Collector
‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপে’ চীন-যুক্তরাষ্ট্র, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা! | Collector
‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপে’ চীন-যুক্তরাষ্ট্র, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা!
Somoy TV

‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপে’ চীন-যুক্তরাষ্ট্র, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা!

বিশ্ব রাজনীতি কি এক মহাপ্রলয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? একদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে প্রবল বিক্রমে ধেয়ে আসা উদীয়মান শক্তি চীন। এই দুই পরাশক্তির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটাবে? সম্প্রতি বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকের পর এসব প্রশ্ন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বৈঠকে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে এক গভীর ভয়ের কথা বলেছেন শি। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব আবারও এক নতুন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে’। এরপর চীনা প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন রেখেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ পেরিয়ে বড় দেশগুলোর সম্পর্কের নতুন ধারা তৈরি করতে পারবে?বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ বার্তা নয়, বরং এটি এক গভীর সংকটের পূর্বাভাস। শি জিনপিং একটি বিশেষ শব্দের ওপর বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন—‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’। কিন্তু কী এই ফাঁদ? কেন আড়াই হাজার বছর আগের এই তত্ত্ব দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে? থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কী? সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক ফাঁদ। যখন একটি প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তি দেখে যে, অন্য একটি নতুন উদীয়মান শক্তি তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে, তখন তাদের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র ভয়, গভীর অবিশ্বাস আর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রতিষ্ঠিত শক্তি ভয় পায় তার আধিপত্য হারানোর, আর উদীয়মান শক্তি চায় তার প্রাপ্য সম্মান। এই সংঘাতের নামই হলো ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’। ইতিহাস বলছে, এই ভয় আর অবিশ্বাসের লড়াই অধিকাংশ সময়ই শেষ হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র হলো সেই প্রতিষ্ঠিত শক্তি, আর চীন হলো দ্রুত বেড়ে ওঠা উদীয়মান শক্তি। আর এই দুইয়ের মাঝে ঝুলছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। থুসিডাইডিস ট্র্যাপ ধারণার উৎপত্তি থুসিডাইডিস ট্র্যাপ ধারণার উৎপত্তি আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, প্রাচীন গ্রিসে। তৎকালীন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে এই ধারণাটি উন্মোচন করেন। তার লেখা বই থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এথেন্স শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তখনকার শক্তিশালী নগররাষ্ট্র স্পার্টার কাছে যা ছিল ভয়ের কারণ। স্পার্টার শাসকরা মনে করেছিলেন, এথেন্স তাদের তৈরি করা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়। এই ভয়ই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বে শুরু হয় পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধ। দীর্ঘ ২৭ বছরের এই যুদ্ধে স্পার্টার নামমাত্র বিজয়ী হলেও উভয় রাষ্ট্রই ততদিনে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। থুসিডাইডিস এর মতে এই যুদ্ধ কেবল ক্ষমতার ছিল না, ছিল ভয়েরও। তার এই প্রাচীন পর্যবেক্ষণই আজ আধুনিক ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। আরও পড়ুন: ট্রাম্পের চীন সফরের পরই তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র! নতুন করে কেন আলোচনায়? থুসিডাইডিসের আড়াই হাজার বছর আগের তত্ত্বকে ধুলো ঝেড়ে নতুন করে সামনে আনেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন। ২০১০ এর শুরুতে তিনি এই প্রাচীন ধারণাকে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ নামে জনপ্রিয় করেন। এরপর ২০১৭ সালে লেখা এক বইতে অ্যালিসন যুক্তি দেখান, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে—যদি না উভয় পক্ষ তা এড়াতে কঠিন ও বেদনাদায়ক পদক্ষেপ নেয়।’ এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে এই ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। সবশেষ গত ১৪ মে বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠকে তত্ত্বটি আবারও আলোচনায় আসে। ওই বৈঠকে শি জিন পিং ট্রাম্পের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কাটিয়ে সম্পর্কের এক নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারবে কি না?’