Jagonews24
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলো এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধ নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের গভীর অসুস্থতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানসিক সংকটের প্রতিফলন। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখি—কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, কোনো শিশু পাশের বাড়ির পরিচিত মানুষের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে কিংবা পরিবারের কাছের কেউই তার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রতিবারই আমরা শোকাহত হই, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি, বিচারের দাবি তুলি। কিন্তু কিছুদিন পরই আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। এই পুনরাবৃত্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে আমি মনে করি, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা কেবল আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ, ক্ষমতার রাজনীতি এবং সহিংস সংস্কৃতির সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষ কীভাবে একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের রায়ে পাওয়া যায় না; এর উত্তর খুঁজতে হয় মানুষের মানসিক গঠন, সামাজিক পরিবেশ এবং ক্ষমতা ব্যবহারের প্রবণতার ভেতরে। শিশুকে ‘সহজ শিকার’ হিসেবে দেখার মানসিকতা শিশু নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনায় অপরাধীরা শিশুকে দুর্বল, নির্ভরশীল এবং প্রতিরোধহীন হিসেবে দেখে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে ‘Power and Control Dynamics’ বলা হয়। অর্থাৎ অপরাধী এমন একজনকে বেছে নেয়, যার ওপর সহজে আধিপত্য বিস্তার করা যায়। শিশুর সরলতা, ভয়, বিশ্বাস এবং অসহায়ত্বকে সে নিজের বিকৃত মানসিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম বানায়। আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা ও স্বাস্থ্যকর আলোচনা নেই। ফলে শিশুদের শরীর সচেতনতা, নিরাপদ স্পর্শ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শেখানো হয় না। অনেক পরিবার মনে করে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা ‘লজ্জার’। কিন্তু এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই অপরাধ যৌন আকাঙ্ক্ষার চেয়েও বেশি ‘ক্ষমতা প্রয়োগের’ বিষয়। অপরাধী শিশুকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করার মতো একটি বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই মানসিকতা হঠাৎ তৈরি হয় না; এটি দীর্ঘদিনের বিকৃত চিন্তা, দমিত আগ্রাসন, নারীবিদ্বেষী মনোভাব এবং সহিংস সংস্কৃতির ভেতর থেকে তৈরি হয়। পরিচিত মানুষ কেন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে ওঠে? আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, শিশু নির্যাতনকারীরা ‘অচেনা’ বা ‘ভয়ংকর চেহারার’ মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী শিশুর পরিচিত কেউ—আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, পরিবারের বন্ধু কিংবা কাছের মানুষ। কারণ শিশুর বিশ্বাস অর্জন করা অপরাধীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি ‘Grooming Behaviour’ নামে পরিচিত। অপরাধী ধীরে ধীরে শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, তাকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়, উপহার দেয় বা বিশেষ মনোযোগ দেয়। এরপর সেই বিশ্বাসকেই ব্যবহার করে নির্যাতন করে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, শিশুটি অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আবার বুঝলেও ভয়, লজ্জা বা হুমকির কারণে কাউকে বলতে পারে না। সহিংসতার প্রতি সামাজিক অসংবেদনশীলতা আমাদের সমাজ ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি অসংবেদনশীল হয়ে উঠছে। পরিবারে গালাগালি, শারীরিক শাস্তি, নারীর প্রতি অসম্মান, অনলাইনে সহিংস কনটেন্টের বিস্তার—এসব যেন এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। শিশু যখন ছোটোবেলা থেকেই দেখে শক্তিশালী মানুষ দুর্বলকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন তার মানসিক গঠনের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Desensitization’ বা সহিংসতার প্রতি অনুভূতিশক্তি কমে যাওয়া। একজন ব্যক্তি যখন বারবার সহিংসতা দেখে, কিন্তু তার সামাজিক প্রতিরোধ বা শাস্তি দেখে না, তখন তার ভেতরের নৈতিক বাধাগুলো দুর্বল হতে থাকে। ফলে অপরাধ করার আগে তার মধ্যে অপরাধবোধও কম কাজ করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও