Collector
গরুর হাটে ট্রাম্প সাহেব! | Collector
গরুর হাটে ট্রাম্প সাহেব!
Jagonews24

গরুর হাটে ট্রাম্প সাহেব!

গরু নিরীহ হলেও অত্যন্ত আলোচিত একটি প্রাণী। কোরবানির ঈদ এলে গরুর দাম ও কদর কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কেমন গরু কোরবানি করা হবে, সেই গরু কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে, তার দাম কত হবে, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, এককভাবে কোরবানি দেওয়া হবে নাকি ভাগে দেওয়া হবে, পশুর হাটে গিয়ে গরু কেনা হবে নাকি অনলাইনে বুকিং দেওয়া হবে—এসব নিয়ে এখন বাংলার ঘরে ঘরে আলোচনা, গবেষণা, বিশ্লেষণ। কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসে, ততই বোঝা যায় গরু কেবল একটি প্রাণী নয়; এটি অর্থনীতি, ধর্মীয় আবেগ, সামাজিক মর্যাদা এবং ফেসবুকীয় প্রতিযোগিতারও অংশ। এবারও দেশের বিভিন্ন হাটে নানা ধরনের ‘তারকা গরু’র খবর পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে নারায়ণগঞ্জে ‘ট্রাম্প সাহেব’ নামে একটি গরু সারা দেশে ভাইরাল হয়েছিল। গরুটির মাথার সামনের অংশে এমন এক ধরনের সোনালি-সাদা লোমের ছড়াছড়ি ছিল, যা অনেকের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বিখ্যাত চুলের স্টাইলের কথা মনে করিয়ে দেয়। গরুর মালিকও সুযোগ বুঝে তার নাম দিয়ে দেন ‘ ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এই ট্রাম্প সাহেবকে দেখতে ভিড় জমে যায়, ভিডিও করে, সেলফি তোলে, কেউ কেউ আবার মজা করে বলে, ‘এই গরু মনে হয় হাটে এসেও নির্বাচনী প্রচারণা চালাবে!’ এখনকার গরুর হাট আর আগের মতো নেই। আগে মানুষ গরু কিনতে যেত, এখন যায় তারকা দেখতে। একেকটি গরুকে এমনভাবে সাজানো হয়, যেন তারা সিনেমার নায়ক। কোথাও গলায় ফুলের মালা, কোথাও মাথায় রঙিন ফিতা, কোথাও আবার গায়ে লেখা ‘বস’, ‘সুলতান’, ‘কিং খান’, ‘কালা মানিক’ বা ‘বাহুবলী’। গরুরাও যেন বুঝে গেছে তারা সাধারণ গরু নয়; ক্যামেরা দেখলেই কেউ মাথা নাড়ে, কেউ ফোঁসফোঁস শব্দ করে, কেউ আবার রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। কোরবানির ঈদে আমাদের দেশের কিছু কিছু গরু রীতিমতো তারকার মর্যাদা পায়। তাদের নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়, ইউটিউবে ভিডিও হয়, ফেসবুকে লাইভ হয়। খামারিরা নিজেদের প্রিয় গরুগুলোকে আদর করে বাহারি সব নাম দেন। সেই নামের পেছনেও থাকে গল্প। কেউ রাজনৈতিক নেতার নামে, কেউ চলচ্চিত্র তারকার নামে, কেউ আবার আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের নামে গরুর নাম রাখেন। এ বছরের আলোচিত গরুগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাদশা’, ‘রাজাবাবু’, ‘কালাপাহাড়’, ‘ডন’, ‘মেসি’, ‘বাহুবলী’, ‘সুলতান’ এবং ভাইরাল ‘ট্রাম্প’। ‘বাদশা’ নামের লাল-সাদা বিশাল গরুটি নাকি অপরিচিত কাউকে দেখলেই মাথা ঝাঁকায়। ভাবখানা এমন, সুযোগ পেলেই গুতা দেবে। আবার ‘রাজাবাবু’ নামের এক বিশাল কালো গরুকে প্রতিদিন তিন বেলা গোসল করানো হয় এবং নিয়মিত হাঁটানো হয়। শুনলে মনে হয় গরু নয়, যেন কোনো অবসরপ্রাপ্ত আমলা