Somoy TV
গত দুই যুগে উন্নয়নের পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাতেও পরিণত হয়েছে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা। শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এ উপজেলায় এ সময়ের মধ্যে অন্তত ৬১ শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। থানা পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।তবে এসব ঘটনার অধিকাংশেরই বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে হত্যা মামলা, কোনোটি বিচারাধীন, আবার কোনোটি আপসে মীমাংসা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।নিহতদের পরিবারগুলো আজও শোক, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বের হয়ে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মামলা তুলে নিতে স্বজনদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় তুলনামূলক শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত রূপগঞ্জে গত দুই যুগে গড়ে উঠেছে প্রায় এক হাজারের বেশি ছোট-বড় শিল্পকারখানা। শিল্পায়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আধিপত্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় বেড়েছে শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনাও।বিগত ২০১৩ সালের ১১ মে গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের মৃত আমানউল্লাহর মেয়ে শান্তা মনিকে পিটিয়ে হত্যা করে বখাটেরা। সে ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সিনহা কলেজের ছাত্রী আমেনা বেগম খুন হন। ১৯ এপ্রিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মুন্না হত্যার শিকার হয়।২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জাঙ্গীর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র নাঈম হোসেনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৪ জুন মিঠাব এলাকার শিক্ষার্থী নেয়ামুল হক নাঈম খুন হন। রূপসী নিউ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আল-আমিনকেও একই বছরে জবাই করে হত্যা করা হয়। ৭ জানুয়ারি বরপা বাগানবাড়ি এলাকায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুইটি আক্তার এবং ৩ জুলাই তারাব হাটিপাড়া এলাকার সিনহা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী মৌসুমি আক্তার হত্যার শিকার হন।আরও পড়ুন: যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে চনপাড়া-ডেমরা সেতু!২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট ভুলতা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মারুফ মিয়া খুন হয়। একই বছর কাজীরবাগ এলাকার এক অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী পরকীয়া প্রেমের জেরে হত্যার শিকার হয়।২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তিপণের ৫০ হাজার টাকা না পেয়ে ভুলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র তাজুল ইসলামকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। একই বছরের ৪ নভেম্বর আয়েত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী প্রিয়াংকা আক্তারকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আব্দুল হক ভূঁইয়া ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র এমরান হোসেন নিখোঁজ হয়। আজও তার সন্ধান মেলেনি। পরিবারের দাবি, তাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে। একই বছরের ১২ জানুয়ারি নবকিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র আসলাম হোসেন এবং ১ ফেব্রুয়ারি সলিমউদ্দিন চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাসির দেওয়ান খুন হন।২০১৮ সালের ২৭ মে মুড়াপাড়া কলেজের ছাত্র হোসেন আহম্মেদ রুবেল, ১৫ ফেব্রুয়ারি দেবই কাজীরবাগ আলিম মাদরাসার ছাত্রী পাপিয়া এবং ২১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র পারভেজ আহম্মেদ জয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। একই বছরের ৬ জুন শিশুমেলা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জয়ন্ত চন্দ্র দাসকে হত্যা করা হয়।২০২১ সালের আগস্টে গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের নতুন বাজার এলাকায় সানী নামে এক স্কুলশিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২৩ অক্টোবর সামিয়া নামে চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাকিব নামে আরেক শিক্ষার্থী খুন হয়।২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান ও তার এক বন্ধুকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় মেহেদী হাসান।২০২৪ সালের ৩০ জুলাই ভুলতা ইউনিয়নের মিঠাবো এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জিসানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর গোলাকান্দাইল এলাকায় মেহেদী হাসান নামে আরেক শিক্ষার্থীকে হত্যার পর তার মরদেহ হাইওয়ে সড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়।আরও পড়ুন: রূপগঞ্জে ‘ছাত্তার জুট মিলস্ মডেল হাইস্কুল’ পুনঃনামকরণের প্রস্তাব২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল ভোলাব গাবতলী এলাকায় জুবায়ের নামে এক শিক্ষার্থীকে তার বন্ধুরা শ্বাসরোধে হত্যার পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। একই বছরের ১৩ আগস্ট ইয়াসিন আরাফাত নামে এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার নয় মাস পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হলেও মামলাটি এখনো চলমান। এছাড়া তারাব বিশ্বরোড এলাকা থেকে মাহাদী ইসলাম ও সালমান নামে দুই মাদরাসা শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।নিহত পারভেজের পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘মামলা চলছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি দেখি না। আসামীরা জামিনে এসে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের আর কিছু করার নেই।’জাঙ্গীর এলাকার নিহত নাঈমের পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘আমাগো তরতাজা পোলাডারে মাইরা ফালাইছে। কিছুই অইলো না। আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।’নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেন, রূপগঞ্জের বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এ কারণে অনেক মামলা এগোয় না। কিছু মামলা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আপোষ হয়, আবার কিছু মামলা বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে।এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা ‘গ’ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘দুই-একটি ঘটনা ছাড়া অধিকাংশই আগের। পুলিশ আইনগত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব ঘটনা ঘটেছে, প্রায় সবগুলোরই রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে সে চেষ্টা করছি। কোনো পরিবার সমস্যা মনে করলে আমাদের জানাতে পারেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
Go to News Site