Jagonews24
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নবনিযুক্ত প্রধান কোচ থমাস ডুলির জন্ম, বড় হওয়া ও একজন ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা বেশ চমৎকার। ১৯৬১ সালে জার্মানির বেখহফেন নামক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন একজন মার্কিন সেনা সদস্য ও মা জার্মান। ডুলির জন্মের কিছুদিন পরই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান তার বাবা। বাবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ডুলির বড় হওয়া জার্মান পরিবেশেই। শৈশব ও কৈশোরের সময়টা পার করেছেন জন্মশহরেই। তাইতো বড় হওয়াটা জার্মান ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যেই। খুব ছোট বয়সেই জার্মানির স্থানীয় কিছু অপেশাদার ও নিচের সারির ক্লাবে খেলা শুরু করেন। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে বেশ সময়ও লেগেছিল ডুলির। ১৯৮৮ সালে প্রায় ২৭ বছর বয়সে যোগ দেন জার্মানির শীর্ষ লিগ বুন্দেসলিগার ক্লাব কাইজারস্লটার্নে। ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ওই ক্লাবে যোগ দেওয়ার পরই। শুরুতে খেলতেন ফরোয়ার্ড পজিশনে। সেখান থেকে তাকে সরিয়ে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বা সুইপার হিসেবে খেলাতে শুরু করেন ওই ক্লাবের কোচ। নিজের আসল জাত চেনান তিনি ডিফেন্ডার হিসেবেই। কাইজারস্লটার্নের হয়ে তিনি ১৯৯০ সালে জার্মান কাপ এবং ১৯৯১ সালে সবাইকে চমকে দিয়ে বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়ন করান। এ সাফল্য তাকে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। জার্মানিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও তার বাবার সূত্রে ডুলির মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি সুযোগ ছিল। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সকার ফেডারেশন প্রবাসী ফুটবলার খুঁজছিল। সেই সুযোগেই ডুলি ১৯৯২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান এবং সরাসরি দেশটির জাতীয় দলে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগের মূল কাণ্ডারি হিসেবে খেলেন। সামলেছেন ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দলটির অধিনায়কত্বের ভারও। খেলার জগতের ব্যস্ততার মধ্যেও ফুটবল নিয়ে বইও আছে থমাস ডুলির। বাংলাদেশ ফুটবলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিজের লেখা বইয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন এবং সেই ‘দ্য ট্রুথ অ্যাবাউট সাকসেস ইন সকার দ্যাট নো ওয়ান টিচেস’ বইয়ে তুলে ধরেছেন নিজের ফুটবল দর্শণের কথা। থমাস ডুলির লেখা বইটিতে মূলত ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সাফল্য পাওয়ার আসল রহস্য ও কৌশলগুলো উন্মোচন করা হয়েছে। বইয়ে এই মার্কিন কোচ কোন বিষয়গুলোতে গুরত্ব দিয়েছেন তা বর্ণনা করতেও ভোলেননি। বইটিতে তিনি ফুটবলের চিরাচরিত প্রথাগত কোচিং বা কৌশলের বাইরে গিয়ে ৪টি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে আলোচনা করেছেন। বইটিতে থমাস ডুলি যে বিষয়টিকে সাফল্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি বলেছেন, তা হলো খেলোয়াড়দের ‘মানসিকতা।’ তার মতে, মানসিকতা রাতারাতি বদলায় না; এটি হলো চিন্তা করার একটি গভীর প্রক্রিয়া। একজন ফুটবলারকে কেবল মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও ফুটবল নিয়ে ভাবতে হবে। জয়ী হওয়ার মানসিকতা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে যত ভালো কৌশলই শেখানো হোক না কেন, বড় মঞ্চে সফল হওয়া সম্ভব নয়। বইয়ে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যেকোনো বড় পুরস্কার বা অর্জনের আগে কঠোর পরিশ্রম এবং ত্যাগ স্বীকার করা বাধ্যতামূলক। আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রতিভার জোরে টিকে থাকা যায় না। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে পরিশ্রম করার মানসিকতা খেলোয়াড়দের ভেতরে তৈরি করার ওপর তিনি বইটিতে বিশেষ জোর দিয়েছেন। অবাস্তব কোনো স্বপ্ন না দেখে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করা এবং সেই অনুযায়ী একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়াকে তিনি সফলতার অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখিয়েছেন। কৌশলগত দিক থেকে তিনি বইটিতে ‘বল তাড়া করার’ চেয়ে ‘বল পায়ে রেখে খেলা’ এবং পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার দর্শনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এই বইটি মূলত: ফুটবলারদের মাঠের ভেতরের ট্যাকটিকস শেখানোর চেয়ে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং ফুটবলের প্রতি পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে থমাস ডুলি সুন্দর ফুটবল খেলানোর পাশাপাশি র্যাঙ্কিংয়ের উন্নতির কথাও বলেছেন। তার লক্ষ্য বাংলাদেশকে ১৫০ বা ১৬০ এ নিয়ে আসা। ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিপুল আবেগ ও উন্মাদনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি। তবে রাতারাতি অলৌকিক কিছুর আশা দেখাচ্ছেন না। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এই নতুন মাস্টারমাইন্ড। আমেরিকান কোচ। এশিয়ায় কাজ করতে সমস্যা হবে না তা নিজেই বলেছেন। কারণ তিনি এর আগে এশিয়ায় কাজ করেছেন। ফিলিপাইন জাতীয় দল ও মালয়েশিয়ার ফুটবলে কাজ করেছেন। তাই এখানকার ফুটবল সংস্কৃতির সাথে বেশ পরিচিত তিনি। মালয়েশিয়া বা ফিলিপাইনে থাকার সময়ই ডুলি দেখেছেন বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে কতটা ভালোবাসে। যে কারণে এশিয়ার ফুটবলে তার একটা টান ছিল। আবার কাজ করার ইচ্ছা ছিল। বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করে সেই ইচ্ছার পূর্ণতা এনেছেন জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই আমেরিকান। আরআই/ আইএন
Go to News Site