স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে পড়েছেন। আমাদের দেশে জনপ্রিয় তারকাদের নামেও গরুর নাম রাখার প্রচলন বেশ পুরোনো। একসময় ‘সাকিব খান’ ছিল হিট। পরে এসেছে ‘হিরো আলম’। এখন কেউ কেউ ‘মেসি’, ‘রোনালদো’, ‘বাইডেন’, ‘ট্রাম্প’, এমনকি ‘এলন মাস্ক’ নামেও গরুর নাম রাখছেন। গরুরা অবশ্য এসব বিষয়ে নির্বিকার। তারা না জানে রাজনীতি, না জানে ফুটবল, না জানে নির্বাচন। তারা শুধু খড় খায়, ঘাস খায়, মাঝে মাঝে হাম্বা ডাকে এবং নিরীহভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষেরাই তাদের ঘিরে গল্প বানায়। তবে তারকা গরুর চাকচিক্যের আড়ালে সাধারণ খামারিদের কষ্টও কম নয়। উন্নত জাতের একটি গরুর বাছুর সংগ্রহ, খামার তৈরি, খাদ্য, ওষুধ, পরিচর্যা—সব মিলিয়ে বিপুল ব্যয় হয়। খামারিরা অভিযোগ করেন, বাজারে গরুর দাম যতই বাড়ুক, সেই তুলনায় খরচও বাড়ছে দ্রুত। আবার ক্রেতারাও সন্তুষ্ট নন। তাদের অভিযোগ, গরুর দাম শুনলে মনে হয় যেন গরুর সঙ্গে একটি প্লট ফ্রি দেওয়া হবে। ফলে দুই পক্ষই অসন্তুষ্ট থেকেও ঈদের বাজার সচল রাখে। গরু রাজনীতি না করলেও গরুকে নিয়ে রাজনীতি আছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে গরু একসময় প্রায় রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়েছে। সেখানে গরু খাওয়া, না খাওয়া, গো-মূত্র, গোমাংস—এসব নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ প্রবল আবেগ ও উন্মত্ততায় রাজনীতি করেন। গো-রাজনীতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, কখনো কখনো মনে হয় গরুর চেয়ে মানুষই বেশি বিপন্ন। এখানে বরং ফুটবলের একটি কৌশলের কথা বলা যায়। ফুটবলে ‘ফলস রান’ নামে একটি কৌশল আছে। যখন পেনাল্টি বক্সে বল বাড়ানো হচ্ছে, তখন এক স্ট্রাইকার হঠাৎ একদিকে দৌড় দেন। ডিফেন্ডাররাও তার পিছু নেয়। অথচ বল তার দিকে যাবে না। অন্য দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার এসে নিরিবিলিতে গোল করে দেন। প্রথম স্ট্রাইকারের কাজ ছিল কেবল মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। রাজনীতিতেও অনেক সময় গরুকে ব্যবহার করা হয় ঠিক সেই ‘ফলস রান’-এর মতো। জনগণ যখন কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে চায়, তখন সামনে এনে দেওয়া হয় অন্য আবেগঘন বিতর্ক। গো-রাজনীতি সেই তালিকায় একটি সফল সংযোজন। তবে রাজনীতির আলোচনা বাদ দিলেও গরুর গুরুত্ব কমে না। গরু কেবল লাথি কিংবা গুঁতোই দেয় না; বরং দুধ দেয়, মাংস দেয়। অনেকটা শিল্পপতিদের মতো। তারা কেবল ‘শ্রম শোষণ’ই করেন না, জীবিকা ও মজুরিও দেন। গরুও তেমন। গরুকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের জীবিকা তৈরি হয়। গরু আমাদের আরও অনেক কিছু দেয়। হাম্বা দেয়, হাড় দেয়, লেজ দেয়, গোবর দেয়, চামড়া দেয়। গোমূত্র জমিকে উর্বর করে। কোনো কোনো দেশে তা পবিত্রতার প্রতীক। ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। যদিও গোমূত্র বা গোচোনার রয়েছে বিস্ময়কর ‘বিধ্বংসী’ ক্ষমতা। কথায় আছে, ‘সোয়া মণ দুধ নষ্ট করে এক ফোঁটা গোচোনা।’ অর্থাৎ সামান্য অপবিত্রতাও বিশাল ভালো জিনিসকে নষ্ট করে দিতে পারে। আমাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির সঙ্গে গরুর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ছোটবেলায় গরু নিয়ে রচনা লেখেনি, এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। ‘গরু একটি গৃহপালিত উপকারী প্রাণী’—এই বাক্য দিয়ে বাঙালির অর্ধেক শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছে। আবার বাবা-মা, শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা প্রেয়সীর কাছে ‘গরু’ সম্বোধন শোনেনি, এমন মানুষও কম। মানুষের জীবনে এমন কোনো ক্ষেত্র পাওয়া দুষ্কর, যেখানে গরুর ভূমিকা নেই। তাই গরু হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গৃহপালিত প্রাণীগুলোর একটি। কোনো কোনো সম্প্রদায় গরুকে ‘মাতা’ বলেও সম্মান করে। গরু হারালে মানুষের নাকি কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়। কথিত আছে, গ্রামের এক লোকের গরু হারিয়ে গেলে তিনি বাড়ি ফিরে পুত্রকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে পানি আনতে বলেছিলেন। স্ত্রী অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘ছেলেকে কেউ ভাই বলে?’ লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিয়েছিল, ‘গরু হারালে এমনই হয়, মা।’ গরু নিয়ে বিভিন্ন মর্মস্পর্শী সাহিত্য রচনা হয়েছে। তবে একজন ফেসবুক কবির কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:‘মানুষের পোষা গোরু পাগুলো সরু সরু।বাছুরেরা ঘরে ঘেরাদুধ খায় মানুষেরা!’ বাছুরকে বঞ্চিত করে গরুর দুধ খেয়ে যুগে যুগে মানুষ পুষ্ট হয়েছে। অথচ গরু প্রতিবাদ করেনি। সম্ভবত এই কারণেই পৃথিবীভর্তি নিরীহ মানুষকে আজও ‘গোবেচারা’ বলা হয়। এই উপকারী প্রাণীটির বানান নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। ‘গরু’ না ‘গোরু’—এ নিয়ে ভাষাবিদদের মতভেদ বহু পুরোনো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনো ‘গোরু’, পরে ‘গরু’ লিখেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘গোরু’। আবার বাংলা একাডেমি-র অভিধানে দুই ধরনের ব্যবহারই পাওয়া যায়। তবে পণ্ডিতদের মধ্যে বানান নিয়ে যত দলাদলি থাকুক, গরুর এ নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদের তো জন্ম হয়েছে জবাই ও কোরবানি হওয়ার জন্য। সমাজে ও পরিবারে উপকারী ব্যক্তিদেরও অনেক সময় একই পরিণতি হয়। তারা উপকার করেন, আর শেষে নীরবে বিসর্জিত হন। হয়তো এ কারণেই হাটে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ গরুটির দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষের চেয়ে গরুর জীবনই অনেক সহজ। গরুর কোনো নির্বাচন নেই, টকশো নেই, ফেসবুক লাইভ নেই, মতাদর্শ নেই। শুধু খায়, ঘাস চিবোয় আর মাঝে মাঝে হাম্বা ডাকে। অথচ মানুষ তাকে নিয়েই এমন মাতামাতি করে, যেন আগামী বাজেটও ওই গরুই ঘোষণা করবে! ‘ট্রাম্প সাহেব’ অবশ্য এসব কিছুর ধার ধারেন না। তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে শুধু জাবর কাটেন। দেখে মনে হয়, পৃথিবীর সব হম্বিতম্বির শেষ পরিণতি আসলে হাম্বাতেই গিয়ে ঠেকে! এইচআর/এমএস

Go to News Site