Collector
কুমিল্লায় স্মৃতিতে জীবন্ত নজরুল | Collector
কুমিল্লায় স্মৃতিতে জীবন্ত নজরুল
Jagonews24

কুমিল্লায় স্মৃতিতে জীবন্ত নজরুল

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, প্রেম, সংগ্রাম ও সৃষ্টির এক অনন্য অধ্যায় জড়িয়ে আছে কুমিল্লার সঙ্গে। অল্প সময়ের জন্য তিনি এই জেলায় অবস্থান করলেও এই জনপদের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। কবির প্রেম, বিপ্লব, সাহিত্যচর্চা ও সংগ্রামের বহু স্মৃতি ছড়িয়ে আছে কুমিল্লার পথে-প্রান্তরে। কুমিল্লার বিভিন্ন স্থান আজও বহন করছে কবির স্মৃতি, প্রেম ও বিদ্রোহের ইতিহাস। কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন কুমিল্লার স্থানীয় গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নজরুল প্রেমীরা। ২৪ মে জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। এবার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৩, ২৪ ও ২৫ মে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে কুমিল্লা মহানগর ও কবিতীর্থ দৌলতপুরে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠান। আজ শনিবার (২৩ মে) বিকেল সাড়ে ৩টায় নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে জেলা শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত র‍্যালি, পৌনে ৪টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘চেতনায় নজরুল’ ম্যুরালে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জন্মদিন ঘিরে কুমিল্লার গবেষক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নজরুলকে তারা শুধু জাতীয় কবি হিসেবেই দেখেন না, বরং কুমিল্লার মানুষ তাকে নিজেদের একজন হিসেবেই মনে করেন। তাদের বিশ্বাস, কুমিল্লার মাটি, মানুষ ও পরিবেশ নজরুলকে দিয়েছে সৃষ্টির নতুন দিগন্ত। কবির বহু কালজয়ী কবিতা ও গান রচিত হয়েছে এই জনপদে বসেই। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়ি, ধর্মসাগর পাড়, রাণীর দীঘি, মহেশাঙ্গন, দারোগাবাড়ি, টাউন হল ময়দান, সংগীতজ্ঞ শচীনদেব বর্মনের চর্থার রাজবাড়ি এবং নবাববাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে কবির পদচিহ্ন। এসব স্থান আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে কুমিল্লা। এখানকার অভিজ্ঞতা, প্রেম ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে একদিকে যেমন দ্রোহের কবিতে পরিণত করেছে, অন্যদিকে প্রেম ও মানবতার কবি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দফায় নজরুল প্রায় ১১ মাস কুমিল্লায় অবস্থান করেন। এই সময়কে কবির জীবনের মোড় পরিবর্তনের অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন গবেষকরা। বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা যায়, ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতা আগমন উপলক্ষে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডাকা হরতালে অংশ নিতে নজরুল কুমিল্লার রাজগঞ্জে প্রতিবাদী গান গেয়ে মিছিলে যোগ দেন। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে তার সেই অংশগ্রহণের ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পেছনে এ অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল গভীর। কবির ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও রচিত হয়েছে কুমিল্লায়। জেলার মুরাদনগরের দৌলতপুরে খাঁ বাড়ির নার্গিস আসার খানম এবং কুমিল্লা শহরের পশ্চিম কান্দিরপাড়ের আশালতা সেনগুপ্ত ওরফে প্রমীলা- এই দুই নারীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি। তাদের প্রভাব কবির সাহিত্য ও সংগীতচর্চায় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা। কুমিল্লায় অবস্থানকালে নজরুল অসংখ্য কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। এখানকার প্রকৃতি, মানুষ ও সম্পর্ক তার সৃষ্টিশীলতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল বলে জানান স্থানীয় সাহিত্য অনুরাগীরা। কবির স্মৃতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দিতে কুমিল্লায় বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৬০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কবি নজরুল ছাত্রাবাস’। ১৯৬২ সালে কান্দিরপাড় থেকে ফরিদা বিদ্যায়তন পর্যন্ত সড়কের নামকরণ করা হয় ‘নজরুল এভিনিউ’। