Jagonews24
কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক মক্কার পথে হাঁটতে হাঁটতে কিছু দৃশ্য দেখে মন ভালো হয়ে যায়। যখন দেখি কোনো সন্তান হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বাবা-মাকে, যখন দেখি কোনো বৃদ্ধ স্বামী তার স্ত্রীর হাত ধরে হাঁটছেন মসজিদের দিকে, কিংবা তাওয়াফ করার সময় স্বামী ঢাল হয়ে ভিড় আর ধাক্কা থেকে রক্ষা করছেন স্ত্রীকে-তখন এক অপার্থিব ভালো লাগায় আপ্লুত হই। আমাদের হজ যাত্রায় মদিনার পাঁচদিন যেমন শান্তিপূর্ণ কেটেছে, মক্কার গত এক সপ্তাহ সেরকমটি নয়। এখানে তাপমাত্রা বেশি, মানুষ বেশি, ঘটনা ও দুর্ঘটনাও বেশি। মাত্র ২ সেকেন্ডের জন্য আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হতে গিয়ে বেঁচে গিয়েছি; সেই গল্পে পরে আসছি। মক্কায় প্রবেশের পর প্রথম রাতেই এশার নামাজ ও ডিনার শেষে আমাদের কাফেলা তালবিয়া পড়তে পড়তে ওমরাহর উদ্দেশ্যে হোটেল থেকে রওনা হলো। ৭৯ নম্বর গেটে নুসুক কার্ড চেক করে সবাইকে পুলিশ ভেতরে ঢুকতে দিলেও আটকে দিলো আমাকে। কারণ, আমার পিঠের ব্যাগটি পুলিশের পছন্দ হয়নি; ওটা লাগেজ কাউন্টারে জমা দিতে হবে। একই ব্যাগ নিয়ে আমার স্ত্রী প্রবেশাধিকার পেলেও আমার কারণে সে আর ভেতরে গেলো না। ওমরাহ যাত্রায় এটিই ছিল আমাদের প্রথম ধাক্কা। দ্বিতীয় ধাক্কাটি ছিল লাগেজ কাউন্টার খুঁজে না পাওয়া। অনেক হুজ্জত করে বেজমেন্টের ওয়াশ রুমের পেছনে কাউন্টারটি খুঁজে পেয়ে পিঠের ব্যাগ জমা দিলাম। বিনিময়ে মিলল কবজির ব্যান্ড স্টিকার, যা ওমরাহ শেষে ব্যাগ ফেরতের টোকেন। আমাদের মুয়াল্লিম আগেই বলে দিয়েছিলেন, কেউ দলছুট হলে নিজের মতো ওমরাহ করে নিতে; এখানে দু-একজনের জন্য গোটা কাফেলা অপেক্ষা করে না। আমি আর আমার স্ত্রী তাই একটি ইরানি কাফেলার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে তাওয়াফ করতে ঢুকে গেলাম। কাবা শরিফ প্রথম দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। জানি না কী জাদুকরী আকর্ষণ আছে এই ঘরের, এর থেকে দৃষ্টি ফেরানো দায়। প্রদক্ষিণরত অবস্থায় চোখের পানি ধরে রাখাও দায়। আইয়ামে জাহেলিয়াতের আমলে এখানে ৩৬০টি মূর্তি ছিল, আর তাদের ঘিরে চলত উলঙ্গ তাওয়াফ। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে! তাওয়াফের সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল মানুষকে ধাক্কা না দিয়ে যতটা সম্ভব আল্লাহর ঘরের কাছাকাছি থাকা। মাকামে ইব্রাহিমের কাঁচের বাক্সটি স্পর্শ করার সুযোগ পেয়েছি দুইবার। অভূতপূর্ব সেই অনুভব! তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নফল নামাজ ও জমজমের পানি খেয়ে চলে গেলাম সাফা পাহাড়ের দিকে। সেখানে আমাদের কাফেলার দেখা পেয়ে গেলাম এবং একসাথে সাফা-মারওয়া সাঈ সম্পন্ন করলাম। রাত দেড়টায় চুল ছেঁটে ইহরাম ছাড়লাম। তবে সাধ মিটল না, মনে মনে নিয়ত করলাম আরেকবার ওমরাহ করার। পরের দিন মক্কার তাপমাত্রা ছিল ৫১ ডিগ্রি। তবু মন হোটেলে থাকতে চায় না। মসজিদ আল হারামের গেট, দেওয়াল আর সিলিংয়ের স্থাপত্য ও নকশা শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, রাজকীয়। তবে প্রথম দিনই আমার স্ত্রীকে দুইবার হারিয়ে ফেললাম। নারীদের নামাজের স্থান আলাদা