। শি এমন সময়ে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’প্রসঙ্গটি তুললেন, যখন তাইওয়ান ইস্যু, ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য, শুল্ক, সামরিক প্রতিযোগিতাসহ একাধিক বিষয়ে বেইজিং-ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বারবার কার্যকর হয়েছে থুসিডাইডিস ট্র্যাপ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন কেবল তাত্ত্বিক কথা বলেননি, তিনি ইতিহাসের পাতায় প্রমাণ খুঁজেছেন। গত ৫০০ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তিনি এমন ১৬টি ঘটনা সামনে এনেছেন, যেখানে একটি উদীয়মান শক্তি তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। এর মধ্যে ১২টি ঘটনা ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। যার মধ্যে রয়েছে— প্রথম অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধ, স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধ, হাবসবার্গের আধিপত্যকে ফ্রান্সের চ্যালেঞ্জ করা। এমনকি প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ছিল ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এর প্রভাব। এর থেকে বোঝা যায় এই ফাঁদ কতটা শক্তিশালী এবং ধ্বংসাত্মক। ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এর মুখে চীন-যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান বিশ্বের এই দুই পরাশক্তি কেন ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এর মুখে? এর পেছনে কাজ করছে তিনটি প্রধান কারণ। প্রথমত, নিরাপত্তা শঙ্কা। চীন যখন নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক শক্তি বাড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে নিজের আধিপত্যের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যখন এশিয়ায় মিত্রদের সুরক্ষায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়, তখন চীন মনে করে তাকে অবরুদ্ধ করা হচ্ছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস সংঘাতের আগুনকে জ্বালিয়ে রাখছে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি যুদ্ধ। সেমিকন্ডাক্টর, চিপস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের লড়াই এখন চরমে। এটি এখন কেবল ব্যবসা নয়, এটি শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। আর তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ হলো ‘তাইওয়ান সংকট’। চীন তাইওয়ানকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই একটি ইস্যুই যেকোনো মুহূর্তে বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি অনিবার্য? আজকের দিনে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং দুই দেশের কাছেই রয়েছে হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র। ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অনিবার্য কি না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে উভয় দেশের কূটনীতি আর পারস্পরিক সহনশীলতার ওপর। যদিও অনেকে মনে করেন চীন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অনিবার্য, কিন্তু চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ২০১৩ সাল থেকেই ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ এড়াতে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে আসছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্ব এতটাই বড় যে এটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের সমৃদ্ধিকে ধারণ করতে সক্ষম। ফলে তার কাছে থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কোনো ঐতিহাসিক অনিবার্যতা নয়। চীনা কূটনীতিক শিয়ে ফেং তো পরিষ্কার বলেছেন, ‘চীন এথেন্সও নয়, আবার স্পার্টাও নয়।’ অর্থাৎ, চীন কোনো যুদ্ধের নেশায় মত্ত নয়। আরও পড়ুন: ট্রাম্প-পুতিনের চীন সফর: আতিথেয়তার আড়ালে গভীর ভূ-রাজনৈতিক বার্তা অন্যদিকে, ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন মনে করেন, ‘উদীয়মান শক্তি আর ক্ষয়িষ্ণু শক্তির এই ধারণাটি (থুসিডাইডিস ট্র্যাপ) তখনই কাজ করে যদি বড় শক্তিটি দুর্বল হতে থাকে। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করছে।’ পাশাপাশি, ট্রাম্প নিজেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী ও ইতিবাচক করার বিষয়ে আশাবাদী। তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যুতে একটি ‘রেড লাইন’ টেনে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘তাইওয়ান ইস্যুতে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ এমন সংকট তৈরি করতে পারে যেখান থেকে ফেরার পথ নেই।’ ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি রেডলাইন অতিক্রম করে, তবে দুই পরাশক্তির মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ লাগতে পারে। আর একবার যদি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। কেননা চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে লড়বে না। তাদের সঙ্গে ন্যাটো (NATO), জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপিন্সের মতো মিত্র দেশগুলো যোগ দিতে পারে। অন্যদিকে চীনের পক্ষে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়াসহ অন্যান্য মার্কিনবিরোধী শক্তি এক হতে পারে, যা গোটা বিশ্বকে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।

Go to News Site