কর, রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ার শঙ্কাদেশের খাঁটি খামারিদের সম্মাননা দেবে ‘প্রাণ দুধ’ বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চায় নিউজিল্যান্ড। যে কারণে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। বাজারে সরবরাহের জন্য কনটেইনারে দুধ প্রস্তুত করা হচ্ছে/ফাইল ছবি গত রোববার (১৭ মে) সচিবালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেভিড পাইন এ আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর যেন বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে নিউজিল্যান্ড বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বস্ত, উচ্চমানসম্পন্ন, নিরাপদ এবং জিএমওমুক্ত হিসেবে সুপরিচিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নিউজিল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা সম্ভাবনাময় খাতসমূহে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারেন। ‘বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করুক বা না-ই করুক, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে প্রতি বছর ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে’—যোগ করেন মন্ত্রী। দুধে নিউজিল্যান্ডে কেন বেশি ঝোঁক? স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় বাাংলাদেশের আমদানিকারকদের পছন্দের তালিকায় প্রথম থাকে নিউজিল্যান্ড। এছাড়া বাংলাদেশে ওই দেশের একাধিক দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে, যারা বাংলাদেশের বাজারে এখন দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের অন্যতম জোগানদাতা। বিশ্বের সামগ্রিক দুগ্ধজাত পণ্যের বাণিজ্যে নিউজিল্যান্ডকে অন্যতম ‘পাওয়ার হাউজ’ বলা হয়। বিশেষ করে গুঁড়া দুধ রপ্তানিতে বিশ্বে এককভাবে শীর্ষে তারা। ওই দেশে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। যে কারণে বাংলাদেশের বাজারে আসা গুঁড়া দুধের বড় অংশই আসে নিউজিল্যান্ড থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডে মোট ৯ কোটি ৯৭ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। যেখানে ওই বছরে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ শুধু গুঁড়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করেছে প্রায় ১৮ কোটি ডলারের।—বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য এছাড়া নিউজিল্যান্ডের সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফন্টেরা বিশ্বের বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানিকারক কোম্পানি। বাংলাদেশের বাজারে বহুল পরিচিত বেশ কয়েকটি গুঁড়া দুধের ব্র্যান্ডের মূল সরবরাহকারী এই প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নেসলে বাংলাদেশের পরিচালক দেবব্রত রায় জাগো নিউজকে বলেন, ‘শীর্ষ রপ্তানিকারকের পাশাপাশি কোয়ালিটি ও কমপ্লায়েন্সেও নিউজিল্যান্ড সেরা। এছাড়া আমাদের আমদানি পলিসিতে দুধের ক্ষেত্রে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, নিউজিল্যান্ড সেগুলো নিশ্চিতভাবে মেনে ব্যবসা করে। যে কারণে দুধের জন্য দেশটি আমাদের কাছে সবচেয়ে সেরা সোর্স।’ আরও পড়ুনদুগ্ধপণ্য আমদানিতে চীনের নতুন শুল্ক, ‘অযৌক্তিক’ বলছে ইইউডেইরি উন্নয়ন বোর্ড কী কী কাজ করবে?দুধের দামে সন্তুষ্ট নন খামারিরা, কমাচ্ছেন গরু আমদানিকারক ও সরবরাহকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিউজিল্যান্ড থেকে দুধ এনে দেশের বাজারে সরবরাহ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গুঁড়া দুধের বাজারে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও ভরসা নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ। দেশের খামারিরা অনেক সময় দুধের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন/ফাইল ছবি মূলত, এসব প্রতিষ্ঠান তিন ধরনের দুধের গুঁড়া আমদানি করে। হোল মিল্ক পাউডার, স্কিমড মিল্ক পাউডার ও ফিল্ড মিল্ক পাউডার। এই আমদানি নিয়মিত হারে বাড়ছে। দেশের বাজারে সবচেয়ে প্রচলিত ব্র্যান্ড ডিপ্লোমা নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ-এর পণ্য। এছাড়া বিদেশি এ প্রতিষ্ঠানের রেড কাউ, হ্যাপি কাউ, ফার্মল্যান্ড ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধসহ বাটার ঘি-এর মতো দুগ্ধজাত পণ্যের ব্যবসা রয়েছে। এছাড়া দেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ, আবুল খায়ের গ্রুপের মার্কস ও স্টারশিপ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণ মিল্ক পাউডার এবং দেশের সরকারি দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা গুঁড়া দুধ বাজারে প্রচলিত। এসব প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ মিল্ক পাউডার নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডস থেকে আসে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে তরল দুধের বাইরে গুঁড়া দুধের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। চাহিদা মেটাতে বছরে আনুমানিক এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টন গুঁড়া দুধ আমদানি করে বাংলাদেশ। এনএইচ/এমকেআর/এমএফএ
Go to News Site