Collector
কিছুই খাচ্ছে না রামিসার বিড়াল, মরার মতো পড়ে থাকে ঘরের মেঝেতে | Collector
কিছুই খাচ্ছে না রামিসার বিড়াল, মরার মতো পড়ে থাকে ঘরের মেঝেতে
Somoy TV

কিছুই খাচ্ছে না রামিসার বিড়াল, মরার মতো পড়ে থাকে ঘরের মেঝেতে

শিশু রামিসার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংসতায় স্তব্ধ গোটা দেশ। পৈশাচিক এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকা পল্লবীর ৭ নম্বর রোডের বাসায় গণমাধ্যমকর্মীদের আনাগোনা লেগে আছে। সামনের রাস্তায় এখানে ওখানে জটলা। যাওয়া-আসার সময় পথচারীরাও একটু দাঁড়াচ্ছেন। বাসার মূল ফটকের কলাপসিবল গেট অল্প করে খোলা, একজন মানুষ ঢোকা যায়। বাইরের ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই অদ্ভুত স্তব্ধতা! রামিসার শোক যেন ছুঁয়ে গেছে সবকিছুকে। তার আদরের বিড়ালটাও গত দুদিন ধরে কিছুই খায় না!বুধবার মুন্সিগঞ্জে রামিসার দাফন হয়েছে। মেয়েকে চিরবিদায় দেয়ার পর পরিবার পল্লবীর বাসায় ফিরেছে ঠিকই কিন্তু ঘরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রামিসার স্মৃতিগুলো শোক বাড়িয়ে দিচ্ছে।রামিসার ফুপু হাসনাহেনা নিঃসন্তান। মেয়ের মতই আদর স্নেহ করতেন রামিসাকে। রান্না ঘরে শুয়ে থাকা বিড়ালটাকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘রামিসার বিড়ালটাও ওর শোকে গতকাল থেকে কিছুই খাচ্ছে না।’ফুফিয়ে কেঁদে উঠলেন ফুপু। বললেন, ‌‌‘বিড়ালাটাও ওর ভালোবাসা অনুভব করতেছে।’পাশে দাঁড়িয়ে কথা বললেও বিড়ালটা একবার ফিরেও তাকাল না। মেঝেতে মরার মত পড়ে আছে। টেনে ধরেও খাওয়ানো যাচ্ছে না। কথা বলতে বলতে একটা বাটিতে কিছু খাবার নিয়ে বিড়ালটার সামনে ধরলেন রামিসার ফুপু। কিন্তু এবারও খেল না। রান্না ঘরের মেঝে এভাবে সারাক্ষণ শুয়ে থাকে রামিসার বিড়ালটা। ছবি: সময় সংবাদবিড়ালটিকে ছেড়ে দিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন হাসনাহেনা। এই অবুঝ বিড়ালটিও বুঝেছিল, রামিসা ওকে কত ভালবাসতো। এই রকম ফুলের মত মেয়ের সাথে এমন নিষ্ঠুরভাবে নরপিশাচের মত আচরণ করতে পারে, তাকে ফাঁসি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। কিন্তু তা কি আদৌ হবে? পাখিগুলোর সঙ্গে দারুণ সখ্য ছিলো রামিসার। ছবি: সময় সংবাদদাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত রামিসাবুধবার রাত ৮টার দিকে রামিসার মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়। মরদেহ পৌঁছালে পুরো গ্রামে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। স্বজন ও এলাকাবাসী কান্নায় ভেঙে পড়ে। এতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।এরপর রাত ৯টার দিকে জানাজা শেষে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।‘একটা চিৎকার শুনেছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা রামিসার ছিল’মঙ্গলবার রামিসার মায়ের সকালটা শুরু হয়েছিল আর দশদিনের মতোই। আট বছরের মেয়েকে প্রতিদিনের মতো স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মা। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না মেয়েকে! সময় গড়ায় আর উদ্বেগ বাড়ে। ঘরের ভেতর, বারান্দা, সিঁড়ি— সব জায়গায় খোঁজা শুরু হয়। পরে ভবনের অন্য বাসিন্দারাও যোগ দেন সেই খোঁজে।তাকে খোঁজাখুঁজির সময় চিৎকারের একটি শব্দও শুনেছিলেন। কিন্তু বুঝতে পারেননি সেই চিৎকার ছোট্ট রামিসার ছিল। বৃহস্পতিবার (২১ মে) বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে মা পারভীন বলেন, ‘আমি রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওকে বলছিলাম, দাঁত ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে স্কুল ড্রেস পরতে। এরপর ও পাশের রুমে যায় দাঁত ব্রাশ করতে। রামিসার বড় বোন তখন চাচার বাসায় যাচ্ছিল। রামিসাও তার পেছনে যেতে চাইলে বড় বোন তাকে বাসায় থাকতে বলে। তখন রামিসা দরজার ভেতরেই ছিল। পরে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ওকে টান দিয়ে (পাশের ফ্লাটে) নিয়ে যায়।’ রামিসার পুতুল। ছবি: সময় সংবাদপারভীন আরও বলেন, ‘ঘটনার পর সেখানে (উল্টো পাশের দরজা) একটা জুতা ছিল, আরেকটা ছিল না। এরপর দেখি ওর বড় বোন চাচার বাসা থেকে একাই আসছে। তখন আমার সন্দেহ হলো, আমি একটা চিৎকারও শুনেছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি, ওই চিৎকার রামিসার ছিল। ভাবছিলাম পাশের ফ্ল্যাটের অন্য কোনো বাচ্চার চিৎকার।’ মা পারভীনের সন্দেহ হওয়ায় বাবার দরজায় বারবার ধাক্কা দিলেও কেউ খোলেনি। পরে ৯৯৯ এ কল করলে পুলিশ আসে এবং দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে একটি রুমে খাটের নিচে রামিসার নিথর দেহ মেলে। আর কাটা মাথা পাওয়া যায় বাথরুমে।সোহেলের জবানবন্দিতে ভয়ঙ্কর নৃশংসতার বর্ণনাবুধবার (২০ মে) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামি সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগেই এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে।কী ঘটেছিল রামিসার সঙ্গে আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে সোহেল জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় ছোট্ট রামিসা। শিশুটির মা সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলাকেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। এছাড়া ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। একপর্যায়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিল বলেও জবানবন্দিতে জানায় সে। ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব কোনো শত্রুতাও ছিল না বলে জানায়।কী ঘটেছিল রামিসার সঙ্গে আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে সোহেল জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় ছোট্ট রামিসা। শিশুটির মা সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলাকেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। এছাড়া ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। একপর্যায়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিল বলেও জবানবন্দিতে জানায় সে। ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব কোনো শত্রুতাও ছিল না বলে জানায়।আপনাদের বিচার করার রেকর্ড নাই: বাবারামিসার বাবা হান্নান মোল্লা রাজধানীতে একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীতে বসবাস করে আসছে।মেয়েকে হারিয়ে শোকের সাগরে ভাসছেন বাবা। দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি কিছুই চাই না। কারণ বিচার আপনারা করতে পারবেন না। আপনাদের এই ধরনের কোনো রেকর্ড নাই। আপনারা পারবেন না।’হান্নান মোল্লা বলেন, ‘আমার মেয়েও ফিরে আসবে না। আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। আপনারা কোনো উদাহরণ তৈরি করাতে পারবেন? পারবেন না। আমার থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত নেবেন? পারবেন না, আপনারা পারবেন না। এটা বড়জোর ১৫ দিন... তারপর আরেকটা বড় কোনো ঘটনা আসবে। এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। শেষ এটা। আমি তো দেখতেছি... আমার বয়স ৫৫। কোনো এক্সাম্পল আছে? দিতে পারবেন?’’দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ করার ঘোষণা সরকারেররামিসার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।বৃহস্পতিবার (২১ মে) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন।তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হবে।এদিকে দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রামিসা হত্যাকাণ্ড ও সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সেইসঙ্গে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করা হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়াও শেষ হবে।’ বিচারহীনতার কথা সবসময় সঠিক নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক সময় বিলম্ব হয়, বিচার আদালতের বিষয়। তনু হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংক্ষিপ্ত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে।’

Go to News Site