Collector
পাঠ্যবইয়ের ‘ভূতুড়ে’ চাহিদা ঠেকিয়ে শতকোটি টাকা সাশ্রয় | Collector
পাঠ্যবইয়ের ‘ভূতুড়ে’ চাহিদা ঠেকিয়ে শতকোটি টাকা সাশ্রয়
Jagonews24

পাঠ্যবইয়ের ‘ভূতুড়ে’ চাহিদা ঠেকিয়ে শতকোটি টাকা সাশ্রয়

দেশের সব উপজেলা থেকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের চাহিদা নিয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তাতে মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির শিক্ষার্থীদের জন্য বইয়ের প্রয়োজন ছিল ২৩ কোটি ৯ লাখের কিছু বেশি। রীতি মেনে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পাঠানো চাহিদা যাচাইয়ে কয়েকটি উপজেলায় পরিদর্শনে যায় এনসিটিবির কর্মকর্তারা। তাতেই ধরা পড়ে পাঠ্যবইয়ের ভূতুড়ে চাহিদা। সামনে আসে বইয়ের চাহিদা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে কীভাবে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে ছাপাখানা মালিক, শিক্ষা কর্মকর্তা, এনসিটিবি ও শিক্ষকদের চক্র। তবে বইয়ের বাড়তি চাহিদা দেখিয়ে সরকারি টাকা লুটপাটের ছক কষার বিষয়টি জেনে সারাদেশে এনসিটিবি কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে পাঠানোর নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও করেন ভার্চুয়ালি বৈঠক। এরপর আবারও চাহিদা পাঠাতে বলা হয়। তাতেই যেন বাজিমাত! এক ধাক্কায় পাঠ্যবইয়ের চাহিদা কমে যায় প্রায় এক কোটি। এতে আগামী বছরের পাঠ্যবই ছাপাতে খরচ কমেছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সূত্র বলছে, জনবল সংকটে সব উপজেলায় সঠিকভাবে ইন্সপেকশনের (পরিদর্শন) কাজ করা সম্ভব হয়নি। চাহিদা আরও ভালোভাবে যাচাই করা সম্ভব হলে পাঠ্যবেই আরও কমতো। তাতে সরকারের খরচ আরও সাশ্রয় হতো। ভুয়া চাহিদার ৯৯ লাখ বই, ধরা পড়লো যেভাবে পাঠ্যবই ছাপাতে দরপত্র আহ্বান করে এনসিটিবি। তার আগে সারাদেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বইয়ের চাহিদা নিরূপণ করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের চাহিদার তথ্য সংগ্রহের কাজ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তর থেকে যে চাহিদা দেওয়া হয় তা ছাপিয়ে সরবরাহ করে এনসিটিবি। অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসার ইবতেদায়ি স্তরের পাঠ্যবইয়ের চাহিদা সংগ্রহ, ছাপা ও বিতরণসহ সব দায়িত্ব থাকে এনসিটিবির হাতে। এজন্য তারা প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলে মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির চাহিদা সংগ্রহ করে। এবারও দেশের সব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে স্ব স্ব উপজেলার পাঠ্যবইয়ের চাহিদা চাওয়া হয়। আরও পড়ুনপাঠ্যবইয়ের ভূতুড়ে চাহিদায় ৩০০ কোটি টাকা লুটপাটের ছকশিক্ষামন্ত্রীর এপিএস পদ হারানোর পর ওমর ফারুকের নতুন পদায়নও বাতিলসময়মতো পাঠ্যবই দিতে আবারও ব্যর্থতা, সেই একই ‘অজুহাত’ এপ্রিলের শুরুতে এনসিটিবিতে সব উপজেলা থেকে বইয়ের চাহিদা পাঠানো হয়। তাতে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তর ও ইবতেদায়ির জন্য ২৩ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১১ কপি পাঠ্যবই দরকার। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠানো এ বইয়ের সংখ্যা আগের শিক্ষাবর্ষের (২০২৬) চেয়ে প্রায় এক কোটি বেশি। ফলে এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। বিষয়টি নিয়ে জাগো নিউজে সংবাদও প্রকাশ হয়। এরপর শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় উপজেলাগুলোতে বইয়ের চাহিদা সঠিক দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে পরিদর্শনে পাঠানো হয়। এতে বিভিন্ন উপজেলায় ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। পাঠ্যবইয়ের চাহিদা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। যাচাইয়ের মুখে চলতি মে মাসে পুনরায় চাহিদা পাঠিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। তাতে দেখা যায়, আগের চেয়ে এবার ৯৯ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৮ কপি পাঠ্যবই কমেছে। অর্থাৎ, আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক, কারিগরি ও ইবতেদায়ির জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪১ হাজার ৪৯৩ কপি বই লাগবে। এতে ১০০ কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি বই ছাপার সময়ও কমে আসবে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের চেয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ১৭৯ শতাংশ বেশি পাঠ্যবই চাওয়া হয়। এছাড়া ফেনী সদর উপজেলায় ৪১ শতাংশ বেশি পাঠ্যবই পাঠানোর আবদার করা হয়। একইভাবে নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভূতুড়ে চাহিদার তথ্য আসতে থাকে। পরে সব উপজেলা থেকে পুনরায় চাহিদা পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। যাচাইয়ের মুখে চলতি মে মাসে পুনরায় চাহিদা পাঠিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। তাতে দেখা যায়, আগের চেয়ে এবার ৯৯ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৮ কপি পাঠ্যবই কমেছে। অর্থাৎ, আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মাধ্যমিক, কারিগরি ও ইবতেদায়ির জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪১ হাজার ৪৯৩ কপি বই লাগবে। এতে ১০০ কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি বই ছাপার সময়ও কমে আসবে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের ‍টুকু জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেক উপজেলা থেকে ভুয়া চাহিদা পাঠানো হয়েছিল। আমরা এ নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। তদন্তে নামার পর ভুয়া চাহিদায় লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে। এতে প্রায় ৯৯ লাখ বই কমেছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে সরকারের খরচও কমবে।’ ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রাথমিকের সিন্ডিকেট! প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবইয়ের চাহিদা সংগ্রহেও গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এ চাহিদা সংগ্রহ করায় চক্রটি ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতে মাধ্যমিকের বইয়ের ভূতুড়ে চাহিদা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও প্রাথমিকের ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকে ভূতুড়ে চাহিদা শনাক্তে কোনো ইন্সপেকশন হয়নি। কারণ প্রাথমিকের বইয়ের সংখ্যা কত হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। সেখানেও বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের দেওয়া ভূতুড়ে চাহিদায় প্রাথমিকেও অন্তত ২০-২২ লাখ বই বেশি ছাপানোর চাহিদা এসেছে। এতে সরকারের ১৮-২০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে।- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির একজন সদস্য অধিদপ্তরের দেওয়া চাহিদা অনুযায়ী এনসিটিবি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি পাঠ্যবই ছাপাবে। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ছাপা হবে ৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি। মোট ১৪০ লটে এসব বই ছাপানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। এর মধ্যে ১১০ লট প্রাথমিকের ও ৩০ লট হবে প্রাক-প্রাথমিকের বই। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাথমিকে ভূতুড়ে চাহিদা শনাক্তে কোনো ইন্সপেকশন হয়নি। কারণ প্রাথমিকের বইয়ের সংখ্যা কত হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। সেখানেও বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের দেওয়া ভূতুড়ে চাহিদায় প্রাথমিকেও অন্তত ২০-২২ লাখ বই বেশি ছাপানোর চাহিদা এসেছে। এতে সরকারের ১৮-২০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে।’ আরও পড়ুনপাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজ আর নয়, বাধ্যতামূলক হচ্ছে জলছাপতদন্ত করতে ১১৭ ছাপাখানা মালিককে তলব, প্রক্রিয়া নিয়ে ‘প্রশ্ন’বই ছাপার জামানতের অর্থছাড়েও এনসিটিবিতে ‘বকশিশ বাণিজ্য’ জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শাহীনা ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমি অধিদপ্তরের দায়িত্বে এসেছি। কাজগুলো কীভাবে হয়, তা আমি এখনো জানি না। যখন চাহিদা দেওয়া হয়েছে, তখন আমি দায়িত্বেও ছিলাম না। আগামীতে যখন এ চাহিদা দেওয়ার কাজ করা হবে, তখন বিষয়টি কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হবে।’  সক্রিয় হচ্ছে মুদ্রণ শিল্প সমিতি-এনসিটিবির সিন্ডিকেট বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ। কিন্তু উচ্চ আদালতে করা কৌশলী রিটকে ব্যবহার করে সমিতির নেতৃত্বে বহাল আওয়ামী লীগপন্থিরা। অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা ও তাদের অনুসারীদের দখলে থাকা মুদ্রণ সমিতির নেতাদের টার্গেট এখন পাঠ্যবইয়ের দরপত্র না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কমিটি টিকিয়ে রাখা, যেন মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতৃত্বকে ব্যবহার করে বই ছাপার কাজ ভাগাভাগি করা যায়। অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডেও আগের কর্মকর্তাদের ফেরানো হচ্ছে। ওএসডি হওয়া সাবেক সচিবকে ফের সচিব পদে বসানো, কয়েকটি সদস্য পদে পছন্দের লোককে পদায়ন করানো; এমনকি সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সহকারী সচিব (এপিএস) নিয়োগেও ছাপাখানা মালিকচক্রের যোগসাজশ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এনসিটিবির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র। আমরা ভালো কাগজে; ভালোমানের ছাপানো বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে চাই। বছরের প্রথমদিন যেন শিক্ষার্থীরা বই পায়, সে লক্ষ্যে কাজ করছি। বই ছাপা ও বিতরণে কোনো অনিয়ম হলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না: যেই হোক তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।- অধ্যাপক আবু নাসের টুকু, সদস্য (পাঠ্যপুস্তক), এনসিটিবি জানতে চাইলে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ বাগিয়ে নিতে মুদ্রণ শিল্প সমিতিতে সিন্ডিকেট করা হয়েছে। এখানে যে নির্বাচন হয়, তা লোক দেখানো। নির্বাচন ঘিরে টাকা ওড়ানো হয়। সদস্যদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ভোট টানা হয়। এগুলো সবই বিগত সরকারের সময় হয়েছে। এখন বর্তমান সরকারও যদি সিন্ডিকেটের কাছে হার মানে, তাহলে সেটাই হবে বড় ব্যর্থতা।’ পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদ্য সাবেক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে যারা নিম্নমানের পাঠ্যবই দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, তারা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছুটা বেকায়দায় ছিলেন। এখন রাজনৈতিক সরকার আসায় ফের সক্রিয় হয়েছেন। তাদের অর্থ ও ক্ষমতার দাপট এতটাই বেশি যে, শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস, এনসিটিবির সদস্য বসাতেও বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির ডিও লেটার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর শিক্ষার্থীদের হাতে চরম নিম্নমানের পাঠ্যবই যেতে পারে।’ জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ভালো কাগজে; ভালোমানের ছাপানো বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে চাই। বছরের প্রথমদিন যেন শিক্ষার্থীরা বই পায়, সে লক্ষ্যে কাজ করছি। বই ছাপা ও বিতরণে কোনো অনিয়ম হলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না: যেই হোক তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ এএএইচ/ইএ

Go to News Site