Somoy TV
রামিসা! সদা হাস্যোজ্জ্বল ফুলের মতো এক কন্যা শিশু। রাজধানীর পল্লবীতে ইতিহাসের জঘন্যতম নির্মমতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। দুই বোন রাইসা আর রামিসা ছিল বাবা-মায়ের অত্যন্ত আদরের। কিন্তু ছোট্ট রামিসা যেন সবাইকে জয় করে নিতেই অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। বাবা-মা, বোন, ফুপু কিংবা আত্মীয়স্বজন শুধু নয়, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকসহ এমন কেউ ছিল না, যে উড়ন্ত প্রজাপতির মতো এমন প্রাণ-প্রকৃতিকে অপছন্দ করতে পারতো।গেল ১৯ মে সকালে মিরপুরের পল্লবীতে ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। জানা যায়, ধর্ষণের পর এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাকে। রামিসার স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম কান্নাভেজা চোখে রামিসার সর্বশেষ পরীক্ষার খাতাগুলো বের করে মেলে ধরেন। খাতাগুলোর প্রতিটা বিষয়েই তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলছিল, যেখানে ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল হওয়াটা খুব বেশি কঠিন কিছু ছিল না। কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ হিসেবে ড্রয়িং বা ছবি আঁকায় তার প্রতিভার প্রমাণ মেলে। পবিত্র কাবা ঘরের একটি ছবি সে এঁকেছিল, যা কেবল প্রদর্শনীতেই স্থান করে নেয়নি, বরং পুরস্কারও জিতে এনেছিল। ছোট্ট এইটুকু জীবনে পরিবারের কাছে চোখের মণি আর পরিচিত কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে পরীর মতো এক মিষ্টি মেয়ে হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছিল রামিসা। রামিসার ফুপু জানান, তার রুচিবোধ ও গোছালো জীবনাচরণের সাথে আরও একটি ভালোবাসার নিদর্শন ছিল তাদের অঙ্গন জুড়ে। পশুপ্রেমী রামিসার বিড়ালটি ছিল তার কাছে অনেক আদরের। কয়েকদিন আগে বিড়ালটি হারিয়ে গেলে বন্ধ হয়ে যায় তার খাওয়া-দাওয়া। অবশেষে দুদিন পর নিচের চায়ের দোকানদার রফিক তার বিড়ালটি খুঁজে দিলে রীতিমতো রফিক আঙ্কেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি সে; বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছিল। সেই ভালোবাসায় কী বুঝতে পেরেছে অবলা পশু রামিসার প্রিয় বিড়ালটি? সবাইকে অবাক করে দিয়ে রামিসাকে হারিয়ে ফেলার পর থেকে বিড়ালটিও কিছু খাচ্ছে না। রান্না ঘরের মেঝেতে নিশ্চুপ পড়ে রয়েছে ভারাক্রান্ত অবয়বে। দুই রুমের ছোট্ট বাসার বারান্দা বিভিন্ন ধরনের গাছে ভর্তি, যার এক কোণে খাঁচার মধ্যে সাদা রঙের পাখিগুলো ছিল রামিসার অনেক শখের আর ভালোবাসার। ক্লাস নাইনে পড়া বড় বোন রাইসাকে ছাপিয়ে রামিসাই হয়ে উঠেছিল সবার কাছে পরিচিত। ওর বিদায়ের পর নয়, আগে থেকেই প্রায় সবাই 'রামিসাদের বাসা' কিংবা 'রামিসার আম্মু' বলে সম্বোধন করতেন। রামিসার খালু মোহাম্মদ শাহিন খণ্ড খণ্ড এমন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার বারই বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন। কান্নাভেজা চোখে তিনি ছোট্ট রামিসার কৃতিত্ব আর অসাধারণ মানবিক গুণের কথা বলছিলেন। এইটুকু রামিসার শখের বোরকা পরার গল্প কিংবা ধর্মীয় অনুরাগের কথা বলতে গিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আকুল হয়ে বলে চলেন, আর কত বলবো, কে জানতো এভাবে ও বিদায় নেবে? বিদায় নেবে বলেই কি এই টুকু রামিসা এভাবে সবার মন জয় করেছিল? যে শিশুটি এই পুরো ঘর জুড়ে প্রাণের সঞ্চার করতো, সে আজ কেবলই দেয়ালে ঝোলানো স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি। কোনো পূর্ব শত্রুতা নেই, কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই—অথচ একটি নিষ্পাপ প্রাণ শেষ হয়ে গেল। রামিসার ফুপুর ভাষায়, ওরে (ঘাতক) ফাঁসি দিলে অন্তত রিকশাওয়ালা বা এই জাতীয় ছোটখাটো নেশাখোরেরা ভয় পাইবো। তাকে যারা মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে খুবলে খেয়েছে, তাদের জনসম্মুখে ফাঁসির দাবিতে রাজপথ প্রকম্পিত হচ্ছে। দেশের আনাচে-কানাচে মিছিলে মিছিলে স্লোগানে স্লোগানে রামিসা হত্যার বিচার চাওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগ এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রধান অভিযুক্ত সোহাগ ও সহযোগী সোহাগের স্ত্রীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্ট এবং পুলিশ হেফাজতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে আদালতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করেছেন। মাদকাসক্তি এবং পরিকল্পিত পাশবিক লালসাই যে এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ, তা চার্জশিটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত—ঘাতকের দরজায় পড়ে থাকা রামিসার ‘সেই একটা জুতো’, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য এবং উদ্ধারকৃত অন্যান্য আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ‘মৃত্যুদণ্ড’ নিশ্চিত করার জন্য জোরালো আইনি প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দেন, শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে বলে। দেয়ালে টাঙানো মিষ্টি হাসির ছোট্ট রামিসার সেই নিষ্পাপ প্রশ্নের উত্তর এবং তার মায়ের বুকের পৃথিবীসম শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হবে না, তবে আইনি প্রক্রিয়ার এই দ্রুত অগ্রগতি দেশের সাধারণ মানুষের মনে সুশাসন ও দ্রুত বিচার পাওয়া আশার আলোয় নতুন সংস্কৃতি সাক্ষি হবে দেশ এমনটাই আসা সবার।
Go to News Site