Jagonews24
প্রতি বছর ২৪ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব স্কিজোফ্রেনিয়া দিবস’। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো স্কিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল ধারণা দূর করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য- ‘শুনুন, জানুন এবং সহায়তা করুন’, শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি সমাজকে আরও সহানুভূতিশীল ও সচেতন করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আজও অসংখ্য মানুষ স্কিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগ নিয়ে নীরবে সংগ্রাম করছেন। কিন্তু রোগের চেয়েও বড় সমস্যা হলো সমাজের অবহেলা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা। তাই এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আমাদের শেখানো হচ্ছে-প্রথমে আক্রান্ত মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তারপর রোগ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে হবে এবং শেষে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা করতে হবে। স্কিজোফ্রেনিয়া কী? স্কিজোফ্রেনিয়া হলো দীর্ঘমেয়াদি একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি, যা একজন মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ ও বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় এমন কিছু শুনতে বা দেখতে পান যা বাস্তবে নেই। কখনও তারা অযৌক্তিক সন্দেহে ভোগেন, আবার কখনও চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও অনেক মানুষ স্কিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন, কিন্তু সচেতনতার অভাবে তারা সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। স্কিজোফ্রেনিয়ার কারণসমূহ স্কিজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট একক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিভিন্ন জৈবিক, মানসিক ও পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে এই রোগের সৃষ্টি করে। যেমন- বংশগত কারণ: পরিবারে কারও স্কিজোফ্রেনিয়া থাকলে অন্য সদস্যদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে এই রোগ থাকলে সতর্ক থাকতে হয়। মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো রাসায়নিক উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হলে স্কিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ: দীর্ঘদিনের হতাশা, উদ্বেগ, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক চাপ বা মানসিক আঘাত অনেক সময় রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মাদকাসক্তি: গাঁজা, ইয়াবা, মাদকদ্রব্য বা অতিরিক্ত নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহারের কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্কিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। গর্ভকালীন ও জন্মগত জটিলতা: গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি, সংক্রমণ বা শিশুর জন্মের সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি ভবিষ্যতে এই রোগের কারণ হতে পারে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব: দীর্ঘ সময় একাকী থাকা, অবহেলিত জীবনযাপন বা সামাজিক সম্পর্কের অভাবও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্কিজোফ্রেনিয়া কয় ধরনের? স্কিজোফ্রেনিয়া বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সব ধরনের স্কিজোফ্রেনিয়াকে একই রোগের ভিন্ন উপসর্গ হিসেবে দেখা হয়, তবুও লক্ষণ অনুযায়ী এটি কয়েকভাবে ভাগ করা হয়। প্যারানয়েড স্কিজোফ্রেনিয়া: এ ধরনের রোগীরা অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েন। তারা মনে করেন কেউ তাদের ক্ষতি করতে চায় বা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ডিসঅর্গানাইজড স্কিজোফ্রেনিয়া: এ ক্ষেত্রে রোগীর চিন্তা ও কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে যায়। আচরণ অস্বাভাবিক হয় এবং আবেগ প্রকাশেও পরিবর্তন দেখা যায়। ক্যাটাটোনিক স্কিজোফ্রেনিয়া: এই ধরনের রোগীরা কখনও দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ ও স্থির হয়ে থাকেন, আবার কখনও অস্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়া করেন। আনডিফারেনশিয়েটেড স্কিজোফ্রেনিয়া: যখন রোগীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায় কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিতে ফেলা যায় না, তখন তাকে এই ধরনের স্কিজোফ্রেনিয়া বলা হয়। রেসিডুয়াল স্কিজোফ্রেনিয়া: এ ক্ষেত্রে রোগের তীব্র উপসর্গ কমে গেলেও কিছু নেতিবাচক লক্ষণ থেকে যায়, যেমন-আবেগহীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা আগ্রহ কমে যাওয়া। আরও পড়ুন: ফিস্টুলামুক্ত জীবন হোক প্রতিটি নারীর অধিকার গর্ভকালীন জটিলতা রোধে সচেতনতাই হতে পারে সমাধান ‘শুনুন’ সহমর্মিতার প্রথম ধাপ ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের প্রথম শব্দ হলো ‘শুনুন’। আমরা অনেক সময় মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনি না। অথচ একজন স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো কেউ তার অনুভূতি ও কষ্ট ধৈর্য নিয়ে শুনুক। শোনা মানে শুধু শব্দ শোনা নয়; বরং তার মানসিক যন্ত্রণা বোঝা এবং তাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। একজন সহানুভূতিশীল শ্রোতা অনেক সময় একজন রোগীর জীবনে আশার আলো হয়ে উঠতে পারেন। ‘জানুন’ সচেতনতাই পরিবর্তনের শক্তি প্রতিপাদ্যের দ্বিতীয় অংশ ‘জানুন’। আমাদের সঠিক জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানায়। সমাজে এখনো অনেক মানুষ মনে করেন স্কিজোফ্রেনিয়া মানেই ‘পাগলামি’। কেউ কেউ এটিকে অভিশাপ বা অলৌকিক সমস্যা বলে মনে করেন। এসব ভুল ধারণা রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। বাস্তবে স্কিজোফ্রেনিয়া একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক রোগ। সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ, কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে রোগী অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। ‘সহায়তা করুন’ মানবিকতার প্রকৃত পরিচয় প্রতিপাদ্যের শেষ অংশ ‘সহায়তা করুন’ হলো মানবিকতার প্রকৃত শিক্ষা। একজন স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু ওষুধের নয়, মানসিক ও সামাজিক সহায়তারও প্রয়োজন অনুভব করেন। অনেক সময় তারা পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সহায়তা বলতে শুধু আর্থিক সাহায্য বোঝায় না। বরং, ভালোবাসা ও সম্মান দেওয়া, নিয়মিত চিকিৎসায় উৎসাহ দেওয়া, সামাজিকভাবে গ্রহণ করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, একাকীত্ব দূর করতে পাশে থাকা। এসবই একজন রোগীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। পরিবারের ভূমিকা স্কিজোফ্রেনিয়া মোকাবিলায় পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যদি রোগীকে অবহেলা না করে বরং সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করে, তাহলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হয়। পরিবারের উচিত- রোগীকে অপমান না করা, ধৈর্য ধরে তার কথা শোনা, ওষুধ সেবনে উৎসাহ দেওয়া, নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা। পরিবারের ভালোবাসা একজন রোগীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্কিজোফ্রেনিয়া দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘শুনুন, জানুন এবং সহায়তা করুন’ আমাদের মানবিকতার নতুন শিক্ষা দেয়। আসুন, আমরা মানসিক রোগ নিয়ে ভয় নয়, সচেতনতা ছড়াই; অবহেলা নয়, সহমর্মিতা দেখাই। একজন স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষও আমাদেরই মতো স্বপ্ন, অনুভূতি ও আশা নিয়ে বেঁচে আছেন। জেএস/
Go to News Site