Jagonews24
রামিসা, মা; তুমিই প্রথম না, কিন্তু শেষ কি না, তা খুব বেদনাকাতর প্রশ্ন। রামিসা, মা আমার; বর্বরতা-পৈশাচিকতা আর দুঃসহতার স্মারক হয়ে গেলি তুই দানবের থাবায় রক্তস্নাত পরিবর্তনের এই বাংলাদেশে! জীবনের মাত্র আটটি বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই যে ছোবলে তোর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল, এর দায় রাষ্ট্র-সমাজ আর উর্বর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যাদের, তাদের কোনো পক্ষেরই তা এড়ানোর অবকাশ নেই। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি (মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর অর্থাৎ ১৮শ শতকের কবি) ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের একটি অমর পঙ্ক্তি—‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। মা রে, দুধে ভাতে তো পরের কথা, ঘরের ভেতরেও তোর মতো রামিসারা কত বিপন্ন, এ আর নতুন করে বলার কী আছে! তোর শোকার্ত বাবা ক্রন্দন করতে করতে স্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন, ‘আমি বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’ এ ব্যাপারে মাননীয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ২১ মে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, ‘রামিসার বাবার কথা অমূলক নয়।’ তাঁর এই বক্তব্যের গর্ভে আরও কিছু ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিচারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। মা রে, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের এমন অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। এই প্রেক্ষাপটে তোকে হারানো বাবার ক্ষোভের বৃত্তে বৃত্তায়িত আর্তনাদ মোটেও অসঙ্গত নয় এবং এমন আর্তনাদ আগেও আমরা শুনেছি। ২১ মে একটি দৈনিকে ‘খেলার বয়সেই কফিনে’ শিরোনামে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ মাসে খুন হয়েছে অন্তত ৫২৫ জন শিশু! এ তো রে মা, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান; কিন্তু এর আগের পরিসংখ্যান? দীর্ঘ, অনেক দীর্ঘ রে মা। রামিসা, যে সমাজ তোকে/তোদের ‘দুধে ভাতে’ রাখতে পারেনি, সেই সমাজ যে শুধু বিবর্ণ হচ্ছে ক্রমাগত, তা তো নয়; এই সমাজ হয়ে উঠছে দানবদের চারণভূমি! আমরা ভুলে গেছি তোর মতো কত রামিসার কথা। মাগুরার আসিয়ারও প্রায় কাছাকাছি সময়ে কী মর্মান্তিক পরিণতি! ২১ মে চট্টগ্রামে তোর মতো আরও একজন ধর্ষকের কবলে পড়েছে, যে তোরও অনুজ। মা রে, ক্ষতের ওপর সৃষ্ট ক্ষতে রক্তস্নাত এই বাংলাদেশ কি তোদের জন্মভূমি? জানি না, জানি না রামিসা; এই বাংলাদেশ আর কত সর্বংসহা হবে! ২১ মে রাতে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান ছুটে যান তোর বাবার কাছে, যেখানে তুই পৈশাচিকতা-বর্বরতার শিকার হয়ে অকালবিদায় নিলি। মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্যও গিয়েছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার যাওয়ার বিষয়টি আশার আলো হিসেবে দেখছি বটে, কিন্তু একই সঙ্গে এ প্রশ্নও জাগে, রাষ্ট্রের যেসব প্রশাসনিক শাখা-প্রশাখা ও বিচারব্যবস্থার দ্রুত প্রতিবিধান নিশ্চিত করার দায়, সেক্ষেত্রে আশার আলো কতটা প্রস্ফুটিত হবে? প্রশ্নটির খুব একটা সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছি না রে মা। তবে এত কিছুর পরও আশা করি, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার সম্বিৎ ফেরাবে। আমাদের অভিজ্ঞতা তিক্ত এবং এ ক্ষেত্রে মাননীয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্য অমূলক নয়। তোর বাবার যে আর্তনাদ, তা ফের স্পষ্ট করেছে পিশাচ-দুর্বৃত্তদের কুকর্মের যথাযথ প্রতিবিধানে রাষ্ট্রের-সমাজের ব্যর্থতার দাগটি কত মোটা করেছে। এ তো তোর সর্বহারা বাবার শুধু ব্যবস্থার প্রতিই অনাস্থা নয়, নিখাদ বাস্তবতা। মা রে, তুই জানিস নে নেত্রকোনার মদন উপজেলার একটি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সেই শিশুটির কথা, যে এগারো বছর বয়সে গর্ভবতী হয়। এর জন্য অভিযোগের আঙুল উঠেছে তার এক শিক্ষকের দিকে। ওই শিশুটির পরিবার অভিযোগ দিয়ে নাকি পড়েছে আরও বিপদে। এই উপাখ্যানও দীর্ঘ, অনেক দীর্ঘ। সমগ্র