Jagonews24
নিয়মিত হাসপাতালে আসেন না চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সেবাবঞ্চিত লক্ষাধিক নারী-শিশু অনিয়মিত অফিস করার সত্যতা পেলে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা: উপপরিচালক প্রধান ফটক আংশিক খোলা। কিছুক্ষণ পর পর দু-একজন করে নারী-শিশু ও পুরুষ প্রবেশ করছেন এবং বের হচ্ছেন। এদের কেউ আসছেন চিকিৎসকের খোঁজে আবার কেউ আসছেন জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পরামর্শ নিতে। কিন্তু হাসপাতাল ভবনে ঢুকে চিকিৎসকের কক্ষ খালি পড়ে থাকতে দেখে হতাশ হয়ে ফিরতে দেখা গেছে আগতদের। অনেককে চিকিৎসক না পেয়ে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ওষুধ লিখে নিতে দেখা গেছে। সম্প্রতি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ছোটতুলাগাঁও ছিদ্দিকুন নেছা ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অবস্থান করে এ চিত্র দেখা যায়। ‘এলাকার মা ও শিশুদের জন্য সরকার হাসপাতালে করেছে। কিন্তু এখানে ডাক্তার থাকে না, ওষুধ থাকে না। অনেক সময় হাসপাতালের গেটও বন্ধ থাকে। আমরা চাই নিয়মিত ডাক্তার আসুক, মা ও শিশুরা সেবা পাক’ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (সংযুক্তিতে) নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) এবং একজন আয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। মা ও শিশুদের কল্যাণের জন্য সরকার হাসপাতালটি স্থাপন করলেও রোগীদের চেয়ে কর্মরতরা ‘নিজেদের কল্যাণের’ কথাই বেশি ভাবেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কাগজে-কলমে সেবাদানকারী এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকসহ ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও তারা যথাসময়ে কর্মস্থলে আসেন না। এলেও নিজেদের খেয়াল খুশিমতো নির্দিষ্ট সময়ের আগে আবার চলে যান। সরেজমিন গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সম্প্রতি সকাল সাড়ে ১০টায় মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা হীরা ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রাসেল আহমেদ ছাড়া মেডিকেল অফিসার ডা. মোছা. সোনিয়া হুদাসহ বাকি চারজনই অনুপস্থিত। দুপুর ২টা পর্যন্ত এদের কেউ হাসপাতাল আঙ্গিনায় প্রবেশ করেননি। ‘শারীরিক সমস্যা নিয়ে এই মাসে হাসপাতালে এসেছি অন্তত তিনদিন। এসে দেখি ডাক্তার আপা নেই। বরুড়া গিয়ে ডাক্তার দেখানোর মতো আমার কাছে টাকাও নেই’ সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতরে সুনসান নীরবতা। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার কক্ষ ছাড়া অন্যদের কক্ষগুলো দরজা খোলা হয়নি। আলো স্বল্প একটি কক্ষে চুপচাপ বসে আসেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রাসেল আহমেদ। দ্বিতীয় তলায় দিয়ে দেখা গেছে, ডেলিভারি কক্ষটি বন্ধ রয়েছে। সন্তান ডেলিভারি সরঞ্জাম ওয়ার্ডে নিয়ে রোগী রাখার শয্যার পাশেই রাখা হয়েছে। সেই ওয়ার্ডেই করানো হয় সন্তান ডেলিভারি। এলোমেলোভাবে রাখা হয়েছে জিনিসপত্র। হাসপাতাল লাগোয়া মেডিকেল অফিসার ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাসহ অন্যদের জন্য রয়েছে তিন তলাবিশিষ্ট একটি ডরমিটরি। বিশাল এই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিদর্শিকা হীরা ছাড়া আর কেউ থাকেন না। মেডিকেল অফিসার ডা. সোনিয়া হুদা থাকেন বরুড়া উপজেলা সদরে বাসা ভাড়া করে। উপজেলা সদর থেকে এই হাসপাতালের দূরুত্ব বেশি হওয়ায় তিনিও নিয়মিত আসেন না বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ফেরার পর একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে মেডিকেল অফিসার ডা. সোনিয়া হুদা সংবাদ প্রকাশ না করতে এই প্রতিবেদককে অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রস্তাব দেন। তাছাড়া তিনি নিজেও সংবাদটি প্রকাশ না করতে একাধিকবার ফোন করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সঠিকভাবে চললে ছোটতুলাগাঁও, বাঘমারা, খারুল, বেজিমারা ও পশ্চিম আড্ডাসহ আড্ডা ইউনিয়নের অন্তত ১৯ গ্রামসহ আশপাশের ইউনিয়নের লক্ষাধিক নারী-শিশু ও কিশোরীরা সেবা পাবেন। অথচ এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। বাধ্য হয়ে এ অঞ্চলের মা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদর বা জেলা সদর কুমিল্লায় ছুটে যেতে হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে ওষুধ সংকট। ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কেউ দাপ্তরিক কাজের বাইরে থাকার সুযোগ নেই। মেডিকেল অফিসারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অনিয়মিত অফিস করার সত্যতা পেলে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে’—উপপরিচালক ষাটোর্ধ্ব আবুল হাসেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এলাকার মা ও শিশুদের জন্য সরকার হাসপাতালে করেছে। কিন্তু এখানে ডাক্তার থাকে না, ওষুধ থাকে না। অনেক সময় হাসপাতালের গেটও বন্ধ থাকে। আমরা চাই নিয়মিত ডাক্তার আসুক, মা ও শিশুরা সেবা পাক।’ ছোটতুলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘শারীরিক সমস্যা নিয়ে এই মাসে হাসপাতালে এসেছি অন্তত তিনদিন। এসে দেখি ডাক্তার আপা নেই। বরুড়া গিয়ে ডাক্তার দেখানোর মতো আমার কাছে টাকাও নেই।’ আরও পড়ুন:চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুললেই হামলার শিকার স্বজনরাহাসপাতালের তৃতীয় তলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে গাভি, ছবি ভাইরালহাসপাতালের খাবার মুখে নিয়েই ফেলে দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীখুমেক হাসপাতালে আগুন: স্থানান্তরের সময় আইসিইউ রোগীর মৃত্যুবিরল রোগে আক্রান্ত শিশুকন্যা হাবিবার নাম এখন ‘জুবাইদা’সিভিল সার্জন পদ শূন্য, ময়মনসিংহে বদলি-তদন্তের হিড়িক পার্শ্ববর্তী বাগমারা গ্রামের আয়েশা বলেন, ‘ছোট ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছি। তিনি না থাকায় বাড়ি চলে যাচ্ছি। দুই একদিন পরে আবার আসবো।’ তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে আইসে হাসপাতালে ডাক্তার পাই, আবার মাঝেমধ্যি পাই না। অর্থের জোর কম থাকায় বারবার আসি। কারণ, এই জায়গায় বিনা টাকায় ডাক্তার দেখানো যায়।’ কথা হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিদর্শিকা হীরার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এখানে সংযুক্তিতে আছি। এর আগে অন্য হাসপাতালে ছিলাম। কখনো ডিউটি ফাঁকি দিই না। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা হাসপাতাল-কোয়ার্টার মিলিয়ে থাকি। মাঝে মধ্যে রাত ৩টায়ও রোগী আসে। নিজের কষ্ট হলেও সেবা দেই।’ তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে দুই-একজন সহকারী থাকলে কষ্ট কমে যেতো। তাছাড়া আমাদের এখানে ওষুধ সংকট রয়েছে। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সেবা দিয়ে যাচ্ছি। বাকিদের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।’ আড্ডা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাফর উল্ল্যাহ চৌধুরী বলেন, ‘মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করাই হয়েছে গ্রামীণ গর্ভবতী মা, নবজাতক এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের সমন্বিত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য। দুঃখজনক বিষয় হলো, সেই সেবাকেন্দ্রে যদি ডাক্তারই না থাকে, তাহলে সেবাপ্রত্যাশীরা কার কাছ থেকে সেবা নেবেন?’ অনিয়মিত ও যথাসময়ে হাসপাতালে না আসার কারণ জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. সোনিয়া হুদা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ সত্য না। হাসপাতালে রোগীরা আসে ১০টার পর। যে কারণে আমিও দেরি করে যাই। তাছাড়া সব রোগী আমি দেখি না। আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ রোগী দেখি। রোগী দেখার জন্য পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা রয়েছে।’ একজন মেডিকেল অফিসারের কাজ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাইরে থাকি তখন পরিদর্শিকা আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে ওষুধের নাম বলে দিই।’ এ বিষয়ে কুমিল্লা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক স্বপন কুমার শর্মা বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কেউ দাপ্তরিক কাজের বাইরে থাকার সুযোগ নেই। মেডিকেল অফিসারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অনিয়মিত অফিস করার সত্যতা পেলে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এসআর/জেআইএম
Go to News Site