Jagonews24
সরকারের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুরোনো ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে জনগণের জন্য বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। কর ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা, কর নেওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইনে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এবং একটি ফেসলেস (সরাসরি যোগাযোগহীন) ব্যবস্থা চালুসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে আয় বাড়াতে হবে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘ছায়া বাজেট কমিটি’ আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘অর্থনৈতিক সংস্কার ও মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর’ শিরোনামে এই সেশনটি আয়োজিত হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ এবং প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছায়া বাজেট কমিটির উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব সাদিয়া ফারজানা দিনার সঞ্চালনায় এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। আখতার: বাজেট যেন সাধারণ মানুষের জন্য হয় অনুষ্ঠানে আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে বাজেট মুখ্য বিষয় ছিল না, সেটি ছিল একটি কাগজের দলিল। সেসময় দেশকে পরিচালনা করত একটি করপোরেট গোষ্ঠী। তারা দেশের পয়সাগুলোর মালিক ছিল এবং তাদের হাত ধরেই দেশের পয়সা বিদেশে পাচার হয়েছিল। এখন যখন জবাবদিহিতার সময় এসেছে, তখন তারা নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে চায়। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এবারের বাজেট যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়; বাজেট যেন সাধারণ মানুষের জন্য হয়। তিনি আরও বলেন, বাজেট সংসদে সবচেয়ে রুটিন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যার সাথে নাগরিক সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর বাজেট আসলে আমরা শুনি যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেট করা হবে। কিন্তু পাস হয়ে গেলে আমরা দেখি গতানুগতিক পূর্বের বছরের ধারাবাহিকতায় একটি বাজেট হয়েছে। আতিক মুজাহিদ: মানুষ দয়া চায় না, ফেয়ারনেস চায় ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘আমরা আজকের বাজেট সভা করার আগে আশুলিয়ার শ্রমিক, কারওয়ান বাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলেছি।’ তিনি বলেন, মানুষের সাথে কথা বলে বুঝেছি যে, বাংলাদেশের মানুষ সরকারের কাছে দয়া চায় না, তারা একটা ফেয়ারনেস (ন্যায্যতা) চায়। করের বোঝা যেন কেবল নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর না পড়ে, শিল্পপতিরা যেন বাদ না যায়। তারা একটি নিশ্চয়তা চায়, যেন তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং বাজেট কীভাবে ব্যয় হবে সেটির জবাবদিহিতা দেখতে চায়। সাবেক অর্থসচিব: ফেসলেস কর ব্যবস্থা জরুরি বাংলাদেশের আসন্ন বাজেটের বড় আকার নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এর অর্থায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারে বড় ধরনের সংকট দেখছেন সাবেক অর্থসচিব ও সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। সরকার যদি স্থানীয় বাজার থেকে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো খুব কঠিন হবে এবং অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের ২০টি মন্ত্রণালয়ে এরকম একশর ওপর প্রোগ্রাম আছে। এই কর্মসূচিগুলোকে যদি একটি ছাতার নিচে এনে ডিজিটালাইজড করা হয়, তবে প্রশাসনিক ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং উপকারভোগী ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানো যাবে। এছাড়া, দেশের দেউলিয়া ব্যাংকগুলো বন্ধ বা অবসায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং কর আদায়ে সম্পূর্ণ ‘ফেসলেস’ বা ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন তিনি। তৌফিকুল ইসলাম: ব্যবস্থাপনায় আইনি ব্যত্যয় সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরাসরি সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯’ অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী প্রতি তিন মাস পর বাজেটের অগ্রগতি পেশ করার কথা। এই আইনের ১২(২) ধারা অনুযায়ী যথাসম্ভব মার্চ মাসের মধ্যে সংশোধিত বাজেট পেশ করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না, যা একটি বড় আইনি ব্যত্যয়। এছাড়া ত্রৈমাসিক বাজেট অগ্রগতির রিপোর্ট ওয়েবসাইটে দেওয়া বন্ধ হওয়াকেও তিনি স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের আবর্তক বা চলতি ব্যয় মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল। এ ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়ন ব্যয় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে হয়েছে। কর ফাঁকি রোধে তিনি এনআইডি-র মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভূমি ও গাড়ি রেজিস্ট্রেশন যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কর ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন। এনবিআর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ ও পলিসি (নীতি) তৈরির জায়গা একই সাথে হওয়ায় এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ড. খান জহিরুল: খেলাপি ঋণ না থাকলে বাস্তবায়ন সহজ কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আগামী বছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, অথচ কেবল খেলাপি ঋণের পরিমাণই ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ না থাকলে আমাদের বাজেট বাস্তবায়ন কোথায় নিয়ে যাওয়া যেত, তা ভাববার বিষয়। তিনি ব্যাংক খাতকে পুরোপুরি স্বাধীন করার তাগিদ দেন। নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী: কর ব্যবস্থা সংস্কার না করলে জনগণ আস্থা হারাবে সভাপতির বক্তব্যে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, কর ব্যবস্থা সংস্কার করা জরুরি। গরিব মানুষ কর দেয়, অন্যদিকে যারা বড়লোক তারা সেখান থেকে লুট করে নিয়ে যায়। কর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না করলে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্কের ভাটা পড়বে এবং জনগণ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাবে। এনএস/এসএইচএস
Go to News Site