হওয়ায় সকালে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে কথা ছিল ৯০ নম্বর গেটে মিলব। কিন্তু যথাসময়ে তাকে পেলাম না, সে ভুল করে ফোন হোটেলে ফেলে এসেছিল। আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে আমি হোটেলে ফিরে এলাম এবং একটু পর সেও পথ চিনে ফিরে এলো। ভাগ্যিস, আগে কিছু দোকান ও হোটেল চিনিয়ে রেখেছিলাম! মাগরিবের নামাজেও ছাদে প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল। তবে এই বিচ্ছেদ, হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে পাওয়ার মধ্যেও এক ধরণের মাধুর্য আছে। একদিন বিরতি দিয়ে এশার নামাজ শেষে আমরা গেলাম মসজিদ আইশায় (হারাম শরিফ থেকে ৭ কিমি দূরে মিকাতের বাইরে)। আল মিসফালাহ রোড থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যখন পৌঁছালাম, রাত তখন ১০টা। গাড়ি থেকে নেমে আমি দ্রুত রাস্তা পার হতে গিয়ে ভুলে গেলাম যে, এখানে ট্রাফিক নিয়ম বাংলাদেশের বিপরীত-গাড়ির ড্রাইভিং সিট থাকে বাম পাশে এবং বাম দিক দিয়েই গাড়ি চলে। বাম দিক ফাঁকা দেখে আমি যেই পা বাড়িয়েছি, অমনি এক সৌদি পুলিশ চিৎকার করে আমাকে আটকে দিলো। ডানে তাকিয়ে দেখি তীব্র বেগে ছুটে আসছে বড় বড় গাড়ি। মাত্র ২ সেকেন্ড! ওরা আমাকে পেরিয়ে গেলো। তরুণ পুলিশটি সময়মতো সতর্ক না করলে সেই দ্রুতগতির গাড়ি আমাকে এক ধাক্কায় উড়িয়ে নিয়ে যেত; আমার বুকের হাড় আর মাথার খুলি এক হয়ে যেত সেই রাতেই। ‘সেই রাতে দুর্ঘটনাটা ঘটে গেলে আজ আমার এই ভ্রমণকাহিনির বদলে আমার মৃত্যুসংবাদ পড়তেন আমার পাঠকেরা।’ ইসলাম ধর্মে সাম্যের যে মাহাত্ম্য, তার সুন্দর দৃষ্টান্ত হজ। এখানে ভিআইপি বলে কিছু নেই। ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো-সবার পরনে দুই টুকরো ইহরামের কাপড়। তবে হজের এই পুণ্যভূমিতে নিজের দেশের মানুষদের কিছু আচরণ দেখে মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে, যা আগামী দিনের হাজিদের সচেতন করবে বলে আমার বিশ্বাস। ১. খাবার অপচয়: সৌদির অধিবাসী বা তাদের প্রতিনিধিরা হাজিদের বিনামূল্যে পানি, খাবার বা তসবিহ বিতরণ করেন। অনেকে প্রয়োজন না থাকলেও হাত পেতে তা নেন এবং নষ্ট করেন। একই দৃশ্য হোটেলের বুফেতেও দেখা যায়। চোখের ক্ষুধা মেটাতে প্লেট ভরে খাবার নিয়ে তা ফেলে দেওয়া মোটেও ভালো কাজ নয়। ২. ভিডিও কল: আপনজনদের সাথে যোগাযোগের জন্য অডিও কলই যথেষ্ট। কিন্তু মসজিদে বসে ভিডিও কলে ঘরের ব্যক্তিগত বিষয় জনসমক্ষে আনা এবং লাউডস্পিকারে কথা বলে অন্য হাজিদের ইবাদতের মনোযোগ নষ্ট করা কতটা ঠিক? ৩. জামাতে নামাজে হুড়াহুড়ি: মসজিদের ভেতরে স্থান অপর্যাপ্ত জানা সত্ত্বেও অনেকে আজানের পর ভেতরে ঢুকে নামাজরত ব্যক্তির সামনে-পেছনে দাঁড়িয়ে জায়গা তৈরির চেষ্টা করেন। এতে অন্যের মনঃসংযোগ নষ্ট হয়। দেরি করে গিয়েও বাইরের চত্বরের বিশাল কার্পেটে না বসে ভেতরে গিয়ে হুড়াহুড়ি করা কতটা সহিহ? আল্লাহ তাঁর ঘরে আমাদের মেহমান হিসেবে আসার তাওফিক দিয়েছেন। আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের শৃঙ্খলা ও মর্যাদা বজায় রাখতে না পারি, তাহলে কীভাবে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে কিছু চাইব? সেই মুখ কি আমাদের থাকবে? চলবে... এমআরএম
Go to News Site