জনপদজুড়ে দানবদের অপছায়া কেন ক্রমপ্রসারিত হচ্ছে, কী কারণে হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর জানব কার কাছে? যে বীভৎস ঘটনার শিকার মা রামিসা, তা যেন অবসান ঘটায় বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির। আর যেন আমাদের বলতে না হয়—‘এখনো গেল না আঁধার’। মা রে, আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতাপূর্ণ নানা অপরাধের ঘটনায় বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি পোক্ত রূপ পেয়েছে, তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। অতীতে সিলেটের এমসি কলেজে ও নোয়াখালীর ঘটনায় অপরাধীদের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, রাজপথে এসব অনাচারের প্রতিবিধান চেয়ে ফের ঝড় উঠেছে। কিন্তু এমন ঝড় তো রে মা আগেও বহুবার উঠেছে, আবার একপর্যায়ে থেমে গেছে এবং বহু ক্ষেত্রে বিচারের বাণী কেঁদেছে নিভৃতে আর দানবরা আস্কারা পেয়েছে প্রতিবিধানের উদাহরণযোগ্য নজির তৈরি করতে ব্যর্থতার কারণে। এই ব্যর্থতার দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদেরও। সমাজে মানুষ নামের শুধু দুপেয়ে কিছু জীব কিংবা প্রাণীমাত্রের অনাচার-দুরাচার-কদাচারের গড়ে ওঠা পাহাড়ের পাদদেশে স্তূপীকৃত হচ্ছে চাপা আর্তনাদ। রামিসা, মা, মা রে আমার; পৈশাচিকতার ছোবলে ক্রমাগত তোরা ঝরে যাচ্ছিস আর বারবার একই প্রশ্ন রেখে যাচ্ছিস আমাদের সামনে—আর কত? মা, জানি না আর কত, কিন্তু এটুকু জানি, সমাজে শুভবোধসম্পন্নরা যদি দৃঢ় প্রত্যয়ে অনড় থাকেন ও রাষ্ট্র যদি পুরোনো বৃত্ত ভেদ করে রূপান্তরের মশাল জ্বালাতে পারে, তবেই মিলবে নিস্তার। অঙ্গীকার আর প্রতিশ্রুতি কোনো ফল যে দেবে না, দিতে পারে না যথাযথ প্রতিবিধান ছাড়া; এরই মর্মন্তুদ ও দুঃসহ ওজির তোরা। রামিসা, তোর রক্ত ছুঁয়ে আমরা যেন এই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকি—উদাহরণযোগ্য প্রতিবিধান ছাড়া আমরা ঘরে ফিরব না। যে বীভৎস ঘটনার শিকার মা রামিসা, তা যেন অবসান ঘটায় বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির। আর যেন আমাদের বলতে না হয়—‘এখনো গেল না আঁধার’। মা রে, আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতাপূর্ণ নানা অপরাধের ঘটনায় বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি পোক্ত রূপ পেয়েছে, তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। অতীতে সিলেটের এমসি কলেজে ও নোয়াখালীর ঘটনায় অপরাধীদের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না। অতীতে আমরা বহুবার শুনেছি, ‘অপরাধী যে বা যারাই হোক না কেন’—সরকারি তরফে এ রকম বাক্যবন্ধ। এমনটি ব্যবহার করে জনগণকে প্রবোধ বা আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা চলে যে অপরাধীরা যদি ক্ষমতাসীন দলের কোনো অংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েও থাকে, তবু তাদের বিচার ও শাস্তি হবে। কিন্তু কার্যত অপরাধীদের শাস্তি কালেভদ্রে হয়ে থাকে, যার কোনো ইতিবাচক প্রভাব ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন প্রবণতা হ্রাসের ক্ষেত্রে পড়ে না। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনার হোতা দেলোয়ার হোসেন রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রিত অপরাধবৃত্তির আরও একটি দুঃসহ নজির। মা, তোকে নিয়ে আমাদের বিলাপে যেন কেটে যায় আঁধার। রামিসা, আরও একটি কথা তুই ফের স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেলি—যে দেশে বৃহদাংশ মামলায় অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়, সেই দেশে সময়ে সময়ে ন্যায়বিচারের আশ্বাসবাণী উচ্চারণ জনমনে কোনো আশা জাগাতে পারে না। আসলে কোনো দেশে আইনের শাসন কার্যকর থাকলে অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়; এ জন্য সরকারের কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্বশীলদের আশ্বাস-অঙ্গীকারের প্রয়োজন পড়ে না, প্রশ্নও ওঠে না। রামিসা, তোকে নিয়ে ক্রন্দন-বিলাপ যেন দূর করে আঁধার। মা রে, যে ফুল না ফুটেই ঝরে গেল, সেই ফুল আছে আমাদের মণিকোঠায়। লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কবি। এইচআর/জেআইএম
Go to News Site