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নজরুল ললিতকলা পরিষদ’, যা পরবর্তীতে ‘নজরুল পরিষদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮৩ সালে কবির অবস্থান করা বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয় স্মৃতিফলক। পরে ১৯৯২ সালে এসব স্থানে স্থায়ী ফলক নির্মাণ করে সেখানে নজরুল-স্মৃতির বিবরণ তুলে ধরা হয়। কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির সামনে নির্মিত হয়েছে ‘চেতনায় নজরুল’ স্মৃতিস্তম্ভ। এছাড়াও জেলার মুরাদনগরের দৌলতপুরে সংরক্ষণ করা হয়েছে খাঁ বাড়ির কিছু স্মৃতিচিহ্ন। কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটও। আরও পড়ুন- দুই যুগ পর ত্রিশালে নজরুল জন্মজয়ন্তী, উদ্বোধনে থাকছেন প্রধানমন্ত্রীপ্রধানমন্ত্রীর আগমনে নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো ত্রিশালসাইফুর রহমানের নামে ফিরছে কবি নজরুল অডিটোরিয়াম কবিতীর্থ দৌলতপুরের বাসিন্দা এবং কবিপত্নী নার্গিসের ভাইয়ের ছেলে বাবলু আলী খান বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে মুরাদনগরের দৌলতপুরের সঙ্গে। এখানেই সৈয়দা খাতুনের প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেন কবি এবং নাম দেন নার্গিস আসার খানম। তিনি বলেন, দৌলতপুরে বসেই কবি বহু গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে ‘নজরুল মঞ্চ’ ও একটি ম্যুরাল। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী নার্গিস আসার খানমের জন্মস্থান ও নজরুল স্মৃতির উল্লেখযোগ্য স্থান কবিতীর্থ খ্যাত দৌলতপুরে নজরুল স্মৃতি মারাত্মকভাবে অবহেলার শিকার উল্লেখ করে দৌলতপুরে নজরুল গ্রন্থের লেখক ও ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত জেলা কুমিল্লা। জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুরকে কবি তীর্থ দৌলতপুর বলা হয়। তিনি বলেন, কবির জীবনের স্মৃতিবিজড়িত উল্লেখযোগ্য স্থান কুমিল্লা এবং দৌলতপুর একেবারেই অবহেলিত আমরা বলতে পারি। কবির প্রথম স্ত্রী নার্গিস আসার খানমের যেই স্মৃতিবিজড়িত দৌলতপুর, সেখানে কিছু জায়গায় ফলক লাগানো হলেও এবং ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় তৎকালীন এমপি কাজী শাহ্ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের কল্যাণে একটি মুক্তমঞ্চ বা উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এছাড়া দৌলতপুরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘নার্গিস-নজরুল বিদ্যানিকেতন’ স্থাপিত হয়েছে। এছাড়া দৌলতপুরে আর কোনো স্মৃতিচিহ্ন বা স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, আমরা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র পক্ষ থেকে বরাবরই বলে আসছি, সেখানে একটা স্মৃতি কমপ্লেক্স বা নজরুল ইনস্টিটিউটের একটি ক্যাম্পাস সেখানে স্থাপন করার জন্য। তাহলে দৌলতপুর তথা মুরাদনগর কেন্দ্রিক নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গঠিত হবে। নজরুল গবেষক কাজী মাহতাব সুমন বলেন, কুমিল্লা মহানগরীতে ছড়িয়ে থাকা নজরুলের স্মৃতিগুলো শুধু ইতিহাস নয়, এগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এসব স্থানের যথাযথ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মু. রেজা হাসান বলেন, জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের জন্য কুমিল্লা ও দৌলতপুরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণ। তিনি আরও বলেন, যদি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কবির কোনো স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিষয়টি আমাদের নজরে এলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এফএ/এএসএম

Go to News Site