Collector
কুমিল্লায় কীভাবে নির্মিত হয়েছিল মোগল স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ? | Collector
কুমিল্লায় কীভাবে নির্মিত হয়েছিল মোগল স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ?
Jagonews24

কুমিল্লায় কীভাবে নির্মিত হয়েছিল মোগল স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ?

বাংলার ইতিহাসে মোগল আমল শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের যুগ নয়, এটি ছিল স্থাপত্য-সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময়ের বহু মসজিদ, দুর্গ ও ইমারত আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুমিল্লা শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা শাহ সুজার মসজিদ তেমনই একটি স্মারক, যার দেয়ালে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, কিংবদন্তি এবং ইতিহাসের বহু স্তর। গোমতী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি মোগল বাংলার স্মৃতি বহনকারী এক স্থাপত্য-নিদর্শন। মসজিদটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন মোগল সম্রাট শাহ সুজা। তিনি ছিলেন সম্রাট শাহ জাহানের দ্বিতীয় পুত্র এবং ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার সুবাদার। তার রাজধানী ছিল রাজমহল। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে শাহ সুজার নাম উচ্চারিত হয় যেমন ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে, তেমনি তার জীবনের করুণ পরিণতির জন্যও। কুমিল্লার শাহ সুজার মসজিদকে ঘিরে দুটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। প্রথমটি বলছে, ত্রিপুরা জয় করার পর বিজয়ের স্মারক হিসেবে শাহ সুজা এই মসজিদ নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় কিংবদন্তি আরও হৃদয়গ্রাহী। এতে বলা হয়, ত্রিপুরারাজ গোবিন্দ মাণিক্য ছিলেন শাহ সুজার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আশ্রয়দাতা। তারই দেওয়া অর্থে শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের কঠোর বিশ্লেষণ এই জনশ্রুতিগুলোকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। গবেষকেরা মনে করেন, শাহ সুজা আদৌ ত্রিপুরায় এসেছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে উত্তরাধিকার যুদ্ধের পরাজয়ের পর তিনি বাংলার পথ ধরে চট্টগ্রাম হয়ে আরাকানে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। পরিণতিতে মগদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। তার জীবনাবসান ঘটে এক করুণ ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থ রাজামালার প্রণেতা কৈলাসচন্দ্র সিংহ উল্লেখ করেন, মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্য শাহ সুজার “নিমচা তরবারি” বিক্রি করে সেই অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, গোমতী নদীর তীরে “সুজা মসজিদ” নামে একটি বৃহৎ ইটনির্মিত মসজিদ তখনও বিদ্যমান ছিল। এই বিবরণ থেকেই ধারণা করা হয়, মসজিদটির সঙ্গে শাহ সুজার নাম জড়িয়ে থাকলেও তিনি হয়তো এর প্রত্যক্ষ নির্মাতা ছিলেন না। বরং “সুজাগঞ্জ” এবং “শাহ সুজা মসজিদ” নামকরণ তার স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই প্রচলিত হয়েছে। তবে নাম যেভাবেই আসুক, স্থাপত্যের বিচারে এই মসজিদটি নিঃসন্দেহে মোগল আমলের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। গবেষক এ কে এম জাকারিয়া মসজিদটির নির্মাণকাল ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর গঠন ও অলংকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ এই আয়তাকার মসজিদের মূল কাঠামো ছিল সুদৃঢ় ও ভারসাম্যপূর্ণ। দেয়ালগুলো ছিল অত্যন্ত পুরু, যা মোগল স্থাপত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। মসজিদের সম্মুখভাগে ছিল প্রায় ২৪ ফুট প্রশস্ত একটি খোলা বারান্দা, যা পরবর্তীকালে সংস্কারের সময় পরিবর্তিত হয়। চার কোণায় ছিল অষ্টকোণাকার চারটি মিনার। এই মিনারগুলো শুধু অলংকার নয়, পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য। পূর্ব দেয়ালে ছিল তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। এর মধ্যে মধ্যবর্তী প্রবেশপথটি ছিল সবচেয়ে বড় এবং বহির্ভাগে সামান্য বের হয়ে আছে। এর দু’পাশে সরু গোলাকার মিনার স্থাপন করা হয়েছিল, যা মোগল স্থাপত্যে সৌন্দর্য বৃদ্ধির একটি পরিচিত রীতি। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালেও একটি করে প্রবেশদ্বার ছিল। মসজিদের অভ্যন্তরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব নির্মিত হয়েছিল। পার্শ্ববর্তী দুটি মিহরাব অপেক্ষাকৃত সরল হলেও কেন্দ্রীয় মিহরাবটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। অর্ধবৃত্তাকার এই মিহরাবে সূক্ষ্ম অলংকরণ ও সুন্দর আস্তরণ ব্যবহৃত হয়েছিল। সামনের দেয়ালে ছিল চমৎকার প্যানেলিং ও নকশা, যা আজও মোগল শিল্পরীতির সৌন্দর্যের সাক্ষ্য বহন করে। মসজিদের ছাদের ওপর ছিল তিনটি গম্বুজ। মধ্যবর্তী গম্বুজটি অন্য দু’টির তুলনায় অনেক বড়, যা কেন্দ্রীয় অক্ষকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য মোগল আমলের তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোর অন্যতম পরিচায়ক। গম্বুজগুলোর চূড়ায় কলসাকৃতির ফিনিয়াল স্থাপন করা হয়েছিল এবং নিচে পদ্মপাতার অলংকরণ দেখা যেত। এতে পারস্য ও ভারতীয় নকশার এক অপূর্ব সমন্বয় প্রকাশ পায়। বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক আহমাদ হাসান দানী মসজিদটির স্থাপত্যরীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, এর খিলানপথগুলো চার-কেন্দ্রিক খিলানরীতিতে নির্মিত। এটি মোগল স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত এক বিশেষ শৈলী। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মূল মসজিদের ছাদ ছোট ছোট গোলাকার টারেট দ্বারা শোভিত ছিল এবং চারদিকে প্যারাপেট নির্মাণ করা হয়েছিল। গম্বুজগুলো পেনডেনটিভ পদ্ধতিতে নির্মিত। অর্থাৎ বর্গাকার ভিত্তির ওপর গম্বুজ বসানোর জন্য কোণাগুলোকে বিশেষভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। গম্বুজের নিচে অষ্টভুজাকৃতি ড্রাম ব্যবহৃত হয়েছিল, যা স্থাপনাটিকে উচ্চতা ও ভারসাম্য দিয়েছে। এই নির্মাণরীতি মোগল প্রকৌশলের দক্ষতার পরিচায়ক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছে। সামনের দিকে নতুন বারান্দা যুক্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন অংশে আধুনিক সংযোজন দেখা যায়। ফলে আদি স্থাপনার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য হয়তো হারিয়ে গেছে। তবু আজও মসজিদটির দিকে তাকালে সপ্তদশ শতাব্দীর মোগল বাংলার স্থাপত্য-ঐতিহ্যের আভাস পাওয়া যায়। গোমতীর বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা শাহ সুজার মসজিদ যেন ইতিহাসের এক স্তব্ধ অধ্যায়। এখানে রাজনীতি আছে, পরাজয়ের বেদনা আছে, বন্ধুত্বের কিংবদন্তি আছে, আবার শিল্প-সৌন্দর্যের দীপ্তিও আছে। এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু যুদ্ধ ও সিংহাসনের কাহিনি নয়; ইতিহাস বেঁচে থাকে স্থাপত্যের ভাঁজে, গম্বুজের নীরবতায় এবং মানুষের স্মৃতির গভীরে। ওএফএফ

Go to News Site