Collector
আর কত আছিয়া, রামিসা গেলে বিচার পাবো? | Collector
আর কত আছিয়া, রামিসা গেলে বিচার পাবো?
Jagonews24

আর কত আছিয়া, রামিসা গেলে বিচার পাবো?

অভিলাষ মাহমুদ নৃশংসতার শিকার আছিয়া বা রামিসার মতো নামগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধের ঘটনা নয়। এগুলো আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার গভীরে গেড়ে বসা এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির লক্ষণ। অমানুষের মারফতে হওয়া এই নির্মমতাকে যখন আমরা সমাজতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তখন দেখা যায়-অপরাধের ধরন, স্থান বা পাত্র বদলালেও এর পেছনের মনস্তত্ত্ব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি একই রয়ে গেছে। নিচে এই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও গবেষণামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো- একটি স্বাধীন ও সভ্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার প্রতিটি নাগরিকের বিশেষ করে নারী ও শিশুর জানমালের নিরাপত্তা। কিন্তু সমসাময়িক পরিসংখ্যান ও সমাজতাত্ত্বিক চিত্র ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে প্রায়শই আছিয়া, রামিসা, ইরা, ইয়াসমিন, তনু কিংবা নুসরাতের মতো অসংখ্য নাম আমাদের সামষ্টিক বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। এই অপরাধগুলো কেবল শারীরিক সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ক্ষমতা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং আইনি দুর্বলতার এক জটিল সমীকরণ। এই গবেষণাপত্রে আমরা দেখার চেষ্টা করব কখন, কোথায় এবং কী ধরনের অমানুষিক নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছে আমাদের নারী ও শিশুদের এবং এর পেছনের মূল মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো কী। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্থানিক বিন্যাস: কখন এবং কোথায়? বাংলাদেশের অপরাধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি যেমন প্রান্তিক গ্রামীণ জনপদে ঘটে, তেমনি শহুরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের চার দেয়ালেও সমানভাবে উপস্থিত। আসুন কয়েকটি ঘটনার স্থান কাল পাত্র বিশ্লেষণ করা যাক- ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ড-আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে সহিংসতা ২৪ আগস্ট ১৯৯৫; দশমাইল, দিনাজপুর ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে তরুণী ইয়াসমিনকে একদল পুলিশ সদস্য ধর্ষণ ও হত্যা করে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী যেখানে সুরক্ষক, সেখানেও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অমানুষিক বর্বরতা ঘটতে পারে। এই ঘটনা তৎকালীন সময়ে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। নুসরাত জাহান রাফি-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে সহিংসতা এপ্রিল ২০১৯; সোনাগাজী, ফেনী মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করায় নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারা হয়। সেসময় ঘটনাটি দেশব্যাপী আন্দোলন এবং আলোচনার কেন্দ্র ছিল। শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র ও নিরাপদ স্থানে যখন এই ধরনের অপরাধ ঘটে, তখন তা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপকে উন্মোচিত করে। তনু ও খাদিজা-সুরক্ষিত সেনানিবাস ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬ সাল; কুমিল্লা সেনানিবাস এবং সিলেট ২০১৬ সালে সোহাগী জাহান তনুকে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর হত্যা করা হয়, যার বিচার আজও মেলেনি। একই বছর সিলেটে প্রকাশ্য দিবালোকে কলেজছাত্রী খাদিজাকে কোপানো হয় রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভে। এই স্থানিক বৈচিত্র‍্য প্রমাণ করে যে, ঘরের বাইরে কোনো স্থানই নারীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। ইরা-প্রতিবেশী পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি মার্চ, ২০২৬; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ২০২৬ সালের মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ৭ বছরের শিশু ইরা মনিকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর গুরুতর আঘাত করা হয় এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত বাবু শেখ ওরফে মাহবুব আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। গৃহকর্মী ও শিশুদের ওপর পারিবারিক নির্যাতন (সাম্প্রতিক প্রবণতা) ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় মেগাসিটির বহু তলা ভবন প্রতিনিয়ত ১০ থেকে ১৫ বছরের গৃহকর্মী শিশুরা গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর মাধ্যমে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গরম ইস্তিরির ছ্যাঁকা, হাত-পা ভেঙে দেওয়া বা ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো খবরের শিরোনাম হচ্ছে। শহুরে শিক্ষিত শ্রেণীর ভেতরের এক বিকৃত মনস্তত্ত্ব এই অপরাধগুলোর পেছনে দায়ী। অপরাধের সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ মানুষ কখন অমানুষ হয়ে ওঠে বা এই ধরনের পাশবিক বলি দেওয়ার