বিকৃত ক্ষমতার চর্চা বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো এখনো অনেকাংশে পুরুষতান্ত্রিক। এখানে নারীর শরীর, শিশুদের মতামত কিংবা ব্যক্তিগত সীমারেখাকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শিশুদের শেখানো হয় ‘বড়দের কথা শুনতে হবে’, কিন্তু শেখানো হয় না—কেউ যদি শরীর স্পর্শ করে অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে প্রতিবাদ করতে হবে। এই সংস্কৃতিতে শিশুরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় না। অন্যদিকে কিছু পুরুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে তারা দুর্বল কারও ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এটি কেবল ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়; বরং সামাজিকভাবে তৈরি এক ধরনের ক্ষমতার মানসিকতা। যৌন শিক্ষা না থাকা এবং নীরবতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে খোলামেলা ও স্বাস্থ্যকর আলোচনা নেই। ফলে শিশুদের শরীর সচেতনতা, নিরাপদ স্পর্শ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শেখানো হয় না। অনেক পরিবার মনে করে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা ‘লজ্জার’। কিন্তু এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। যখন একটি শিশু জানেই না যে তার সঙ্গে যা হচ্ছে তা ভুল, তখন সে সাহায্য চাইতেও পারে না। আবার অনেক সময় পরিবারও সামাজিক সম্মান রক্ষার নামে ঘটনাগুলো চেপে যায়। এই সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।মানসিক রোগ নাকি বিকৃত মানসিকতা? অনেকেই মনে করেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ শুধু ‘মানসিক রোগী’ মানুষই করে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। সব অপরাধী মানসিক রোগে আক্রান্ত নয়। বরং অনেকেই সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে—চাকরি করে, পরিবার চালায়, মানুষের সঙ্গে মিশে। কিন্তু তাদের ভেতরে থাকতে পারে বিকৃত যৌন কল্পনা, সহানুভূতির অভাব, দমিত রাগ, আত্মনিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং সহিংস মানসিকতা। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি ক্লিনিক্যালি অসুস্থ না হলেও নৈতিক ও মানসিকভাবে গভীরভাবে বিকৃত হতে পারে। তাই শুধু “পাগল” বলে দায় এড়িয়ে গেলে সমস্যার মূল কারণ বোঝা যায় না। শিশুর মানসিক জীবনে এর প্রভাব যে-সব শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তাদের জীবনে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর। অনেক শিশু ট্রমা, বিষণ্নতা, আতঙ্ক, আত্মবিশ্বাসহীনতা, ঘুমের সমস্যা, সামাজিক ভয় কিংবা আত্মঘৃণায় ভুগতে শুরু করে। অনেকের মধ্যে Post-Traumatic Stress Disorder (PTSD) তৈরি হয়। তারা মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না, সম্পর্ক তৈরি করতে ভয় পায়, এমনকি নিজের শরীরকেও ঘৃণা করতে শুরু করে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সমাজই সেই শিশুকে দোষারোপ করে। তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘কোথায় ছিলে?’, ‘কেন গিয়েছিলে?’, ‘কী পরেছিলে?’—যেন অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এই মানসিকতা শিশুর ট্রমাকে আরও গভীর করে। কী করা জরুরি? শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়। শাস্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিরোধের জন্য আরও গভীর সামাজিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের প্রয়োজন— শিশুদের বয়সভিত্তিক যৌন ও নিরাপত্তা শিক্ষা পরিবারে খোলামেলা ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা শিশুদের ‘না’ বলার অধিকার শেখানো অনলাইনে সহিংস ও বিকৃত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নারীর প্রতি সম্মান ও সম্মতির সংস্কৃতি তৈরি এবং নির্যাতনের শিকার শিশু ও পরিবারের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার ভেঙে যায় না; সমাজের মানবিক ভিত্তিও ভেঙে পড়ে। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো কতটা নিরাপদ—তার ওপর নির্ভর করে। আজ আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো শুধু অপরাধীর বিচার দাবি করা নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশুরা ভয় নিয়ে বড় হবে না। যেখানে একটি শিশু জানবে—তার শরীর, তার নিরাপত্তা এবং তার কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি সমাজের মানসিক সুস্থতার পরিমাপ। লেখক : মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক - লিভিং উইথ ওয়েলনেস। এইচআর/এমএফএ/এএসএম
Go to News Site