Collector
রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের পাতা কেটে কোটি টাকা আত্মসাৎ | Collector
রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের পাতা কেটে কোটি টাকা আত্মসাৎ
Somoy TV

রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের পাতা কেটে কোটি টাকা আত্মসাৎ

দলিলের পাতা কাটাছেঁড়া, বালাম বইয়ের পাতা গায়েব এবং পে-অর্ডারের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে এক ভয়ংকর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে গাইবান্ধা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস।জমিজমার কাগজপত্রের নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থল মহাফেজখানা বা রেকর্ড রুমেই চলছে এই জালিয়াতির মহোৎসব। এই সিন্ডিকেটের কবলে কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ; এমনকি তীব্র দুশ্চিন্তায় প্রাণ হারিয়েছেন এক ভুক্তভোগীও। গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর গণশুনানি এবং ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মহাফেজখানা ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চক্রের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মহাফেজখানায় বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত গাইবান্ধা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের তৃতীয় তলার মহাফেজখানায় সাধারণ মানুষের প্রবেশে কড়া বিধিনিষেধ থাকার কথা থাকলেও, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে সেখানে দালাল ও বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত লক্ষ্য করা গেছে। সরেজমিনে মহাফেজখানায় অফিস সহকারী মশিউরের সাথে বসে থাকতে দেখা যায় জুয়েল নামে গোবিন্দগঞ্জের এক নকল নবিশকে। মশিউর দাবি করেন, জুয়েল তার ভাই; আর জুয়েলের দাবি, তিনি একটি কাজে মশিউরের সাথে দেখা করতে এসেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই রেকর্ড রুমে অফিসের পিয়ন বা সাধারণ কর্মচারীরাও অবাধে চলাচল করছেন। এছাড়া এই মহাফেজখানা ঘিরে দুই পাশে থাকা নকল নবিশদের কক্ষগুলোতেও বহিরাগতদের যাতায়াত অনিয়ন্ত্রিত। অভিযোগ রয়েছে, নকল নবিশরা যখন মূল ভলিউম এবং দলিলের জাবেদা নকল করেন, ঠিক সেই সময়ই মূলত এই দলিলগুলোর পাতা কাটাছেঁড়া, দাগ, খতিয়ান এবং দাতা-গ্রহীতার নাম পরিবর্তন বা ঘষামাজা করে তুলে ফেলা হয়। এমন দীর্ঘদিনের অভিযোগ থাকলেও মহাফেজখানার নিরাপত্তায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আরও পড়ুন: লাঠি যার জমি তার, টাকার বিনিময়ে হাতে হাতে বদল হয় খাস জমির মালিকানা! নাম মুছে ফেলা ও হয়রানির অভিযোগ টাকার বিনিময়ে বালাম বই থেকে ইচ্ছেমতো পাতা কাটাছেঁড়া ও খতিয়ান পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে খোদ অফিসের ভেতরের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এমন অন্যায়-অপকর্মের শিকার ভুক্তভোগীদের একজন গাইবান্ধা শহরের মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, জমির জাবেদা নকলের জন্য বারবার আবেদন করেও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাড়া পাননি। এরপর গত সোমবার (১১ মে) তিনি দুদকের গণশুনানিতে অভিযোগ করলে জেলা রেজিস্ট্রারকে বিষয়টি সমাধানের নির্দেশ দেয়া হয়। পরে তাকে ভলিউম দেখানো হলে তিনি দেখতে পান, তার জমির দলিলে ঘষামাজা করে তার নামই মুছে ফেলা হয়েছে। পরবর্তীতে জেলা রেজিস্ট্রার জহুরুল হক তাকে আদালতে মামলা করে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেন। দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মল্লিক বলেন, ‘রেজিস্ট্রি অফিস কর্তৃপক্ষ মাস্টাররোলের নামমাত্র বেতনে কর্মরত কর্মচারীদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ মহাফেজখানায় কাজ করায়। যার ফলে এই কর্মচারীদের প্রলুব্ধ করে নগদ অর্থের বিনিময়ে মহাফেজখানায় দলিলের পাতা কাটাছেঁড়া বা ঘষামাজা করার সুযোগ নেয় সিন্ডিকেট।’ পে-অর্ডারের টাকা গায়েব, দুশ্চিন্তায় দলিল লেখকের মৃত্যু রেজিস্ট্রি অফিসের এমন অব্যবস্থাপনার কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগী ব্যাংকার আব্দুল মজিদ মিয়া জানান, পে-অর্ডারের মাধ্যমে ৪ লাখ টাকা রাজস্ব জমা দিয়ে তিনি ও তার স্বজনরা ২০২২ সালে পৃথক দুটি কবলা দলিলে জমি ক্রয় করেন। জমি ক্রয়ের পর দলিলের জাবেদা নকলও তোলেন এবং বাড়ি করার জন্য ওই দলিল জমা দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। পরে ব্যাংকের লোকজন রেজিস্ট্রি অফিসে মূল দলিলের খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন, দলিলের পে-অর্ডারের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ায় দলিল দুটি রেজিস্ট্রিই হয়নি। কর্তৃপক্ষ তাকে আবারও পে-অর্ডারের মাধ্যমে রাজস্বের টাকা জমা দিতে বলে। দলিল করার চার বছর পার হলেও বিষয়টি সুরাহা করেনি কর্তৃপক্ষ। আরেক ভুক্তভোগী জানান, তিনি দেড় লাখ টাকা রাজস্ব পে-অর্ডারে জমা দিলেও পরে জানতে পারেন সেই টাকা জমা হয়নি। বেশ কয়েকটি দলিল রেজিস্ট্রি করার বছরখানেক পরে ২০২৩ সালের মে মাসে হঠাৎ দলিল লেখক সাদা মিয়া জানতে পারেন, তার বেশ কয়েকটি দলিলের কয়েক লাখ টাকার রাজস্ব (পে-অর্ডার) সরকারি তহবিলে জমা হয়নি। জমির ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে কী জবাব দেবেন- এই চরম মানসিক ট্রমা আর দুশ্চিন্তায় স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। তার সহকারী ইদ্রিস আলী জানান, এতগুলো টাকা কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেবেন, সেই চিন্তাতেই সাদা মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। আরও পড়ুন: দেড়শ কোটি টাকার ফেরিঘাট টার্মিনাল এখন ড্রেজার বেইজ দীর্ঘ তদন্ত ও ধীরগতির ব্যবস্থা তদন্তে জানা গেছে, ২৯ আগস্ট ২০২১ থেকে ১০ নভেম্বর ২০২২ পর্যন্ত তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার রজব আলীর কর্মকালে ১ হাজার ৯৩টি দলিলে ভয়ংকর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম হয়েছে। প্রায় তিন বছর পর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এক পত্রে বিষয়টি স্বীকার করেন জেলা রেজিস্ট্রার। ঘটনার সাথে জড়িত হিসেবে ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিহ্নিত করা হয়। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করারও প্রায় এক বছর পর চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি রাজস্বের অর্থ আত্মসাতে জড়িত ও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় অফিস সহায়ক আনিছুরকে সাময়িক বরখাস্ত এবং নকল নবিশ মিজানকে ১৫ জানুয়ারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন জেলা রেজিস্ট্রার। যদিও তদন্ত কমিটি ২৭ নভেম্বর ২০২৪ প্রতিবেদন দাখিল করেছিল, তারও প্রায় দুই বছর পর চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল গাইবান্ধা সদরের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার রজব আলীকে আত্মসাৎকৃত রাজস্বের অবশিষ্ট ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন নিবন্ধন দফতরের মহাপরিদর্শক। অভিযুক্তদের সম্পদ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অভিযুক্ত অফিস সহায়ক আনিছুরের বাড়িতে গিয়ে তার টিনশেড ঘরটি তালাবদ্ধ দেখা গেছে। অন্যদিকে, মাস্টাররোল কর্মচারী নকল নবিশ মিজান শহরের খানকাহ শরীফসহ বিভিন্ন এলাকায় দ্বিতল ভবনসহ একাধিক বাড়ি, দুটি গাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে মিজান ও আনিছ দুজনই রাজস্বের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। আর অবসরপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার রজব আলীর দাবি, তিনি পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এদিকে দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তার প্রশ্ন, ‘এত বড় জালিয়াতির পরও মূল রাঘব-বোয়ালদের বিরুদ্ধে কেন এখনও দৃশ্যমান ফৌজদারি বা আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি?’ জেলা রেজিস্ট্রার জহুরুল হক জানান, পুরো ঘটনা নিবন্ধন দফতরের মহাপরিদর্শককে অবগত করা হয়েছে এবং তার পরামর্শে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য, গত সোমবার (১১ মে) গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন ১২ জন ভুক্তভোগী। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা বা টাকা ফেরত দেয়াই শেষ কথা নয়, এই দুর্নীতির সাথে জড়িত মূল হোতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Go to News Site