Jagonews24
প্রতি বছর ২৩ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক প্রসূতি ফিস্টুলা প্রতিরোধ দিবস’। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি কেবল একটি স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি নয়; এটি নারীস্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু হ্রাস, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং মানবাধিকারের এক গভীর আহ্বান। পৃথিবীর বহু দেশে এখনও হাজার হাজার নারী প্রসবজনিত জটিলতায় ‘অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা’ নামক এক ভয়াবহ শারীরিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে এই রোগের অস্তিত্ব মানবসভ্যতার জন্য লজ্জাজনক বলেই বিবেচিত হয়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশে প্রসূতি ফিস্টুলা আজও একটি নীরব ট্র্যাজেডি। দরিদ্রতা, অল্পবয়সে বিয়ে, অপুষ্টি, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা এবং সচেতনতার অভাবে অসংখ্য নারী প্রতিনিয়ত এই জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অথচ সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক প্রসূতি সেবার মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। প্রসূতি ফিস্টুলা কী? প্রসূতি ফিস্টুলা হলো প্রসবকালীন দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত প্রসবের ফলে মায়ের জন্মনালির সঙ্গে মূত্রথলি অথবা মলাশয়ের মধ্যে অস্বাভাবিক ছিদ্র তৈরি হওয়া। এর ফলে আক্রান্ত নারীর অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রস্রাব কিংবা মল নির্গত হতে থাকে। এটি কেবল একটি শারীরিক রোগ নয়; এটি নারীর আত্মসম্মান, সামাজিক অবস্থান এবং মানসিক সুস্থতার ওপর গভীর আঘাত হানে। সাধারণত দীর্ঘক্ষণ প্রসববেদনা চললেও যখন হাসপাতালে নেওয়া হয় না কিংবা অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা যায় না, তখন শিশুর মাথার চাপে জন্মনালির আশপাশের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় এবং ফিস্টুলা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুটি মৃত জন্মগ্রহণ করে এবং মা আজীবনের জন্য শারীরিক যন্ত্রণার শিকার হন। কেন এখনও এই রোগ বিদ্যমান? বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রসূতি ফিস্টুলা প্রায় বিলুপ্ত হলেও দরিদ্র ও অনুন্নত দেশগুলোতে এটি এখনও বিদ্যমান। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যথা- অল্পবয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব: কৈশোরে গর্ভধারণ মেয়েদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অল্পবয়সী মেয়েদের শরীর পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত না হওয়ায় প্রসব জটিলতা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে এখনও অনেক এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা বিদ্যমান, যা ফিস্টুলার অন্যতম কারণ। দারিদ্র্য ও অপুষ্টি: দরিদ্র পরিবারের নারীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। অপুষ্টির কারণে শরীর দুর্বল থাকে এবং প্রসবকালীন জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দক্ষ প্রসূতি সেবার অভাব: গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও অনেক নারী দক্ষ ধাত্রী বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া বাড়িতে সন্তান প্রসব করেন। জরুরি অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সচেতনতার ঘাটতি: অনেক পরিবার প্রসবজনিত জটিলতার লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন নয়। সামাজিক কুসংস্কার ও অজ্ঞতাও নারীদের যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। আক্রান্ত নারীদের করুণ বাস্তবতা প্রসূতি ফিস্টুলায় আক্রান্ত একজন নারী কেবল শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন না; তাকে সামাজিক অবহেলা ও অপমানও সহ্য করতে হয়। শরীর থেকে অনবরত দুর্গন্ধ বের হওয়ার কারণে পরিবার ও সমাজ অনেক সময় তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। স্বামী পরিত্যাগ করেন, বন্ধ হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ। অনেক নারী হতাশা, বিষণ্নতা এবং আত্মসম্মানহীনতায় ভুগতে থাকেন। এই নারীদের অনেকেই মনে করেন, তাদের জীবন শেষ হয়ে গেছে। অথচ যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফিস্টুলা নিরাময় সম্ভব। কিন্তু দরিদ্রতা ও সামাজিক ভয়ের কারণে অনেক নারী চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন না। বাংলাদেশে পরিস্থিতি বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, হাসপাতালভিত্তিক প্রসব বেড়েছে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। তারপরও প্রসূতি ফিস্টুলা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ফিস্টুলা চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মিডওয়াইফ এবং নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবুও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও অনেক নারী সেবার বাইরে রয়ে গেছেন। বাংলাদেশ সরকার ‘ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করছে। তবে শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আরও পড়ুন: গর্ভকালীন জটিলতা রোধে সচেতনতাই হতে পারে সমাধান শিশুর ভবিষ্যৎ ও মায়ের সুরক্ষায় বুকের দুধের জাদু প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায় প্রসূতি ফিস্টুলা প্রতিরোধের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। যথা- নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা: প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রসব নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধ করা: অল্পবয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমাতে বাল্যবিবাহ কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন: শিক্ষিত নারী নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হন। তাই নারীশিক্ষা প্রসারে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা: প্রত্যন্ত অঞ্চলে জরুরি প্রসূতি সেবা সহজলভ্য করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। মানবাধিকারের প্রশ্ন প্রসূতি ফিস্টুলা কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর মৌলিক অধিকার। যখন কোনো নারী শুধুমাত্র দারিদ্র্য, অবহেলা বা চিকিৎসাসেবার অভাবে এই রোগে আক্রান্ত হন, তখন তা সামাজিক বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। নারীর স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না। একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে নারীকে নিরাপদ মাতৃত্বের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক দিবসের তাৎপর্য আন্তর্জাতিক প্রসূতি ফিস্টুলা প্রতিরোধ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রতিটি মায়ের জীবন মূল্যবান। আধুনিক পৃথিবীতে কোনো নারী যেন প্রসবজনিত জটিলতার কারণে আজীবন কষ্ট না পান, সেটিই এই দিবসের মূল বার্তা। এই দিবস পালনের মাধ্যমে সরকার, চিকিৎসক, সমাজকর্মী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসূতি ফিস্টুলা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রচার করা জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসচেতন বার্তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মানবিক গল্প, সফল চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদাহরণ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করে। এতে আক্রান্ত নারীরাও সাহস পান চিকিৎসা নিতে। আমাদের করণীয় প্রসূতি ফিস্টুলা প্রতিরোধে সরকার একা সফল হতে পারে না। পরিবার, সমাজ, চিকিৎসক, শিক্ষক, গণমাধ্যম এবং তরুণ প্রজন্ম-সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রসব অবশ্যই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে করাতে হবে। বাল্যবিবাহ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নারীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির প্রতি পরিবারকে আরও যত্নবান হতে হবে। আক্রান্ত নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। একজন মা কেবল একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা। তার স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রসূতি ফিস্টুলা এমন একটি দুর্ভাগ্যজনক সমস্যা, যা আধুনিক চিকিৎসা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই আসুন, আন্তর্জাতিক প্রসূতি ফিস্টুলা প্রতিরোধ দিবসে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি-কোনো নারী যেন আর অবহেলা, অজ্ঞতা কিংবা দারিদ্র্যের কারণে এই যন্ত্রণাদায়ক রোগের শিকার না হন। নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হোক, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, এই প্রত্যাশায় পালিত হোক ২৩ মে, আন্তর্জাতিক প্রসূতি ফিস্টুলা প্রতিরোধ দিবস। জেএস/
Go to News Site