Jagonews24
টাকা যেমন ব্যাংকে জমা রাখলে জরুরি সময়ে ব্যবহার করা যায়, তেমনি ঘুমও কি আগেভাগে ‘সঞ্চয়’ করে রাখা সম্ভব? সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ও আলোচনায় এমন ধারণাই সামনে এসেছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘স্লিপ ব্যাংকিং’। ধারণাটি অনুযায়ী, ব্যস্ত সময়ের আগে কয়েকদিন বেশি ঘুমিয়ে শরীর ও মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করা গেলে পরবর্তী ঘুমের ঘাটতির প্রভাব কিছুটা কমানো যেতে পারে। সপ্তাহান্তের ছুটির দিনগুলোতে অনেকেই অ্যালার্ম বন্ধ করে একটু বেশি ঘুমিয়ে থাকেন। পুরো সপ্তাহের ক্লান্তি পুষিয়ে নেওয়ার এ চেষ্টাকে সাধারণত ‘রিপ্লেনিশ স্লিপ’ বলা হয়। কিন্তু এখানে প্রশ্নটা ভিন্ন; শুধু অতীতের ঘুমের ঘাটতি পূরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের ব্যস্ততা মাথায় রেখে আগেই বেশি ঘুমিয়ে নেওয়া। এই ভাবনাটাই ঘুম ‘জমিয়ে রাখার’ ধারণাকে জনপ্রিয় করেছে। স্লিপ ব্যাংকিং আসলে কী? সহজভাবে বললে, নির্দিষ্ট সময়ের আগে কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ঘুমানোই স্লিপ ব্যাংকিং। ধারণার পক্ষে থাকা গবেষকদের মতে, এতে শরীর ও মস্তিষ্ক কিছুটা অতিরিক্ত বিশ্রাম পায়, যা পরবর্তী সময়ে ঘুম কম হলে কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেমন- টিকটকে, স্বাস্থ্যসচেতন অনেক ব্যবহারকারী এই ধারণাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক ঘুমের কৌশল’ হিসেবে তুলে ধরছেন। দীর্ঘ ভ্রমণ, নাইট শিফট বা বড় কোনো শারীরিক ও মানসিক চাপের কাজ শুরুর আগে অনেকে এটিকে এক ধরনের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করছেন। গবেষণা কী বলছে? এই ধারণা নতুন হলেও এর ভিত্তি তৈরি হয় বেশ কয়েক বছর আগে। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল্টার রিড আর্মি ইনস্টিটিউট অব রিসার্চের একটি গবেষণায় বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। গবেষক ট্রেসি রাপের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই পরীক্ষায় ২৪ জন সেনাসদস্যকে দুটি দলে ভাগ করা হয়। একদলকে প্রতিদিন প্রায় ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়, আর অন্য দলকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমের সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দুই দলকেই টানা কয়েকদিন মাত্র ৩ ঘণ্টা করে ঘুমাতে দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, আগে থেকে বেশি ঘুমিয়ে ‘সঞ্চয়’ করা দলটি কম ঘুমের সময়েও তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করেছে। তাদের মনোযোগ, সতর্কতা এবং মানসিক কর্মক্ষমতা অন্য দলের চেয়ে বেশি ছিল। আরও পড়ুন: ঈদে যেমন হওয়া উচিত ডায়াবেটিস রোগীর প্রস্তুতি গাড়িতে চড়লেই বমিভাব? রইলো সহজ সমাধান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষণায়ও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে মায়ামির একটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর চালানো এক পরীক্ষায় দেখা যায়, নাইট শিফট শুরুর আগে কয়েকদিন দৈনিক অতিরিক্ত ঘুম তাদের কর্মক্ষমতা বাড়িয়েছে। এছাড়া খেলাধুলার ক্ষেত্রেও এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। রাগবি খেলোয়াড়রা কয়েক সপ্তাহ ধরে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে শারীরিক চাপ কমাতে সক্ষম হয়েছেন। টেনিস খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে বেশি ঘুম তাদের সার্ভ করার দক্ষতা উন্নত করেছে। বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের মধ্যেও ক্ষিপ্রতা ও প্রতিক্রিয়ার গতি বৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে। সব গবেষকের একমত নয় তবে ঘুম সত্যিই ‘জমিয়ে রাখা’ যায় কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ঘুম কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো নয় যেখানে জমা-খরচের হিসাব রাখা যায়। তাদের যুক্তি, আমরা যখন বেশি ঘুমাই, তখন সেটি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় নয়, বরং অতীতের ঘুমের ঘাটতি পূরণ। অর্থাৎ শরীর আগে যে বিশ্রাম পায়নি, সেটিই পরে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একজন মেডিকেল বিশেষজ্ঞের মতে, ঘুমের সময় শরীরে হরমোন নিয়ন্ত্রণ, বিপাকীয় প্রক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়। এটি শুধু বিশ্রাম নয়, বরং শরীরের ভেতরের ‘রক্ষণাবেক্ষণ সময়’। আরেকজন স্নায়ুবিশেষজ্ঞের মতে, ঘুমের সময় মস্তিষ্কে জমে থাকা বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার হয়, স্নায়ু কোষ পুনর্গঠিত হয় এবং স্মৃতি ও শেখার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হয়, ফলে পরদিন মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন বলে ধরা হয়। এর চেয়ে কম ঘুম দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে শরীর ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কীভাবে চেষ্টা করা যেতে পারে? যারা ব্যস্ত সময়ের আগে ঘুম বাড়াতে চান, তাদের জন্য কিছু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো-আগামী চাপপূর্ণ সময় শুরুর এক বা দুই সপ্তাহ আগে থেকেই প্রতিদিন ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অতিরিক্ত ঘুমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে সকালে একটু দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা সহজ হয়, তাই সেটি ব্যবহার করেও ঘুমের সময় বাড়ানো যেতে পারে। আবার যাদের সকালে নির্দিষ্ট সময় উঠে কাজ করতে হয়, তাদের জন্য রাতে আগেভাগে ঘুমাতে যাওয়াই ভালো বিকল্প। এছাড়া দিনের মধ্যে ছোট সময়ের ঘুম বা ‘ন্যাপ’ নেওয়াও কিছুটা সহায়ক হতে পারে, যদিও সেটি কতটা কার্যকর তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। বিরোধী মত কী বলছে? হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক অধ্যাপকের মতে, ঘুমকে ক্রেডিট কার্ডের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আপনি ঘুমের ঘাটতি তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেটিকে আগেভাগে জমা হিসেবে সংরক্ষণ করা যায় না। তার মতে, মানুষ ক্লান্ত না হলে স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারে না, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ধারণা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। তিনি আরও সতর্ক করেন, দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমালে বা অতিরিক্ত ঘুমের চেষ্টা করলে অনেক সময় ঘুম ভাঙার পর মাথা ভারী লাগা বা অলস অনুভূতি দেখা দিতে পারে। সব বিতর্কের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ঘুম ভবিষ্যতের জন্য জমা করা যায় কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও ভালো ঘুম যে কর্মক্ষমতা, মনোযোগ ও স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে, সে বিষয়ে সবাই প্রায় একমত। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কোনো সাময়িক কৌশলের ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার একটি স্থিতিশীল অভ্যাস গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ উপায়। তথ্যসূত্র: স্লিপ এক্সটেনশন অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন জেএস/
Go to News Site