পেছনে কী ধরনের প্রভাবক কাজ করে, তা সমাজবিজ্ঞানীরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন- ১. ক্ষমতার অসমতা অধিকাংশ অপরাধের মূলে রয়েছে ক্ষমতা। অপরাধী যখন দেখে ভিকটিম তার চেয়ে বয়সে ছোট, লিঙ্গ পরিচয়ে নারী কিংবা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল (যেমন গৃহকর্মী বা প্রান্তিক পরিবারের সন্তান), তখন তার ভেতর এক ধরনের আধিপত্য বিস্তারের বিকৃত আনন্দ কাজ করে। ২. পর্নোগ্রাফি ও ডিজিটাল অবক্ষয় প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে সমাজজুড়ে এক ধরনের সংবেদনহীনতা তৈরি হয়েছে। সহিংস ভিডিও বা বিকৃত কনটেন্ট মানুষের স্বাভাবিক সহানুভূতিশীল মনস্তত্ত্বকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, যার ফলে অপরাধ করার সময় অপরাধীর মনে কোনো অনুশোচনা কাজ করে না। ৩. সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার অভাব সহনশীলতা, নারীর প্রতি সম্মান এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পরিবার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিকভাবে না পাওয়ায় যুবসমাজের একটি অংশ চরম মাত্রায় উগ্র ও সহিংস হয়ে উঠছে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেন এই বলি হওয়ার মিছিল থামছে না? এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে গড়ে ৫ থেকে ১০ বছর লেগে যায়। দীর্ঘ সময়ে ভিকটিমের পরিবার ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সাক্ষীরা হারিয়ে যায়। সাক্ষী সুরক্ষার অভাব পরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলার সাক্ষীদের প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়। ফলে ভিকটিম এক সময় আপোষ করতে বাধ্য হয়। নিম্ন দণ্ড হার বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (যেমন-আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্র‍্যাক) গবেষণা অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলার মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়। বাকি ৯৫ শতাংশেরও বেশি খালাস পেয়ে যায়। এই ৯৫ শতাংশ খালাস পাওয়ার পরিসংখ্যানই নতুন একজন অপরাধীকে অভয় দেয় আরেকটি আছিয়া বা রামিসা তৈরি করার। অপরাধী খুব ভালো করেই জানে, টাকা ও ক্ষমতার জোরে আইনকে লুপহোলের মাধ্যমে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক তুলনামূলক চিত্র এটি কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, দক্ষিণ এশিয়াসহ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এর মিল পাওয়া যায়। ভারতের ২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ড কিংবা পাকিস্তানের যয়নব হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তবে সেসব দেশে তীব্র গণআন্দোলন এবং আইনি সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আছে, কিন্তু তার কার্যকারিতা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ধীরগতির। এই ধারা বন্ধের প্রস্তাবনা ও সমাধান এই সমাজতাত্ত্বিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি বহু মাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন করার বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল ট্র‍্যাকিং: প্রতিটি মামলার অগ্রগতি মনিটর করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ থাকতে হবে, যাতে করে থানা বা আদালতে মামলা ধামাচাপা না পড়ে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন: সাক্ষীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা নির্ভয়ে আদালতে সত্যি সাক্ষ্য দিতে পারেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গণমাধ্যমের ভূমিকা: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে কেবল ঘটনার খবর প্রকাশ নয়, বরং মামলার ফলোআপ বা বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত চাপ বজায় রাখতে হবে। শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই জেন্ডার সংবেদনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিকতার পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, আছিয়া কিংবা রামিসাদের এই আত্মত্যাগ কেবল কয়েকটি লাশের সংখ্যা নয়; এগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতার এক একটি জীবন্ত দলিল। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় ডিঙিয়ে তার দ্রুততম ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছি, ততক্ষণ এই মিছিল থামবে না। অমানুষদের এই বর্বরতা রুখতে প্রয়োজন আইনের কঠোরতম প্রয়োগ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে মনস্তাত্ত্বিক জাগরণ। কলম, আদালত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে। তথ্যসূত্র ও সহায়িকা১. আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন।২. বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কর্তৃক সংকলিত নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান।৩. জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ক প্রতিবেদন।  লেখক: কবি, সাংবাদিক ও গাল্পিক আরও পড়ুনসেতু থাকতেও নৌকায় নদী পাড় হয় এখানকার মানুষকাঁচি-ট্রিমারে বদলায় মানুষের রূপ, বদলায় না নরসুন্দরের ভাগ্য কেএসকে

Go to News Site